পুরনো জঞ্জাল সরিয়ে উন্নত, সুন্দর, সচল এবং সুশাসিত ঢাকা সিটি করপোরেশন গড়ার ইশতেহার দিয়েছেন ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন নির্বাচনে আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। বুধবার বেলা পৌনে ১২টায় বঙ্গবন্ধু অ্যাভিনিউয়ে আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে এ ইশতেহার দেন তিনি।
আমাদের ঢাকা, আমাদের ঐতিহ্য- এই স্লোগানে জনকল্যাণমুখী ও সমন্বিত কর্মকাণ্ডের মাধ্যমে উন্নত ঢাকা গড়ে তুলতে পাঁচটি রূপরেখা দেন তিনি। তিনি বলেন, অনেক সময় পেরিয়ে গেছে, উন্নত ঢাকা গড়তে ঢাকাকে সঠিক নেতৃত্বে আনতে হবে। তরুণ প্রজন্মকে পথ চলার আস্থা, শক্তি ও সাহস হিসেবে উল্লেখ করে তিনি জানান, ২৪ ঘণ্টা নাগরিক সেবা দিতে খোলা থাকবে দক্ষিণ ঢাকা সিটি করপোরেশন। সপ্তাহে অন্তত ১ দিন নগরবাসীর সমস্যা নিয়ে তিনি নিজে বসবেন। তাপস বলেন, নির্বাচিত হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে সব নাগরিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে নগরবাসীর জন্য। নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের জনগণের আধুনিক সুযোগ সুবিধা নিশ্চিত করা হবে। হোল্ডিং ট্যাক্স বাড়ানো হবে না। পাঁচ কর্মদিবসে ব্যবসায়ীরা পাবেন ব্যবসায়িক লাইসেন্স।
আইন বিধি ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে ঢাকার উন্নয়ন ও সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সিটি করপোরেশনের কাছে সমন্বিতভাবে দায়বদ্ধ করা হবে বলে জানান ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপস। তিনি জানান, প্রয়োজনে সিটি করপোরেশনের জন্য নিজস্ব অগ্নিনির্বাপক দল গঠন করে অলি গলি সরু রাস্তায় সেবা দেয়া হবে।
মেয়র নির্বাচিত হলে রাজধানীর ফুটপাত দখলমুক্ত করার সঙ্গে সঙ্গে হকারদের তথ্য ভাণ্ডার করে তাদের পুনর্বাসিত করার প্রতিশ্রুতিও দিয়েছেন তিনি। সচল ঢাকার যে রূপরেখা রয়েছে সেখানে পর্যায়ক্রমে একটি মহাপরিকল্পনার আওতায় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন এবং সচল ঢাকা গড়ে তোলার কথা বলা হয় ইশতেহারে। তিনি তার ইশতেহারে আরো জানান, মাদক ও সামাজিক অবক্ষয় নির্মূলে পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কার্যকর করা হবে। মশা নিধনে দৈনন্দিন ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
আওয়ামীলীগের এই মেয়র প্রার্থী আরো জানান, নির্বাচিত হলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকাকে ঐতিহ্যের প্রাঙ্গণ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। এছাড়া তিনি জানান, নগর অ্যাপ চালু করে নাগরিকদের অভিযোগ পেতে হেল্প লাইন করা হবে। ২৪ ঘন্টার মধ্যে সমস্যা সমাধান না হলে মেয়রের সঙ্গে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারবেন নাগরিকেরা।
আওয়ামীলীগের এই মেয়র প্রার্থী ব্যারিস্টার শেখ ফজলে নূর তাপসের পাঁচ রূপরেখা:
১। ঐতিহ্যের ঢাকা: চারশত বছরের পুরনো আমাদের এই ঢাকার রয়েছে নিজস্ব ইতিহাসের উজ্জ্বল ছবি, ঐতিহ্যের গভীর শেকড় ও প্রত্নতাত্ত্বিক গুরুত্ব। পর্যটনের জন্যও হতে পারে অপার সম্ভাবনার ক্ষেত্র। এখানে ঐতিহ্যবাহী খাবারের স্বাদও অনন্য। সাংস্কৃতিক ধারায় রয়েছে ঈদুল ফিতর, ঈদুল আয্হা, পহেলা বৈশাখ, ঘুড়ি উৎসব, চৈত্র সংক্রান্তি-সহ অজস্র উৎসব। আমি র্নিবাচিত হলে ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকাকে ‘ঐতিহ্য প্রাঙ্গণ’ হিসেবে গড়ে তোলা হবে। সকলকে নিয়ে সমন্বিত প্রয়াসে যাদুঘর ও আর্ট গ্যালারি নির্মাণ ও প্রদর্শনীসহ নগরীর ঐতিহাসিক বৈশিষ্ট্যপূর্ণ স্থাপনা সংরক্ষণে মহাপরিকল্পনা ও সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে পুরনো ঢাকার ঐতিহ্যকে পুনরদ্ধার ও সংরক্ষণ করে ঢাকাকে তার স্বকীয় গৌরবে সাজিয়ে তুলে ধরবো বিশ্ব দরবারে।
২। সুন্দর ঢাকা: বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যা দুই নদীর অববাহিকায় পত্তন হওয়া আমাদের এই ঢাকা, এমন শহর পৃথিবীতে বিরল! সুন্দর ঢাকা গড়ে তুলতে প্রয়োজনীয় সংখ্যক উদ্যান নির্মাণ, সবুজায়ন, ছাদবাগানে উৎসাহ, পরিবেশ বান্ধব স্থাপনা বৃদ্ধি, বায়ুও শব্দ দূষণ রোধ করাসহ শরীর ও চিত্তবিনোদনের জন্য প্রতিটি ওয়ার্ডে খেলার মাঠ, শরীর চর্চা কেন্দ্র এবং নারী-শিশু ও প্রবীণদের জন্যে হাঁটার উন্মুক্ত স্থান, আধুনিক মানের কমিউনিটি সেন্টারের ব্যবস্থা। সর্বসাধারনের সুবিধার্থে সাধারণ ও ভ্রাম্যমাণ পাঠাগারের ব্যবস্থা। দুঃস্থ-অসহায়দের কল্যাণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ ও বস্তি উন্নয়নকে বিশেষ গুরুত্ব আরোপ করে সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনীর অন্তর্ভূক্ত করা। নির্মাণাধীন পরিচ্ছন্ন কর্মী নিবাসগুলোর নির্মাণকাজ দ্রুত সম্পন্ন, নতুন পরিচ্ছন্ন কর্মী নিবাস নির্মাণ ও তাদের নাগরিক সুবিধা প্রাপ্তির ব্যবস্থা করা হবে। খালগুলোর অবৈধ দখল উচ্ছেদ-খনন ও সৌন্দর্যবর্ধণ। বর্জ্য ব্যবস্থাপনার উন্নয়ন, প্রয়োজনীয় সংখ্যক নর্দমা নির্মাণ, রক্ষণাবেক্ষণ, ও জলাধার সংরক্ষণ এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণ। সুষ্ঠ ব্যবস্থাপনার মাধ্যমে দৈনন্দিন ভিত্তিতে সড়কের উপর উন্মুক্ত আবর্জনার স্তুপ অপসারণ করা হবে। সড়ক থাকবে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন। ঢাকা কেন্দ্রীয় কারাগার এলাকাটিকে সবুজায়ন, শিশুপার্ক, থিয়েটার হলসহ পরিকল্পিত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। র্দীঘমেয়াদি পরিকল্পনায় বুড়িগঙ্গা ও শীতলক্ষ্যার পাড় ঘিরে বনায়ন, বিনোদন কেন্দ্র স্থাপনসহ ব্যাপক সৌন্দর্য বর্ধনের মাধ্যেমে সুন্দর ঢাকা গড়ে তুলবো।
৩। সচল ঢাকা: যানজটের কারনে রাস্তায় চলাচল হয়ে উঠেছে দূর্বিসহ। সকালে বাসা থেকে বেরিয়ে গন্তব্যে পৌঁছানো ও ফিরে আসতে নিরন্তর সংগ্রাম করতে হয়, বিশেষ করে কর্মজীবী নারীদের বিড়ম্বনা অপরিসীম। গণপরিবহনের চলাচল নিয়ন্ত্রণ ও সুব্যবস্থাপনার মাধ্যমে কিছু রাস্তায় দ্রুত গতির যানবাহন, কিছু রাস্তায় ধীর গতির যানবাহন, আবার কিছু রাস্তায় শুধু মানুষ হাঁটার ব্যবস্থা করবো। নদীর পাড়ে থাকবে সুপ্রশস্ত রাস্তা, যেখানে পায়ে হেঁটে চলা যাবে, চালানো যাবে সাইকেল, চলবে রিক্সা ও ঘোড়ার গাড়ি। দ্রুতগামী যানবাহনের জন্য থাকবে আলাদা পথ, থাকবে নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থা। রাস্তা পারাপারের সুব্যবস্থাসহ নগর ঘুরে দেখার জন্য থাকবে হপ অন হপ অফ বাস সেবা। থাকবে প্রয়োজনীয় সড়ক বাতি ও উন্নত প্রক্ষালণ কক্ষ। হকারদের তথ্যভান্ডার গঠন করে তাদের পূনর্বাসনের মাধ্যমে পর্যায়ক্রমে ফুটপাত দখলমুক্ত করা হবে। এভাবে গড়ে তুলবো আমাদের সচল ঢাকা।
৪। সুশাসিত ঢাকা: ঢাকায় একসময় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা ছিল। মাদক নির্মূল, জুয়া, কিশোর অপরাধসহ নৈতিক ওসামাজিক অবক্ষয়জনিত বিভিন্ন অপরাধ রোধসহ এলাকাভিত্তিক সুশাসন প্রতিষ্ঠায় পঞ্চায়েত ব্যবস্থা কার্যকর ও সংশোধন কেন্দ্র নির্মাণ করবো। ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন হবে বাংলাদেশে স্বায়ত্বশাসিত প্রতিষ্ঠান হিসেবে প্রথম দুর্নীতি মুক্ত সংস্থা। বছরের ৩৬৫ দিন, সপ্তাহের ৭ দিন, ২৪ ঘন্টা নাগরিক সেবা প্রদানের জন্য খোলা থাকবে। মশকের প্রজনন ক্ষেত্র ধ্বংস, মশক নিধনে দৈনন্দিন ভিত্তিতে কার্যকর ব্যবস্থা নেয়া হবে। বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের ব্যবস্থা গ্রহন। প্রয়োজনীয় সংখ্যক হাসপাতাল-ডিসপেনসারী ও প্রতিটি ওয়ার্ডে প্রাথমিক চিকিৎসা কেন্দ্র্র স্থাপনসহ মাতৃসদন, পরিবার পরিকল্পনা, জনস্বাস্থ্য উন্নয়নে কর্মসূচী গ্রহণ করা হবে। শিক্ষার মানোন্নয়ন ও দক্ষ জনশক্তি গড়ে তোলার জন্য সরকারি উদ্যোগের পাশাপাশি প্রয়োজনীয় সংখ্যক কারিগরি-ভোকেশনাল প্রশিক্ষণ কেন্দ্র এবং উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ গ্রহণ। গৃহকর বৃদ্ধি হবে না। হত-দরিদ্র সন্তানসন্ততির শিক্ষার জন্য বিশেষ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। অটিস্টিক ও প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের শিক্ষা, বিনোদন ও চিকিৎসা সেবায় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। ডে-কেয়ার সেন্টার স্থাপন। অগ্নিনির্বাপন ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর করতে ফায়ার হাইড্রান্ট নির্মাণের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা ও পাড়া-মহল্লায় অগ্নি নির্বাপন গাড়ি প্রবেশের কার্যকর পদক্ষেপসহ প্রয়োজনে নিজস্ব দমকল বাহিনী গঠন করা হবে। বছরের একটি সময় নির্দিষ্ট করে ঢাকার উন্নয়ন ও সেবার সাথে জড়িত সংস্থার কাছে তাদের বাৎসরকি কাজের চাহিদা পত্র আহ্বান করা হবে। করপোরেশন কোন রাস্তা নির্মাণের পরে অন্তত ৩ বছরের মধ্যে অন্য সংস্থা ঐ রাস্তা খনন করতে পারবে না। আইন, বিধি ও নীতিমালার কঠোর প্রয়োগের মাধ্যমে ঢাকাদ্ধর উন্নয়ন ও সেবার সাথে সংশ্লিষ্ট সংস্থাগুলোকে সিটি করপোরেশনের নিকট সমন্বিতভাবে দায়বদ্ধ করা হবে। সপ্তাহের ১ দিন নগরবাসী মেয়রের সাথে আলোচনার সুযোগ পাবেন। ওয়ান স্টপ সার্ভিস ডেক্স স্থাপন। দায়িত্ব গ্রহণের ৯০ দিনের মধ্যেই মেদ্বলিক সকল নাগরিক সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করবো ইনশাআল্লাহ্।
৫। উন্নত ঢাকা: মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা জননেত্রী শেখ হাসিনা ঘোষিত সুখী-সমৃদ্ধ উন্নত বাংলাদেশ এর রূপকল্প ২০৪১ বাস্তবায়নে উন্নত রাজধানী তথা উন্নত ঢাকা গড়ে তোলার বিকল্প নাই। অনেক সময় হয়তো পেরিয়ে গেছে, কিন্তু সময় এখনো শেষ হয়ে যায়নি। পাঁচ বছর মেয়াদী বিভিন্ন প্রকল্পসহ দেশী-বিদেশী বিশেষজ্ঞদের সমন্বয়ে ত্রিশ বছর মেয়াদী মহা-পরিকল্পনা প্রণয়নের মাধ্যমে নগরীর উন্নতি সাধন, ইমারত নির্মাণ, ভূমি ব্যবস্থাপনা, ভূমি অধিগ্রহন, নগর পরিকল্পনা প্রনয়ন ও বাস্তবায়ন করা হবে। নতুন ১৮টি ওয়ার্ডের জনগণের আধুনিক সুযোগ-সুবিধার লক্ষ্যে নতুন প্রকল্প গ্রহনসহ প্রত্যেকটি সড়ক ও নর্দমার উন্নয়নমূলক কার্যক্রমের মান নিরূপণ করে অন্তত দশ বছর স্থায়িত্ব নিশ্চিত করা হবে। ক্রমবর্দ্ধমান জনসংখ্যার চাপ বিবেচনায় নিয়ে জমিরযুক্তিসঙ্গত ব্যবহার নিশ্চিত করা হবে। জলবায়ু উদ্বাস্তুদের জন্য সুব্যবস্থাসহ ছাত্র ও কর্মজীবী মহিলাদের জন্য প্রয়োজনীয় সংখ্যক হোস্টেল গড়ে তোলা হবে। জনগণকে প্রদেয় করপোরেশনের সকল সেবা যথা:- বাণিজ্য লাইসেন্স, জন্ম নিবন্ধনপত্র, প্রত্যয়নপত্র, গৃহকর, পেদ্বরকর, আনুষাঙ্গিক অন্যান্য কর সমূহ তথ্য প্রযুক্তিগত সেবার আওতায় আনা হবে। সকল ক্ষেত্রে অনলাইন সুবিধা সম্প্রসারন করা হবে। ঘরে বসেই কর এবং নির্ধারিত ক্ষেত্রে ফি পরিশোধ সংক্রান্তসেবা গ্রহণ করতে পারবেন। করপোরেশন পরিচালনায় তথ্য প্রযুক্তিগত ব্যবস্থাপনা প্রচলন করা এবং প্রতিটি ওয়ার্ডকে এর আওতাভুক্ত করা হবে। ২৪ ঘন্টা হেল্পলাইন এবং নাগরিক সেবা ও সমস্যা, সমাধানে প্রয়োজনীয় তথ্যসমৃদ্ধ নগর অ্যাপ চালু করা হবে। সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় ই-লাইব্রেরী প্রতিষ্ঠা করা। নগর ভবনে নিয়ন্ত্রণ কক্ষ রেখে বিভিন্ন স্থানে সিসি ক্যামেরা স্থাপন ও ফ্রি ওয়াইফাই। পর্যায়ক্রমে এসব বাস্তবায়নে বিভিন্নপরিকল্পনা প্রণয়ন ও কার্যসূচি গ্রহণ করা হবে। সর্বোপরি সিটি করপোরেশনের কার্যপরিধির আওতায় সততা, নিষ্ঠা, দক্ষতা ও দায়িত্বশীলতার সাথে সমন্বিত প্রয়াসে আমাদের উন্নত ঢাকা গড়ে তুলবো ইনশাআল্লাহ্।
নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ





























