ভোলা প্রতিনিধিঃ ভোলার চরাঞ্চলগুলোতে অতিথি পাখিরা এসে জড় হতে শুরু করেছে শীতের শুরু থেকে। সুদূর হিমালয় ও সাইবেরিয়াসহ উওরের শীত প্রধান দেশ মঙ্গোলিয়া, নেপাল, জিনজিয়াং থেকে আসা হাজার হাজার অতিথি পাখির ভিরে দ্বীপ জেলা ভোলাসহ উপকূলের চরাঞ্চলগুলো সেজেছে ভিন্ন রুপে।

শীতের সকাল-বিকেল জেলার মূল ভূখন্ড থেকে বিচ্ছিন্ন এসব চরাঞ্চলগুলোতে অতিথি পাখির
কলকাকলি, কিচিরমিচির, উড়ে বেড়ানো আর জলকেলীতে একদিকে যেমন ছুয়ে যায় কঠিন হদয়ের মানুষের মন, অন্যদিকে নিছন সখ ও লালশার বশবর্তী হয়ে এক দল প্রভাবশালী শিকারী ভীর জলায় উপকূলের এসব চরাঞ্চলে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, ৮০’র দশকে ভোলায় আসা অতিথি পাখির সংখ্যা ছিলো প্রায় ৩৫০ প্রজাতির। কিন্তু বর্তমানে এরসংখ্যা নেমে ৬৫ প্রজাতিতে চলে এসেছে। প্রতিবছরই শীতের শুরুতে হাজার পাখির কলকাকলীতে এ অঞ্চল মুখরিত হয়ে উঠলেও নানা প্রতিবন্ধকতার কারণে দিন দিন এর সংখ্যা হ্রাস পাচ্ছে। পাখি বিশেষজ্ঞদের মতে এভাবে দিন দিন পাখির সংখ্যা কমতে থাকলে একসময় ভোলার চরাঞ্চলগুলোতে অতিথি পাখির জলকেলী আর কলতান ফুরিয়ে যাবে।

১৮’ই জানুয়ারী ঢাকা থেকে ভোলায় পাখিশুমারী করতে আসা বন্যপ্রানী গবেষক ও পাখি পর্যবেক্ষক সামিউল মোহসেনিন জানান, গত শীত মৌসুমে সর্বমোট ৫০ হাজার ৪০টি বিভিন্ন প্রজাতির পাখি গননা করেছেন। এর মধ্যে ৬৬ প্রজাতির পাখির সন্ধান মিলেছে। যার মধ্যে জলচর পাখি ছিল ৬৫ প্রজাতির। সর্বমোট সৈকত পাখির সন্ধান মিলেছে ৪হাজার ৪২১টি।
যার মধ্যে চেগা, জিরিয়া, বাটান ছিল উল্লেখ যোগ্য। বনু হাসের সন্ধান মিলেছে ১২হাজার ৮শ ৭৩টির। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য সিথি হাস, বেবী, চকাচকি, রাজ হাস। অন্যদিকে এবছর শীত মৌসুমে মোট ৬৫ প্রজাতির ৫৬ হাজার ৫শ ২২টি জলচর পাখি দেখা গিয়েছে। এর মধ্যে ৫ প্রজাতির বিপন্নপ্রায় জলচর পাখি দেখা গিয়েছে, এর মধ্যে মহা বিপন্ন চামুচ ঠুটো বাটান
৫টি।

বিপন্ন নর্ড ম্যানের সবুজ পা ২টি। সংকটাপন্ন দেশী গাঙচষা ১৩ হাজার ৪৩টি। এছাড়া প্রায় সংকটাপন্ন প্রজাতির মধ্যে নদীয়া পানচিল ৬টি, এশীয় ডউইচার ২৮টি,কালা লেজ জৌরালি ৫হাজার ৪২৭টি, কালামাথা কাস্তেচরা ৪৫৫টি, ইউরেশীয় গুলিন্দা ৩১৩টি, ইউরেশীয় গুলিন্দা ৩৩১টি। ১০ প্রজাতির বনু হাসের সন্ধান মিলেছে ১৪ হাজার ৭শ ৯৬টির। এর মধ্যে উল্লেখ যোগ্য হচ্ছে দাগি রাজহাস, সিথি হাস, খুন্তে হাস, পিয়াং হাস, খয়রা চখাচখি, পাতি
চখাচখি, উওরের ল্যাঞ্জা হাস, মড়চে রঙা ভুতি হাস ও মেটে রাজ হাস। তিনি উপকূলের মোট ২০টি চর পর্যবেক্ষণ করেছে। এরমধ্যে মাঝের চর, পাতার চর, দমার চর, শাহাজালাল, কালকিনির চর, চর কুকরি-মুকরি, চর পিয়াল, চর পাতিলা, আন্ডার চর, সোনার চর, চর
মনতাজ, টেগরার চর, সালুর চর, ডুব চর, ও বঙ্গের চরে এ পাখিদের বেশি সংখ্যায় দেখা গিয়েছে। তবে তিনি দু:খ করে বলেন, মাঝের চর, বঙ্গের চর ও সালুর চর এ পাখি শিকারের প্রমাণ ও নমুনা পাওয়া গিয়েছে। বেশির ভাগ শিকারিরাই ভোলার বাইরে থেকে আসে এবং শখের বশে পাখি শিকার করে বলে স্থানীয়রা তার কাছে অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন, পরিযায়ী পাখি পরিবেশের ভারসাম্য রক্ষা করে ও একটি সুস্থ পরিবেশের সূচক স্বরুপ।

দিন দিন পাখি কমে যাওয়ার পেছনে বিশ্বব্যাপি জলবায়ু পরিবর্তনের বড় কারন বলে মনে করছেন আন্তর্জাতিক খ্যাতি সম্পন্ন পাখি পর্যবেক্ষক ইনাম আল হক। তিনি জানান, বাংলাদেশে ৩০ বছর আগে যেখানে ফসল শুধু জৈব সার ব্যবহার করা হতো। এখন সেখানে ব্যবহার করা হচ্ছে বিষাক্ত রাসায়নিক সার। যেটা পাখিদের জন্য অনেক বেশি ক্ষতিকর।
আবার এক শ্রেনীর অসাধু শিকারীরা বিষ দিয়ে পাখি নিধন করে বাজারে বিক্রি করেছে।
যার ফলে পাখিরা থাকা ও খাওয়ার জন্য অনেক স্থানকে এখন আর নিরাপদ মনে করছে না। প্রকৃতি ও পাখি বিশেষজ্ঞ ড.এস.এম.এ রশিদের সাথে কথা হয়।

যিনি ১৯৮২ সালে বাংলাদেশে প্রথম পাখি শুমারি শুরু করেন। তিনি বলেন, ৮০’র দশকে ভোলায় আসা অতিথি পাখির সংখ্যা যেখানে ছিলো প্রায় ৩৫০ প্রজাতির তা এখন নেমে ৬৫ প্রজাতিতে চলে এসছে। কথা হয় পাখি-পর্যবেক্ষক ও পর্বত আরোহী এম.এ মুহিতের সাথে। তিনি জানান, ভোলার যে সকল চরে জনবসতি ছিলোনা এখন সেখানে মানুষের গতাকম্য বেড়েছে। ফলে পাখিদের প্রজোনন ক্ষেএও নষ্ট হচ্ছে। বাড়ছে গরু-মহিষ ও জেলেদের অবাধ বিচরন। এছাড়াও মেঘনা তেতুলিয়া নদী বেষ্টিত এসব চরাঞ্চলে গাছের সবুজ বেষ্টনী একের পর এক উজার
হচ্ছে। কিছু অসৎ বনরক্ষীর সহযোগিতায় দিনের আলোতে প্রকাশ্যেই বনের গাছ লুট করছে দস্যুরা। যার ফলে পাখিরা এখন ওইসব চর গুলোকে তাদের নিরাপদ স্থান বলে মনে করছেনা।
এছাড়াও নদীগুলোতে জেলেরা কারেন্ট জাল দিয়ে অবাধে মাছ শিকার করছে। যে কারনে একদিকে যেমন পাখিদের খাদ্যপযোগী মাছের সংখ্যা দিন দিন কমে যাচ্ছে। অন্যদিকে, জালে জড়িয়ে অনেক পাখিও প্রান হারাচ্ছে। তিনি দু:খ করে বলেন, কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরা প্রতিহত না করা গেলে ওই সব মাছের বংশ এক সময় বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের সভাপতি নিয়াজ আবদুর রহমান বলেন, পাখিদের আবাসস্থল এখন লোকালয়ে পরিণত হয়েছে। পাখিদের কোলাহল মুক্ত বিচরন ক্ষেএগুলো এখন প্রভাবশারীদের দখলে দিন দিন মানুষ বাড়ছে। মাছের চাহিদা বাড়ছে। তাই এখন জেলেদের সংখ্যাও বেশি। জেলেরা কারেন্ট জাল দিয়ে মাছ ধরছে। নদীতে মাছের আকাল দেখা দিয়েছে। ফলে নদীর প্রান-বৈচিএ নষ্ট হচ্ছে। এসময় তিনি নদীর প্রাণ-বৈচিএ ফিরিয়ে আনতে সকলকে এক যোগে কাজ করার আহবান জানান।

উপকূলীয় বন বিভাগের বিভাগীয় বন কর্মকর্তা মো: রুহুল আমিন বলেন, শীত মৌসুমে উপকূলীয় চরগুলোতে আসা পাখির বিচরন ক্ষেএগুলো রক্ষার জন্য বন বিভাগ সব ধরনের ব্যবস্থা গ্রহন করেছে। ইতিমধ্যে উপকূলে আসা পর্যটকদের পাখি দেখার জন্য ভোলার চর কুকরী-মুকরীতে বার্ড ওয়াচ সেন্ট তৈরীর একটি প্রকল্প সরকার হাতে নিয়েছে।

ফয়সল বিন ইসলাম নয়ন
ভোলা নিউজ ডেস্ক।।বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে