রুজমিলা হক, লন্ডন থেকেঃ অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় বড় ধরনের পদক্ষেপ হিসেবে ইউরোপীয় ইউনিয়ন আফ্রিকার বিভিন্ন দেশে ‘রিটার্ন হাব’ বা নির্বাসন কেন্দ্র স্থাপনের পরিকল্পনা নিয়েছে। এসব কেন্দ্রে মূলত আশ্রয় আবেদন প্রত্যাখ্যাত অভিবাসীদের রাখা হবে, যাদের নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব হয়নি। এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়ন এ গৃহীত নতুন ‘প্রত্যাবর্তন বিধিমালা’, যা ৩৮৯-২০৬ ভোটে পাস হয়েছে। এই বিধিমালার মাধ্যমে অবৈধ অভিবাসীদের দ্রুত ফেরত পাঠানো এবং তাদের ওপর নজরদারি জোরদারের সুযোগ তৈরি হয়েছে।

ইইউ সূত্রে জানা গেছে, আফ্রিকার কয়েকটি দেশ ইতোমধ্যেই এই পরিকল্পনায় আগ্রহ দেখিয়েছে। সম্ভাব্য অংশীদারদের মধ্যে রয়েছে উগান্ডা, মৌরিতানিয়া ও বেনিন ইউরোপীয়। এছাড়াও কেনিয়াকেও সম্ভাব্য অংশীদার হিসেবে বিবেচনা করা হচ্ছে।

জার্মানির স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আলেকজান্ডার ডব্রিন্ট জানিয়েছেন, চলতি বছরের মধ্যেই তৃতীয় দেশগুলোর সঙ্গে চুক্তিতে পৌঁছানোর লক্ষ্য রয়েছে। অন্যদিকে ইতালির প্রধানমন্ত্রী জর্জিয়া মেলোনি এই উদ্যোগকে অবৈধ অভিবাসন মোকাবিলায় “একটি চূড়ান্ত পদক্ষেপ” হিসেবে উল্লেখ করেছেন।

গবেষক বার্ন্ড পারুসেলের মতে, জার্মানি, অস্ট্রিয়া, নেদারল্যান্ডস, ডেনমার্ক ও গ্রিসসহ কয়েকটি ইউরোপীয় দেশ এই পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সক্রিয়ভাবে কাজ করছে। একইসঙ্গে ইউরোপের বাইরে, বিশেষ করে আফগান ও সিরীয় আশ্রয়প্রার্থীদের জন্য কেন্দ্র স্থাপনের বিষয়েও আলোচনা চলছে।

নতুন বিধিমালা অনুযায়ী, অভিবাসীদের সর্বোচ্চ দুই বছর পর্যন্ত আটক রাখা, ইলেকট্রনিক ট্যাগিংয়ের মাধ্যমে নজরদারি এবং যেকোনো সদস্য রাষ্ট্রের বহিষ্কার আদেশ পুরো ইইউ জুড়ে কার্যকর করার বিধান রাখা হয়েছে। এমনকি যেসব ক্ষেত্রে নিজ দেশে ফেরত পাঠানো সম্ভব নয়, সেসব ক্ষেত্রে অনির্দিষ্টকাল আটক রাখার সুযোগও রাখা হয়েছে। তবে এই উদ্যোগকে ঘিরে তীব্র সমালোচনা উঠেছে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে। Amnesty International সতর্ক করে বলেছে, এই আইন “পরিকল্পিত মানবাধিকার লঙ্ঘনের গুরুতর ঝুঁকি” তৈরি করতে পারে। একই উদ্বেগ জানিয়েছে International Red Cross, যারা বলছে, ইইউ-এর বাইরে পরিচালিত এসব কেন্দ্রে মানবাধিকার নিশ্চিত করা কঠিন হবে।

প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৫ সালে ইইউ সীমান্তে ৮০ হাজারের বেশি মানুষকে ‘পুশব্যাক’ করা হয়েছে, যা মানবাধিকার লঙ্ঘনের আশঙ্কাকে আরও জোরালো করেছে।

এদিকে, এই নতুন উদ্যোগের সময়কালটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এর আগে যুক্তরাজ্য রুয়ান্ডা পরিকল্পনা ব্যাপক সমালোচনা ও আইনি জটিলতায় ব্যর্থ হয়। ২০২২ সালে চালু হওয়া সেই প্রকল্পটি শেষ পর্যন্ত আদালতের রায়ে বাতিল হয় এবং ২০২৪ সালে নতুন সরকার সেটি পুরোপুরি পরিত্যাগ করে। সব মিলিয়ে, ইউরোপীয় ইউনিয়নের এই নতুন নীতি অবৈধ অভিবাসন নিয়ন্ত্রণে একটি কঠোর পদক্ষেপ হিসেবে বিবেচিত হলেও, মানবাধিকার ও আন্তর্জাতিক আইনের প্রশ্নে এটি বড় বিতর্কের জন্ম দিয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে