আবু হেনা মোস্তফা কামাল, ফরিদগঞ্জঃ পাঁচ সদস্যের একটি দরিদ্র্য পরিবার। বাবা-মা, দুই বোন ও এক ভাই ফয়েজ খান। বাবার সামান্য আয়ে পড়ালেখা করা হয়নি ফয়েজ খানের। ছোট দুই বোন- তাদেরকে মানুষ করতে হবে। দু’বোনের পড়ালেখা বন্ধ করা যাবে না। সংসারের হাল ধরতে কিশোর ফয়েজ খান নেমে পড়ে রাস্তায়। দিন মুজুরি করে। দিন শেষে নিয়মিত বাড়ি ফিরতো। বাবা-মা ও বোনদের হাতে পছন্দের নানা সামগ্রী তুলে দিতো। পরিবারের সবাই নিয়ম করে ফয়েজের ফেরার পথে চেয়ে থাকতেন। সংসারে সুখের আশায় ব্যাংক থেকে লোন করেন বাবা আবদুল লতিফ। ফয়েজ খানকে ব্যাটারি চালিত একটি অটোবাইক কিনে দেন। বাইকটি ফয়েজের নিয়মিত সঙ্গী হয়ে ওঠে। দরিদ্র্য পরিবারে অটো বাইক তো নয়, যেনো উড়োজাহাজ। জাহাজ দৌড়ে প্রতিদিন সন্ধ্যা রাতে বাড়ি ফেরে ফয়েজ। ২৮-এ মার্চ রবিবার রাত গভীর হতে থাকে। কিন্তু, ফয়েজ বাড়ি ফেরে না। পার্শ্ববর্তী ধানুয়া বাজারসহ বিভিন্ন স্থানে খোঁজ নেন বাবা। কোথাও সন্ধান মেলে না আদরের পুত্রধনের। অবশেষে খোঁজ মেলে এবং বাড়ি ফিরে ফয়েজ। তবে, দেহটা নিস্তেজ-নিথর। পচে-গলে গেছে। নির্জন স্থানে নিয়ে ক’দিন পূর্বেই নির্মমভাবে তাকে খুন করা হয়েছে। কান্নার রোল পরে বাড়িময়। কান্না এখনও থামেনি। এ কান্না থামার নয়।

পুলিশ জানিয়েছে, গলিত মৃতদেহ উদ্ধার করেছে থানা পুলিশ। উদ্ধারের সময়ে তার হাত-পা বাঁধা ও গলায় ধারালো অস্ত্র দ্বারা কাটার চিহ্ন ছিলো। নিখোঁজ রয়েছে অটোরিক্সাটি। এর আগে অটোরিক্সাসহ চারদিন তিনি নিখোঁজ ছিলেন। নিখোঁজের দ্বিতীয় দিন ফরিদগঞ্জ থানায় জিডি করেন তার বাবা আবদুল লতিফ। স্থানীয় লামচর গ্রাম থেকে মৃতদেহটি উদ্ধার করা হয় ১লা এপ্রিল রাত ৯ ঘটিকায়। পরদিন সকালে পোস্ট মর্টেমের জন্য মৃতদেহ চাঁদপুর মর্গে পাঠানো হয়। গতকাল সোমবার পর্যন্ত মামলার কোনো অগ্রগতি হয়নি। এলাকায় শোকের ছায়া বিরাজ করছে। পুলিশ ধারণা করছে, অটোরিক্সাটি ছিনতাই এর জন্য খুন করা হয়েছে ফয়েজ খানকে। এ ব্যপারে ফরিদগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মমলা দায়ের করা হয়েছে।

রবিবার দুপুরে নিহত ফয়েজ খানের বাড়ি গিয়ে কথা হয় বাবা-মা ও এলাকাবাসীর সঙ্গে। উপজেলার গোবিন্দপুর (উঃ) ইউপির ধানুয়া গ্রামের আবদুল লতিফ-এর ছেলে ফয়েজ খান (১৮)। মাথা গোঁজার জন্য নেই দালান-কোঠা। অর্থকড়ি, শান-শওকত নেই। নেই জমি-জিরাত। গোয়ালে গরু ও পুকুরে মাছ। পুরনো, ঝাঁজরা পরা টিনের একটি ঘর দারিদ্র্যের সাক্ষী হয়ে আছে। ঘরের নানা স্থান ভেঙ্গে গেছে। ভেতর থেকে দেখা যায় নীল আকাশ। তিন-ভাই বোনের মধ্যে আনন্দের কমতি ছিলো না। বাবা-মা’র স্নেহের পরশে মায়া-মমতায় ভরে থাকতো পরিবারটি। দু’বোনকে মানুষ করা, সংসারের দারিদ্র্য আবদুল লতিফ বলেছেন, জীবিকার সন্ধানে রোজকার মতো ২৮-এ মার্চ সকালে বাড়ি থেকে অটোরিক্সা নিয়ে বের হন তার সন্তান। দুপুরে বাড়ি গিয়ে খাবার খায়। এরপর, বরাবরের মতো রাতে বাড়ি ফিরে যায়নি। সারা রাত সন্তানের পথ চেয়ে থাকেন বাবা-মা। পরদিন সকাল গড়িয়ে বিকালেও বাড়ি ফিরেনি। ২৯-এ মার্চ সন্ধ্যায় ফরিদগঞ্জ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরী (নং ১৪৬৩, তারিখ: ২৯-০৩-২০২১ খ্রিঃ) করেন আবদুল লতিফ।

আবদুল লতিফ জানান, এসআই মহসীন কবির পহেলা এপ্রিল সন্ধ্যার পর কল দিয়ে তাকে থানায় যেতে বলেন। থানায় গেলে, তাকে সঙ্গে নিয়ে ১০ নং গোবিন্দপুর (দঃ) ইউনিয়নের লামচর গ্রামে রওয়ানা দেন মহসীন কবির। সন্ধ্যা নাগাদ পাওয়া সংবাদের ভিত্তিতে উপস্থিত হন গ্রামের কালি মন্দিরের পাশে। সেখানে জনৈক শিপন-এর পরিত্যাক্ত ঘরে একটি গলিত মৃত দেহ পরে ছিলো। মৃত দেহটি দেখানো হলে আবদুল লতিফ তার একমাত্র সন্তান ফয়েজ খানের বলে শনাক্ত করেন। ছেলের মৃতদেহ দেখে হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন বাবা।
এ ব্যপারে কথা হয় এসআই মহসীন কবির এর সঙ্গে। জানতে চাইলে তিনি বলেন, হারানো জিডি মামলার তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় আমাকে। আমি সেদিন স্থানীয় ধানুয়া, গাজীপুর ও চৌরঙ্গী বাজারে খবর নেই। শিপনের বাবাও এলাকায় মাইকিং করেন। পরে কল লিস্ট তুলি। লিস্টে দেখা যায় ২৮ তারিখ রাত সাড়ে ৮টায় সর্বশেষ ফয়েজ খান তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেন, কল লিস্ট পর্যালোচনা করে দেখা যায় ফয়েজ খানের মৃতদেহ যেখানে পাওয়া গেছে, সর্বশেষ তিনি সেখান থেকেই মোবাইল ফোনে তার বাবার সঙ্গে কথা বলেছেন। অপর এক প্রশ্নের উত্তরে মহসীন কবির বলেন, ব্যাটারি চালিত অটোরিক্সাটি নিখোঁজ রয়েছে।

ফয়েজ খানের বাবা আবদুল লতিফ বলেছেন, তার তিন সন্তানের মধ্যে একমাত্র ছেলে ফয়েজ খান। অপর দুজন আট ও তিন বছরের কন্যা সন্তান। ফয়েজের ইচ্ছায় ব্র্যাক ব্যাংক থেকে এক লাখ টাকা কিস্তি তুলে রিক্সাটি কিনেছি। শর্ত ছিলো, ১২ কিস্তিতে এক লাখ ২০ হাজার টাকা জমা দিতে হবে। মাত্র পাঁচ কিস্তি জমা দিয়েছি। এরমধ্যে অজ্ঞাতনামা খুনী আমার ছেলের জীবন কেড়ে নিয়েছে। টাকা নিয়ে অটোবাইক কেনার কথা ব্র্যাক ব্যাংকের ম্যানেজারকে বলেছি। তিনি বলেছেন, আসল টাকা জমা দিতেই হবে। তিনি সুদের অংশ মওকুফ করতে পারবেন। বলে তিনি হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙ্গে পরেন।এদিকে, মৃতদেহ উদ্ধারের পর ফরিদগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা (নং ৪, তারিখ: ০২-০৪-২০২১ খ্রিঃ) রুজু করা হয়েছে। বাদী হয়েছেন বাবা আবদুল লতিফ। হত্যা মামলার তদন্ত কর্মকর্তা এসআই জামাল মুঠোফোনে বলেন, মামলার কোনো অগ্রগতি এখনও হয়নি। তবে, চেষ্টা চলছে।

নিহত ফয়েজ খানের বাড়ি গিয়ে দেখা যায় শোকের ছায়া বিরাজ করছে বাড়িতে। আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীরা শান্তনা দিচ্ছেন তার বাবা-মাকে। প্রায় সকলের এক প্রশ্ন- মানুষ এতো পাষন্ড হয় কি করে। একটি অটোরিক্সার জন্য একজন মানুষ খুন করে ফেললো। লোকজন জানান, নিহত ফয়েজ খান অত্যন্ত নম্র ও নিরীহ প্রকৃতির ছিলেন। এলাকার কারও সঙ্গে কখনও অসদাচরণ করতে দেখা যায়নি তাকে। বাবা আবদুল লতিফ মাঝেমধ্যে ভাড়ায় একটি সিএনজি চালান। ফয়েজ খানের আয়ে তাদের পাঁচ সদস্যের সংসারে স্বচ্ছলতার মুখ দেখছিলেন। এলাকাবাসী এ ঘটনার যথাযথ বিচার ও নিহতের পরিবারের জন্য ক্ষতিপূরণ দাবী করেছেন।

ফরিদগঞ্জ থানার অফিসার ইনচার্জ শহীদ হোসেন করোনা আক্রান্ত হয়ে আইসোলেশনে আছেন। চার্জে আছেন পরিদর্শক (তদন্ত) বাহার মিয়া। তিনি জানিয়েছেন, ফয়েজ খানের বাবার আবেদনের প্রেক্ষিতে একটি হত্যা মামলা লিপিবদ্ধ করা হয়েছে। জানতে চাইলে তিনি বলেছেন, হাত ও পা বাঁধা, গলায় কিছুটা কাটা অবস্থায় আমরা ফয়েজ খানের মৃতদেহ উদ্ধার করেছি। শরীর অর্ধ গলিত হয়ে গেছে। অটোরিক্সাটি পাওয়া যাচ্ছে না। এতে, ধারণা করা হচ্ছে অটোরিক্সার জন্য ফয়েজ খানকে খুন করা হতে পারে। এক প্রশ্নের উত্তরে তিনি বলেছেন, ঘটনার সঙ্গে জড়িত নয়- আমরা কাউকে আঠক করতে চাই না। তাই মামলার প্রক্রিয়া টেকনিক্যাল পথে এগোচ্ছে।

জেলা ডেস্ক ।। বিডি টাইমস নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে