রুজমিলা হক, লন্ডন থেকেঃ ইরানের সাথে মার্কিন-ইসরায়েল সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে জ্বালানি তেলের দাম এক তৃতীয়াংশেরও বেশি বেড়ে ১০০ ডলারে পৌঁছেছে। ইরানের বিভিন্ন জাহাজ ও জ্বালানি অবকাঠামোর উপর বিমান হামলাসহ হরমুজ প্রণালি কার্যকরভাবে বন্ধ করে দেওয়ার ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে জ্বালানি তেলের দাম। হরমুজ প্রণালি জ্বালানি তেল সরবরাহের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ জলপথ, যা বিশ্বব্যাপী তেল সরবরাহের এক পঞ্চমাংশ বহন করে।

বর্তমানে জ্বালানি সংকটের প্রভাব এশিয়াতেই সবচেয়ে বেশি পড়েছে বলে বলা হচ্ছে। গত বছর শুধু এশিয়াতেই প্রায় ৯০% তেল ও গ্যাস সরবরাহ করা হয়েছিল হরমুজ প্রণালি দিয়ে। সাধারণ মানুষ তাদের ঘরবাড়ি গরম করার জন্য, যানবাহন-এর তেলের জন্য এবং বিদ্যুৎ উৎপাদনের জন্য এর উপর নির্ভর করে। এমনকি এই অঞ্চলগুলোর বড়ো বড়ো উৎপাদন কেন্দ্রগুলোর বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ব্যাবসা প্রতিষ্ঠানগুলো হুরমুজ প্রণালি বিরাট ভূমিকা পালন করে।

বিশেষ করে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া পারস্য উপসাগরে এই অবরোধের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় মধ্যে রয়েছে। এমনকি মালয়েশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার মতো যে-সব দেশ নিজেরাই তেল উৎপাদন করে আসছিলো, তারাও গত দশক ধরে ধীরে ধীরে উৎপাদন কমিয়ে আমদানির পরিমাণ বাড়িয়ে দিয়েছে। এই দুর্বলতা আংশিকভাবে মধ্যপ্রাচ্যে উৎপাদিত তেলের ধরন ও আশেপাশের দেশগুলো কীভাবে তা পরিশোধন করে তার সঙ্গে সম্পর্কিত। সেন্টার ফর স্ট্র্যাটেজিক অ্যান্ড ইন্টারন্যাশনাল স্টাডিজের জ্বালানি নিরাপত্তা ও জলবায়ু পরিবর্তন কর্মসূচির সিনিয়র ফেলো জেন নাকানো বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের অপরিশোধিত তেল সাধারণত ‘ভারী টক’ বা ‘মাঝারি টক’ হয়।

জেন নাকানো ব্যাখ্যা করেন, দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার তেল শোধনাগারগুলি এই ধরনের অপরিশোধিত তেল প্রক্রিয়াজাতকরণের জন্য স্থাপন করা হয়েছে এবং তা সহজেই পরিবর্তন করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সুইচ করা সহজ নয়। রিফাইনারির স্পেসিফিকেশনের জন্য উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের প্রয়োজন হবে বলেও তিনি বলেন। এই পরিস্থিতি অনেক দেশকে বিপাকে ফেলেছে। যেমন ফিলিপাইন তার প্রায় ৯৫% অপরিশোধিত তেল মধ্যপ্রাচ্য থেকে নিয়ে আসে। দেশটির রাষ্ট্রপতি ইতোমধ্যেই সরকারি কর্মীদের জ্বালানি সাশ্রয়ের জন্য চার দিনের কর্মসপ্তাহ ঘোষণা করেছেন।

বিশ্বের বিভিন্ন দেশের সরকার বাড়ি থেকে কাজ করার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন। সরকারি অফিসে এয়ার কন্ডিশনের তাপমাত্রা ২৬°এর চেয়ে বেশি নির্ধারণ করা সও অন্যান্য জ্বালানি সংরক্ষণমূলক পদক্ষেপ ঘোষণা করেছেন থাইল্যান্ডের জ্বালানি প্রতিমন্ত্রী। অন্যদিকে দক্ষিণ- পূর্ব এশিয়া খাদ্য আমদানির ওপর বাপক ভাবে নির্ভরশীল। যেমন সিঙ্গাপুর তার খাদের ৯০% আমদানি করে এবং ইন্দোনেশিয়ার গম আমদানির পুরটাই আসে দেশের বাহিরে থেকে।

আমদানি ব্যবস্থার সঙ্গে যোগাযোগ বা পরিবহন ব্যবস্থা ওতপ্রোতভাবে জড়িত। গত সপ্তাহে, জেট জ্বালানির দাম প্রায় ৬০% বেড়ে যাওয়ায় আমদানিখাতের পরিবহন খরচকেও সংবেদনশীল করে তুলেছে। তবে এশিয়ার বৃহত্তম অর্থনীতি, চীন, এই ঝড় মোকাবিলা করার জন্য সবচেয়ে ভালো অবস্থানে রয়েছে। বছরের পর বছর ধরে তেলের মজুত করে বিশ্বের বৃহত্তম তেল মজুদাগারে পরিণত হয়েছে, যা স্থায়ী হবে অন্তত কয়েক মাস বলে ধারণা করা হচ্ছে।

ইরানে অস্থিতিশীল পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পুরবেই অনানুষ্ঠানিকভাবে চীন লক্ষ লক্ষ ব্যারেল ইরানি তেল কিনেছে, যা মার্কিন নিষেধাজ্ঞার অধীনে রয়েছে। জাহাজ-ট্র্যাকিং তথ্য থেকে জানা যায় যে, এর কিছু এখনও আসছে। এটি ৪৬ মিলিয়ন ব্যারেলেরও বেশি ইরানি অপরিশোধিত তেল, যা বর্তমানে দক্ষিণ চীন সাগরে ভাসমান স্টোরেজে রয়েছে বলে তথ্য দিয়েছে বাণিজ্য বিশ্লেষণকারী গোষ্ঠী কেপলার।

চীনে বৈদ্যুতিক গাড়ির সংখ্যা বেশি হওয়ায় পেট্রলের দাম বৃদ্ধি তেমন প্রভাব ফেল বেনা বলেও ধারণা করেছে বিশেষজ্ঞরা। অন্যান্য এশিয়ান দেশগুলির তুলনায়, বিদ্যুৎ উৎপাদনের ক্ষেত্রে চীন তেলের উপর অনেক কম নির্ভরশীল-যার বেশিরভাগই কয়লা দ্বারা চালিত করা; রিয়ার পেট্রোলের দাম বৃদ্ধি চীনে কম তীব্রভাবে অনুভূত হবে, কারণ সেখানে বিক্রি হওয়া সমস্ত নতুন গাড়ির এক তৃতীয়াংশ। এশিয়া মহাদেশের অন্যান্য প্রধান অর্থনৈতিক, জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়া, আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থার (IEA) এর সাথে চুক্তি সাপেক্ষে জাতীয় মজুত থেকে লক্ষ লক্ষ ব্যারেল ছেড়ে দিতে সম্মত হয়েছে। তা সত্ত্বেও, ২০২২ সালে ইউক্রেন আক্রমণের পর রাশিয়ার তেল ও গ্যাস কম কেনার সিদ্ধান্ত নেওয়ার পর থেকে মধ্যপ্রাচ্যের জ্বালানির উপর নির্ভরতা বৃদ্ধি পেয়েছে জাপান এবং দক্ষিণ কোরিয়ার। ভিয়েতনামও জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধির চাপ অনুভব করছে। গত মাস থেকে সেখানে ডিজেলের দাম প্রায় ৬০% বেড়েছে। তেল কিনতে এই সপ্তাহে কিছু শহরে পেট্রোল পাম্পে মোপেড আরোহীদের দীর্ঘ লাইন ছিল। বাংলাদেশেও একই রকম দৃশ্য দেখা গেছে। বিশ্বজুড়ে পাম্পটি তেলের দাম বেড়েই চলেছে, যদিও সেই তুলনায় এশিয়ায় চাপ কিছুটা কম। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে পেট্রোলের গড় দাম এক মাস আগের তুলনায় ২৩% বেড়েছে, যেখানে ডিজেলের দাম এক তৃতীয়াংশ বেড়েছে। যুক্তরাজ্যে ডিজেলের দাম ৯% বেড়েছে।

রয়টার্সের মতে, ফ্রান্সের টোটাল এনার্জি জানিয়েছে যে তারা শুক্রবার থেকে মাসের শেষ পর্যন্ত তাদের স্টেশনগুলিতে পেট্রোল এবং ডিজেলের দাম সীমিত রাখবে। এদিকে যুক্তরাজ্যে, সেপ্টেম্বর থেকে জ্বালানি শুল্ক বৃদ্ধির পরিকল্পিত পরিকল্পনা পর্যালোচনা করা হচ্ছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে