
কে এম মিঠু, টাঙ্গাইল প্রতিনিধি।। পৃথিবীর আলো দেখার দুদিন পর প্রসূতি সাহেরা বেগম পরম আনন্দে নিজের নবজাতকের নাম রাখেন খুশি। কিন্তু মেয়ে সন্তান হওয়ায় বাবা খোরশেদ নাখোশ হন। সেই নাখুশির জেরে সাহেরাকে চিরতরে ছেড়ে যান খোরশেদ।
এমতাবস্থায় খুশিকে কোলেপিঠে করে ভাতের লড়াইটা একাই চালিয়ে যান মা সাহেরা। অন্যের বাড়িতে ঝি খেটে খেয়ে না খেয়ে বড় করেন খুশিকে। দুবেলা খাবারই যেখানে দুস্তর সেখানে মেয়েকে স্কুলে পাঠানোর কোন অবকাশ ছিলনা। তাই খুশির স্কুলে যাওয়া হয়নি। কুঁচকুঁচে কালো আর অপুষ্টির কৃশকায় শরীর নিয়ে বেড়ে উঠে খুশি। হাভাতের সংসার নির্ঝঞ্জাট করতে এগারো বছরের খুশিকে বিয়ের পিড়িতে বসানো হয়। পাত্র গোপালপুর উপজেলার জয়নগর গ্রামের উসমান পুত্র বাদশা। বাদশার কোন বাদশাহী ছিলনা। ছিলো চালচূলোবিহীন যাযাবর জীবন। দিন মজুর বাবা উসমান চার বিয়ে করেন। বাবা মারা যাবার আগে সৎ মা শেষ সম্বল বাড়ি ভিটে লিখে নেন। তাই পিতৃভিটা থেকে বিতাড়িত হন বাদশা। আশ্রয় নেন আলমনগর ইউনিয়ন পরিষদ ভবনের বারান্দায়। সেটিই ছিল মাথা গোঁজার একমাত্র ঠাঁই। পেট পূজার জন্য আলমনগর হাটে ঝাড়ুদারের কাজ নেন বাদশা।
২০১০ সালে খুশিকে বিয়ের পর ইউনিয়ন পরিষদের সেই একচিলতে বারান্দায় সংসার পাতেন। লাল রংয়ের মশারি টানিয়ে বাসর করেন। হাট ঝাড়ুর কাজে সামিল করেন খুশিকে। সারাদিন বাজার আর দোকানপাটে ঝাড়ামোছা ও খাটাখাটির পর পরিষদের বারান্দায় ঘুমাতেন দুজন।। এভাবেই রাত যায় দিন আসে। দুই বছর পর কোল জুড়ে আসে প্রথম সন্তান ফজিলা (৮)। এরপর খায়রুল (৪) আর ফাতেমা (১)। বারান্দায় যখন পাঁচজনের স্থান সংকুলান হচ্ছিলনা তখন আলমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মোমেনের প্রচেষ্টায় এবং গোপালপুর উপজেলা প্রশাসনের ব্যবস্থাপনায় মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উপহার আলমনগর আশ্রয়ন প্রকল্পের পাকা ঘর বরাদ্দ পান খুশি। কদিন আগে তিন সন্তানকে নিয়ে সেই ঘরে উঠেন। এ ঘর যেন খুশির কাছে হীরামন অট্রালিকা। আর বাদশার কাছে বহুকাঙ্খিত বাদশাহী। খুশি বেগম জানান, ‘আমাগোর বিশ্বাসই অইছিলনা যে এমন একটা ঘর পামু। তুফানবৃষ্টিয়ে বাচ্চাগো নিয়া কতো কষ্ট করছি।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা আমাগোর মতো গরীব মাইনষের থাকবার জন্যি কতো সুন্দর ঘর দিছে। আল্লাহ যেন তারে ভালো রাহে।’ বাদশা জানান, ‘জীবনে কাচা ঘর বানারোর সাধ্য ছিলনা। তাই কহনো পাকা ঘর পাওনের স্বপ্ন দেহি নাই। কিন্তু প্রধামন্ত্রী শেখ হাসিনার জন্যিই আমরা স্বপ্নের ঘর পাইছি। মাথা রাহনের জায়গা পাইছি। আল্লাহ তারে বাঁচায়ে রাহুক।’ খুশি বেগমের দু’ঘর পরেই সবুজ রংয়ের চকচকে নতুন ঘরে উঠেছেন ভূমিহীন বিধবা সাহেরা (৬৫)। দিন মজুর স্বামী মো. উমেদ আলী পরপারে গেলে উঠুলী (পরের বড়িতে) থেকে পাড়ায় ঝিঁএর কাজ করতেন। দুই সন্তানের মধ্যে মেয়েটা ঢাকায় বাসাবাড়িতে কাজ করে। ছেলেটা দিনমজুর। কেউই খোঁজ রাখেনা তার। দুই বছর আগে শেখ হাসিনা সরকারের বয়স্কভাতা পেয়েছেন। এবার পেলেন মাথা গোঁজার ঠাঁই। সাহেরা জানান, ‘তিন কাল চইলা গেছে। এহন এক কাল আছে। হেস কালটা শেখ হাসিনার দেয়া ঘরেই কাটাইয়া দিবার চাই।’ সাহেরার এক ঘর পরই উত্তর দুয়ারী ঘরে নিবাস গড়েছেন নিবারণ নাথ। জন্মস্থান ঝাওয়াইল ইউনিয়নের সোনামুই। বাবা ত্রৈলোক্য নাথ বেচে থাকতেই অনটনে জমির কিছুটা বেচা হয়, বাকিটা প্রভাবশালীরা বেদখলে নেয়। বাবা স্বর্গীয় হওয়ার পর পৈত্রিক ঋণ পরিশোধে ভিটে বেচে উদ্বাস্তু হন নিবারণ। শ্যাওলার মতো ভেসে উঠুলি হন বীরনলহরার ক্ষিতিশ নাথের ভিটায়। সেখানেই কাটে জীবনের তিন দশক । লাকড়ি চিরিয়ে, নারকেল গাছ সাফ করে পেট চালাতেন নিবারণ। তিনি জানান, ‘শেখের বেটি আছে বইলাই আমাগোর মতন ভাসা পানারা কূল পাইছে। ভগবান তারে ভালো রাহুক।’ গোপালপুর-ভূঞাপুর সড়কের পাশে বাঁশ, খড় আর পলিথিনে ছাওয়া ঘরে বাস ছিল বুলবুলির। সড়কের উন্নয়ন কাজ শুরু হলেই ঘর ভাঙ্গা পড়তো। আবার ঝড়তুফানেও উড়ে যেতো জীর্ন ঘর। তখন গাছতলা আর স্কুল ঘর ছিল অস্থায়ী নিবাস। অসুস্থ স্বামী আর দুই বাচ্চা নিয়ে ছিল বিড়ম্ভিত জীবন। দুই মাস আগে মির্জাপুর ইউনিয়নের খানপাড়া আশ্রয়ন প্রকল্পে পাকা ঘর পান বুলবুলি। মুজিববর্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পাকা ঘর উপহার পেয়ে দারুন উৎফুল্ল তিনি।
মূল ধারার জনগোষ্ঠি ছাড়াও ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠির ভূমিহীনরাও পেয়েছেন প্রধান মন্ত্রীর উপহার। এদেরই একজন ঝাওয়াইল বাজারের পুস্প বাগদী । বাজারের খাস জমিতে আরো ৩৫ ঘর বাগদীর বসবাস। চরম দারিদ্র্য আর অশিক্ষার বিরুদ্ধে লড়াই করা জীবন ওদের। পুস্পের স্বামী অমর বাগদী পেশায় ঝাড়ুদার। জীর্ন ও নড়বড়ে ঘরে তিন বাচ্চা নিয়ে দুর্বিসহ জীবন ছিল ওদের। মাস খানেক আগে জীর্নঘর ছেড়ে পাকা ঘরে উঠেছেন পুস্প। এ ঘরে এখন আনন্দের বন্যা। ভূমিখেকোদের ষড়যন্ত্রে স্বগোত্রীয়দের সাথে খাসজমি থেকে বার কয়েকবার উচ্ছেদ হয়েছে পুস্পের পরিবার।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রী এবার জমি ও ঘর এক সাথে দেয়ায় এখান থেকে আর উচ্ছেদ হওয়ার আশঙ্কা নেই বলে পরম স্বস্তি পুস্পের। সামনে বরাদ্দ এলে উচ্ছেদ আতঙ্কে বসবাস করা ভূমিহীন বাগদীরা যেন অগ্রাধিকার পান সেদিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করেন পুস্প। একইভাবে টাঙ্গাইলের গোপালপুর উপজেলার ভেঙ্গুলা, দৌলতপুর, নলিন, ধোপাকান্দি ও হাদিরা আশ্রয়ন প্রকল্পের পাকা ভবনে ঠাঁই পেয়েছেন অনগ্রসর, দরিদ্র ও ভূমিহীন ৬৮ পরিবার। আলমনগর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান অধ্যাপক আব্দুল মোমেন জানান, গুচ্ছগ্রাম প্রকল্প মাননীয় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার একটি মানবিক প্রকল্প। অতীতে কোন সরকারই তৃণমূলের এমন অবহেলিত, বঞ্চিত ও দারিদ্রপীড়িত মানুষের মৌলিক অধিকার বাসস্থানের কথা এভাবে ভাবেননি। গোপালপুর উপজেলা নির্বাহী অফিসার পারভেজ মল্লিক জানান, এদেশে কেউই আর গৃহহীন থাকবেন না এটিই মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর চলমান আশ্রয়ন প্রকল্পের মূল উদ্দেশ্য। গোপালপুর উপজেলায় দ্বিতীয় পর্যায়ে আরো ৯০টি পাকা ঘর নির্মাণ করা হবে। এর মধ্যে ৪০টির কাজ শেষ। খুব দ্রুতই বাকিগুলোর কাজ সমাপ্ত হবে।
জেলা প্রশাসক মোঃ আতাউল গনি জানান, টাঙ্গাইলের ১২টি উপজেলায় মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর শীর্ষ অগ্রাধিকার প্রকল্প আশ্রয়ন প্রকল্প ০২ এর আওতায় ২ হাজার ১৮৫টি পাকা ঘর নির্মাণ হচ্ছে। নিম্নাঞ্চলে কিছু ঘর নির্মাণ বাকি রয়েছে। জুনের মধ্যেই তা শেষ হবে। এ ছাড়াও জেলায় কর্মরত প্রশাসনিক কর্মকর্তা, রাজনীতিবিদ এবং দানশীল ব্যক্তিদের অনুদানে বেসরকারিভাবে আরো শ’খানেক পাকা ঘর নির্মাণ হচ্ছে। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবের জন্মশত বার্ষিকীকিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন নিরলসভাবে ভাবে কাজ করছেন। স্থানীয় সাংসদ ছোট মনির জানান, বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা একটি বৈষম্যহীন বাংলাদেশ গড়ার জন্য কাজ করছেন। কেউ গাছতলায় আর কেউ একশ তালায় থাকবে এমন বৈষম্য তিনি চাননা। ক্ষুধামুক্ত বাংলাদেশ গড়ার পর মাননীয় প্রধানমন্ত্রী যে ভিশন গ্রহন করেছেন তাতে আগামী পাঁচ বছরের মধ্যে সকল ভূমিহীন, সকল গৃহহীন মানুষ পাকা ঘর পাবেন। সকল মানুষকে সুখি সমৃদ্ধ বাংলাদেশ তিনি উপহার দিতে যাচ্ছেন।
টাঙ্গাইল নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ




























