
সিনান আহমেদ শুভ, রাজবাড়ী প্রতিনিধি: রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ উপজেলার দৌলতদিয়া ৩ নম্বর ফেরিঘাটে পদ্মানদীতে ভয়াবহ বাস দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ২৬ জন। নিখোঁজ ও নিহতদের স্বজনদের কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে পুরো এলাকা। এই মর্মান্তিক ঘটনার মধ্যে সবচেয়ে হৃদয়বিদারক দৃশ্য হয়ে উঠেছে ছোট্ট আলীফের আর্তনাদ—“মাগো, আমারে এতিম করে কই গেলি!”
মিজানপুর ইউনিয়নের মেছোঘাট এলাকার জোসনা বেগম (৩১) ঢাকায় কর্মস্থলে যাওয়ার পথে দুর্ঘটনার শিকার হন। তার সঙ্গে ছিল ৯ বছরের ছেলে আলীফ। বাসটি পদ্মার প্রায় ৭০-৮০ ফুট গভীর পানিতে তলিয়ে গেলে শেষ মুহূর্তে নিজের জীবন বিপন্ন করে ছেলেকে জানালা দিয়ে বাইরে বের করে দেন জোসনা। কিন্তু নিজে আর ফিরে আসতে পারেননি—গভীর পানির নিচেই বাসের ভেতরে তার মৃত্যু হয়।
স্বামী পরিত্যক্ত জোসনা বেগম গত চার বছর ধরে ঢাকার বাইপাইল এলাকায় একটি গার্মেন্টসে কাজ করে সংসার চালাচ্ছিলেন। বড় ছেলে জেসানকে দর্জির কাজে প্রশিক্ষণ দিচ্ছিলেন, আর ছোট ছেলে আলীফকে মাদ্রাসায় ভর্তি করিয়েছিলেন। সীমাহীন কষ্টের মধ্যেও দুই সন্তানকে মানুষ করার স্বপ্ন ছিল তার। উদ্ধারের পর আলীফের কান্না ছড়িয়ে পড়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও টেলিভিশনে। পানির ওপর উঠে সে বিলাপ করতে থাকে—“মাগো, আমারে কে দেখবে, আমি একা হয়ে গেলাম।” সেই কান্নায় উপস্থিত সবার চোখে পানি চলে আসে।
দুর্ঘটনার তিন দিন পেরিয়ে গেলেও থামেনি আলীফ ও তার বড় ভাই জেসানের কান্না। আলীফ এখন প্রায় বাকরুদ্ধ, কিছু খাচ্ছে না, কারও সঙ্গে কথা বলছে না। জেসানও মায়ের শোকে ভেঙে পড়েছে। সে জানায়, “মা আমার কাছে দুই হাজার টাকা চেয়েছিল, দিতে পারিনি। এখন এই টাকায় কি হবে? সরকার আমার ছোট ভাইয়ের দায়িত্ব নিক।” জোসনার মা শাহেদা বেগম জানান, দুর্ঘটনার ঠিক আগে মেয়ে ফোন করে বলেছিল, “মা, সামনে বিপদ মনে হয়—এটাই হয়তো শেষ কথা।” এরপরই লাইন কেটে যায়। মেয়ের মৃত্যু সংবাদে তিনি বারবার জ্ঞান হারান। গত ২৪ মার্চ বিকেলে ঘটে যাওয়া এ দুর্ঘটনায় কুষ্টিয়ার কুমারখালী থেকে ছেড়ে আসা ‘সৌহার্দ্য পরিবহন’-এর বাসটি ফেরিতে ওঠার সময় নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে পদ্মায় তলিয়ে যায়। বাসটিতে প্রায় ৫৬ জন যাত্রী ছিলেন, যাদের অনেকেই ঈদের ছুটি শেষে কর্মস্থলে ফিরছিলেন।
দুর্ঘটনার পর স্থানীয়দের সহায়তায় কিছু যাত্রীকে জীবিত উদ্ধার করা হলেও এখন পর্যন্ত ২৬ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। উদ্ধার অভিযান চালিয়ে ডুবে যাওয়া বাসটিও উত্তোলন করা হয়েছে। রাজবাড়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দল যৌথভাবে উদ্ধারকাজ পরিচালনা করছে। এদিকে নিহত জোসনা বেগমের মরদেহ শনাক্তের পর পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা হয় এবং ২৪ মার্চ তাকে দাফন করা হয়। তবে মায়ের শূন্যতা এখনো মেনে নিতে পারছে না তার দুই সন্তান।
স্থানীয়দের দাবি, এই দুর্ঘটনায় ক্ষতিগ্রস্ত পরিবারগুলোর পাশে দাঁড়াতে সরকার ও সমাজের বিত্তবানদের এগিয়ে আসা জরুরি। আলীফ ও জেসানের মতো অসহায় শিশুদের ভবিষ্যৎ এখন সবার কাছে এক বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।