কুষ্টিয়া নিউজ ডেস্ক ।। ভূয়া নিবন্ধন সনদে এমপিওভুক্ত প্রমানিত হওয়ার পরও ৬ বছর ধরে চাকরিতে বহাল রয়েছেন কুষ্টিয়ার কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক পলি রাণী পাত্র। শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের যুগ্ন পরিচালক প্রফেসর মো. মফিজ উদ্দিন আহমেদ ভূইয়া, উপপরিচালক এস এম কামরুজ্জামানকে নিয়ে গঠিত দুই সদস্য বিশিষ্ট তদন্ত কমিটির গত ২০১৪ সালের ৩ মার্চ তারিখে পলি রাণী পাত্রের বিরুদ্ধে অভিযোগের সত্যতা পেয়ে ওই দুই তদন্ত কর্মকর্তা লিখিতভাবে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে জানান এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের সুপারিশ করেন।
অভিযুক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে এনটিআরসিএ কর্তৃক মামলার নির্দেশ দেওয়া হলেও আজ অবধি মামলা করা হয়নি ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে। উল্টো বন্ধ হয়ে যাওয়া সরকারি অংশের বেতন প্রাপ্তির জন্য কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিরুদ্ধে অভিযুক্ত শিক্ষকের পক্ষে মামলার পায়তারা করছেন ওই বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেম।
তদন্ত প্রতিবেদন সূত্রে জানা যায়, কারিগরি শাখার ভাষা ইংরেজি শিক্ষক পলি রানী পাত্র ২০১১ সালে ২’রা এপ্রিল কুমারখালী পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে যোগদান করেন এবং ২০১১ সালের ২৬’শে এপ্রিল প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেম কর্তৃক সাক্ষরিত আবেদন পত্রসহ অন্যান্য সকল কাগজপত্র সরকারি অংশের বেতন ভাতাদি প্রাপ্তির জন্য জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তার ফরওয়াডিংয়ে ২০১১ সালের ২৮’শে এপ্রিল বাংলাদেশ কারিগরি শিক্ষা অধিদপ্তরে প্রেরণ করা হয়। যার স্মারক নম্বর- ২০৪১/১ এবং তারিখ-২৮/০৪/২০১১।
প্রধান শিক্ষকের আবেদনের ভিত্তিতে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা কর্তৃক এমপিওভুক্তির জন্য প্রেরিত কাগজ পত্রে ভোকেশনাল শাখার ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে পলি রানী পাত্রকে উল্লেখ করা হয়। বেসরকারি কারিগরি মাধ্যমিক বিদ্যালয় ভোকেশনালের শিক্ষক কর্মচারীদের এমপিও তালিকাভূক্ত করনের জন্য কারিগরি শিক্ষা অধিপ্তরের সরবরাহকৃত তথ্য ছকের (ক) ব্যক্তিগত তথ্য ছকের ৯ নম্বর কলামে নিবন্ধন সনদ বিষয়ে ইংরেজিতে নিবন্ধিত হওয়ার কথা পলি রানী পাত্র উল্লেখ করেন যার সনদ নম্বর-২১৭৪ এবং পরিক্ষার বছর উল্লেখ করেন ২০০৭ ইংরেজি সন। এতে স্বাক্ষর করেন স্কুল পরিচালনা পর্ষদের সভাপতি, প্রধান শিক্ষক ও অভিযুক্ত পলি রানী পাত্র। কিন্তু পলি রানী পাত্রের ইংরেজি বিষয়ের নিবন্ধন সনদ ভূয়া বলে এনটিআরসিএ থেকে প্রমাণিত হয়েছে। তবে তার রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে নিবন্ধন রয়েছে বলে জানিয়েছেন মন্ত্রণালায় কর্তৃক গঠিত তদন্ত কমিটি। পলি রানী পাত্র কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের ভোকেশনাল শাখার সহকারী শিক্ষক ইংরেজি পদে তার এমপিও তালিকাভুক্তির জন্য ইংরেজি শিক্ষক হিসেবে উল্লেখিত তথ্য সরবরাহ করেন নিবন্ধন নম্বর ৭০০২৯৬৫/২০০৭, রোল নম্বর-১১০৬০৯৮০। পিতা নিমাই চন্দ্র পাত্র।
বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ এনটিআরসিএ কর্তৃক পলি রাণী পাত্রের ইংরেজি নিবন্ধন সনদ যাচাই বাছাই করা হয়। যাচাইপত্রের স্মারক নম্বর-বেশিনিক/প.মু.প্রা./পরীক্ষা-৩/সনদ যাচাই/৩৫৩/১০/৫৮৮, তারিখ ৩০ ডিসেম্বর২০১২ খ্রিস্টাব্দ।পলি রাণী পাত্র, পিতা নিমাই চন্দ্র পাত্র পদ ও বিষয় সহকারী শিক্ষক ইংরেজি রোল নম্বর-১১০৬০৯৮০, নিবন্ধন নম্বর ৭০০২৯৬৫/২০০৭। সনদকে সঠিক নয় বলে জানায়। এছাড়াও পলি রানীর ইরেজি নিবন্ধন সনদটি ডিআইএ‘র খুলনা বিভাগীয় শাখায় রক্ষিত নিবন্ধন পরীক্ষার ফলাফলের সনদের সফট্ কপি যাচাই করেও এ সনদের সঠিকতা পাওয়া যায়নি। পলি রানী পাত্র কর্তৃক জাল জালিয়াতির অশ্রয় নেওয়ার বিষয়ে প্রধান শিক্ষক, কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়কে জানানো হয় এবং যাচাইপত্রের অনুলিপি কুষ্টিয়া জেলা প্রশাসক, জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা, কুমারখালী থানা কুষ্টিয়াকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করে পত্র প্রেরণ করা হয়।
এনটিআরসিএথেকে পাঠানো পলি রানী পাত্রের ইংরেজি নিবন্ধন সনদ সঠিক নয় এমন চিঠি কুমারখালী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা প্রাপ্তির পর কুমারখালী পাইলট বালিকা মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেমকে পলি রানীর বিরুদ্ধে ফৌজদারী মামলা করার পরামর্শ দেন। কিন্তু প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেম এ ব্যাপারে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করেননি। বরং পলি রানী পাত্রকে ২০১৩ সালের জুন মাসে সরকারি অংশের বেতন পাওয়ার জন্য এমপিওভুক্ত হতে সহযোগিতা করেছেন। যার ইনডেস্ক নম্বর-১৩১৬০০০৮ বিষয় বাংলা এবং এমপিও শীটে বেতন কোড ১০, বেতন স্কেল-৮০০০ টাকা সহকারী শিক্ষক (অঞ) উল্লেখ রয়েছে।
এদিকে প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেম তদন্ত কর্মকতার নিকট পলি রানী পাত্রের নিয়োগ সংক্রান্ত কাগজপত্র উপস্থাপনের সময় ইংরেজি বিষয়ের নিবন্ধন সনদের পরিবর্তে রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিবন্ধন সনদ প্রদান করেন। প্রধান শিক্ষক অন্য সকল কাগজপত্র স্পষ্টভাবে প্রদান করলেও রাষ্ট্রবিজ্ঞানের নিবন্ধন সনদ অস্পষ্ট ঝাপসা অবস্থায় প্রদান করেন বলেও তদন্ত কর্মকর্তারা উল্লেখ করেন। এব্যাপারে জেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস এম জায়েদুর রহমান তদন্ত কর্মকর্তাদের জানান কারিগরি শিক্ষক ভাষা হিসেবে নিয়োগ পেতে হলে অবশ্যই ভাষায় ইংরেজি/বাংলা বিষয়ে নিবন্ধনকৃত হতে হবে। নিবন্ধন সনদ যদি রাষ্ট্রবিজ্ঞান বিষয়ে হয় তাহলে ভাষা শিক্ষক (ইংরেজি) হিসেবে তার নিয়োগ যথাযথ হবে না। এসব অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পর থেকে পলি রাণী পাত্রের সরকারি অংশের বেতন বন্ধ হয়ে যায়। তার বেতন এখন অবধি বন্ধ থাকলেও প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেম অনৈতিক সুযোগ নিয়ে ওই শিক্ষিকার বেতন চালুর জন্য কারিগরি শিক্ষা বোর্ডের বিরুদ্ধে মামলার পায়তারা করছেন বলে একটি বিশ্বস্ত সূত্র এই প্রতিবেদককে নিশ্চিত করেছে।
প্রতারণা ও সনদ জাল জালিয়াতি একটি ফৌজদারী অপরাধ হওয়া শর্তেও প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেম পলি রাণী পাত্রের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ বা বহিষ্কার না করে উল্টো তাকে এসব অভিযোগ থেকে বাঁচাতে এবং বেতন পাইয়ে দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছেন। সাংবাদিক পথিকৃৎ কাঙাল হরিনাথ মজুমদারের স্মৃতি বিজড়িত ঐতিহ্যবাহী বিদ্যালয়ে একজন শিক্ষক সনদ জালিয়াতির প্রমাণিত হলেও এখনও অবধি শিক্ষক হিসেবে চাকরিতে বহাল থাকায় কুমারখালী উপজেলার সচেতন মহলে নতুন করে সমালোচনার সৃষ্টি হয়েছে। এ বিষয়ে প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেম মুঠোফোনে বলেন, এখন ওই শিক্ষকের বেতন বন্ধ রয়েছে। ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে কেন ব্যবস্থা নেননি এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, অনেক রকম রাজনৈতিক ব্যাপার থাকে সেটা আসলে ফোনে বলা যাবে না।
প্রধান শিক্ষক মোহা. আবুল কাশেমকে এ ব্যাপারে আরও প্রশ্ন করা হলেও তিনি ফোনো এর চেয়ে বেশি কিছু বলতে রাজি হননি। নব্য জাতীয়করণকৃত কুষ্টিয়ার কুমারখালী সরকারি পাইলট মাধ্যমিক বালিকা বিদ্যালয়ে আরোও ৫/৬ জনের নিবন্ধন সনদ জাল আছে। ইতিমধ্যে শিক্ষকদের পদায়নের জন্য মাধ্যমিক ও উচ্চ শিক্ষা বিভাগ থেকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয় প্রস্তাব পাঠানো হয়েছে।
কুষ্টিয়া নিউজ ডেস্ক।। বিডি টাইম্স নিউজ





























