চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধিঃ আলমডাঙ্গার কয়রাডাঙ্গা নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসার ছাত্র আবির হুসাইন হত্যাকান্ড মামলার মূল রহস্য অবশেষে উন্মোচিত হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষক তামিম বিন ইউসুফ এর অত্যাচারে ক্ষুব্ধ হয়ে আবিরকে গলাকেটে হত্যার কথা স্বীকার করেছে ওই মাদ্রাসারই ছাত্ররা।চুয়াডাঙ্গার আমলী আদালতের সিনিয়র জুডিসিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মো. সাজেদুর রহমানের নিকট ১৬৪ ধারায় স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে হত্যাকান্ডে জড়িত থাকার কথা স্বীকার করেছে তাঁরা। গতকাল (৫ আগষ্ট) সোমবার বিকেলে তাদেরকে আদালতে হাজির করা হলে সন্ধ্যায় জবানবন্দি রেকর্ড শেষে কোর্টসূত্রে এ তথ্য পাওয়া যায়।

জবানবন্দি দেওয়া ছাত্ররা হলেন-আনিসুজ্জামান (১৮)। সে সদরের হানুরবাড়াদি গ্রামের শহিদুল ইসলামের ছেলে। একই মামলায় টেইপুরের আব্দুল হাই কাতুর ছেলে ছালিমির হোসেন (১৩), আলুকদিয়া আকুন্দবাড়িয়ার আবুল কালামের ছেলে আবু হানিফ রাতুল (১৩) ও মামুন হোসেনের ছেলে আব্দুর নুর (১২) এবং বলদিয়া গ্রামের বিল্লাল হোসেনের ছেলে মুনায়েম হোসেন (১৬)।

এ হত্যাকান্ডের মূল পরিকল্পনাকারী মাদ্রাসা ছাত্র আনিসুজ্জামান তার জবানবন্দিতে বলেছে, তামিম হুজুর আমাদের উপর খুব অত্যাচার করতো। কারণে অকারণে বেত দিয়ে মারতো, বিদ্যুৎ চলে গেলে হাতপাখা দিয়ে বাতাস করাতো। এরই একপর্যায়ে আমি (আনিস), ছালিমির ও রাতুল মিলে পরিকল্পনা করি তামিম হুজুরকে মেরে ফেলতে হবে। আবিরকে মারার আগে হুজুরকে মারার পরিকল্পনা ছিল। এরপর আমরা মাদ্রাসা থেকেই একটি ধারালো ছুরি ও একটি রড নিই। সে মোতাবেক আমরা হুজুরকে মারার জন্য বেশ কয়েকবার চেষ্টা করি। কিন্তু মারতে পারিনি। এরপর ঠিক করি তামিম হুজুরকে যখন মারা গেলো না তখন হুজুর যাকে নিয়ে এসেছে সেই আবিরকে মারবো। আমরা ভেবেছিলাম আবিরকে মারলে ওর বাবা-মা হুজুরকে সন্দেহ করবে এবং তামিম হুজুর ফেঁসে যাবে।

পরিকল্পনা অনুযায়ী গত (২১ জুলাই) রোববার রাতে আমি ও মুনায়েম আবিরকে নিয়ে মাদ্রাসার পাশের বাগানে কাঠাল খেতে যায়। কিন্তু ভালো কাঠাল না পেয়ে ফিরে আসি। এ সময় আমি মুনায়েমকে বলি তুই একটু দাড়া আমি আবিরের সঙ্গে খারাপ কাজ করবো। প্রথমে আবিরকে প্রস্তাব দিলে সে রাজি হয়নি, পরে রাজি হলে তার সঙ্গে খারাপ কাজ করি।

এর পর গত (২৩ জুলাই) মঙ্গলবার মাদ্রাসার খড়ির গাদায় একটি ধারালো ছুরি ও রড লুকিয়ে রাখি। ওই রাতে সবাই এশার নামাজে গেলে আমি আবিরকে বলি চল কাঠাল খেতে যেতে হবে। আমার কথায় আবির রাজি হয়। তারপর ওকে নিয়ে আমি কাঠালবাগানে যায়। ওখানে আগে থেকে আব্দুর নুর, রাতুল ও ছালিমির অপেক্ষা করছিল, মুনায়েম লজিং খেতে চলে যায়। আবিরকে সঙ্গে করে আমবাগানে নিয়ে যাওয়ার সময় আব্দুর নুর পিছন থেকে পালিয়ে যায়। আমবাগানে পৌছে দেখি আবির নাই। তখন আমি আবিরের গলা ধরে পেড়ে ফেলি। ছালিমির ও রাতুল পা ধরে। তারপর আমি আমার ঘাড়ে থাকা তোয়ালে দিয়ে আবিরের গলায় ফাঁস দিয়ে মেরে ফেলি। তারপর লাশ বাগানের একপাশে নিয়ে যায়। ছালিমির আবিরকে জবাই করে শরীর থেকে মাথা বিচ্ছিন্ন করে। এরপর তোয়ালে দিয়ে মাথাটা বেধে নিয়ে গিয়ে পাশের পুকুরের মধ্যে ফেলি। ওই পুকুরেই ফেলে দেওয়া হয় হত্যাকান্ডে ব্যবহৃত ছুরিটিও। আর তোয়ালে আমার কাছে ছিল। তোয়ালেটা ছালিমিরের কাছে রেখে হাতমুখ ধুয়ে আমি ছাত্রদের খেতে দিতে চলে যায়। মুনায়েম লজিং খেয়ে ফিরে এসে ছালিমিরের কাছ থেকে তোয়ালেটা নিয়ে মাদ্রাসার খড়ির গাদার নিচে লুকিয়ে রাখে।

প্রসঙ্গত, ২৪ জুলাই বুধবার সকালে আলমডাঙ্গা উপজেলার কয়রাডাঙ্গা গ্রামের নুরানী হাফিজিয়া মাদ্রাসা ও এতিমখানার পাশ্ববর্তী একটি আমবাগান থেকে মাদ্রাসা ছাত্র আবির হুসাইনের মাথাবিহীন মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ।এরপর ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের ডুবুরি দলের সদস্যরা পরদিন বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে মাদ্রাসার পাশের একটি পুকুর থেকে মাথাটি উদ্ধার করে।

এরপর মাদ্রাসা সুপার হাফেজ মাওলানা মুফতী মো. আবু হানিফ ও শিক্ষক তামিম বিন ইউসুফকে উক্ত মামলায় সন্দিগ্ধ আসামী হিসেবে আটক দেখিয়ে আদালতে প্রেরণ করে। হত্যাকান্ডের এক সপ্তাহের মাথায় মাদ্রাসা সুপার আবু হানিফ ও শিক্ষক তামিমকে ৫ দিনের রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শুরু করে পুলিশ। এরই একপর্যায়ে মাদ্রাসার সন্দিগ্ধ ৫ ছাত্রকে আটক করা হয় এবং তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদের একপর্যায়ে মূল রহস্য বেরিয়ে আসে।

সোহেল রানা ডালিম
চুয়াডাঙ্গা নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে