রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ঃ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের এবারের নিয়মানুযায়ী একজন শিক্ষার্থী শুধুমাত্র একটি ইউনিটে পরীক্ষা দিতে পারবেন এবং শুধুমাত্র আর্টস ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরাই ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। তেমনি ভাবে ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা কেবল ‘বি’ ও ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।
আবদুল্লাহ আল আলভি রাজশাহীর মসজিদ মিশন একাডেমি থেকে এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়েছেন। বিজ্ঞান বিভাগের এই শিক্ষার্থী  পরীক্ষার পর থেকেই বিভাগ পরিবর্তনের সিদ্ধান্ত নিয়ে সবার জন্য উন্মুক্ত অনুষদ গুলোয় পরীক্ষার প্রস্তুতি নিচ্ছিলেন। কিন্তু রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের নতুন নিয়মে  বেশ ভালো মতোই বেকায়দায় পড়েছেন তিনি এবং তার মতো আরো অনেকে।
এই প্রতিবেদকের সাথে কথা হলে তিনি বলেন, দুমাস ধরে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান পড়েছি। কিন্তু হঠাৎ এই ঘোষণায় কোন দিকে যাবো তা বুঝে উঠতে পারছি না। সবার তো এক বিষয়ে আগ্রহ থাকে না। আগে মা-বাবার সিদ্ধান্তে বিজ্ঞান পড়েছি। কিন্তু বিষয়টা আমার সাথে যাচ্ছে না। আমার জীবনের লক্ষ্য সাইন্স না। আমি অন্যকোন বিষয়ে পড়তে আগ্রহী। কিন্তু এ নিয়মে তো আমাকে তো বাধ্য করা হচ্ছে। আমাকে বিজ্ঞান পড়তেই হবে। এতো দিন এক ভাবে প্রস্তুতি নিয়ে এখন হঠাৎ করে এই সিদ্ধান্তে ছিটকে পড়ার মতো অবস্থা। আমাদের মতো আরো শতশত শিক্ষার্থী যাদের স্বপ্ন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়। এটা আমাদের জন্য খুবই হতাশাজনক। সারাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর যে নিয়ম বিভাগ পরিবর্তন করতে চাইলে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞানই পড়া লাগে। কিন্তু কোন রকম পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই এটা আমাদের উপর চাপিয়ে দেয়া হল।
তবে এর সমাধানও দিয়েছেন আরেক পরীক্ষার্থী হামিম মুস্তাফিজ জিম। তিনি রাজশাহীর শহীদ মামুন মাহমুদ পুলিশ লাইন্স কলেজ থেকে বিজ্ঞান বিভাগে উচ্চমাধ্যমিক পাশ করেছে। তার দাবি যারা বিভাগ পরিবর্তন করতে চায় তাদের জন্য একটা আলাদা ইউনিট করা হোক। তার মতে,” আমরা যারা বিভাগ পরিবর্তন করে বাংলা, ইংরেজি, সাধারণ জ্ঞান প্রস্তুতি নিয়েছি তাদের জন্য এটা বড় সমস্যা। আমরা এতোদিন আর্টসের প্রস্তুতি নিয়েছি। এই দেড়-দু’মাসে আবার বিজ্ঞান প্রস্তুতি নেয়া তো সম্ভব না। এমন হলে তো দু নৌকায় পা দিয়ে শেষে ডুবেই মরতে হবে”।
উত্তরাঞ্চলীয় জেলা লালমনিরহাট থেকে রাজশাহীতে ভর্তি কোচিং করতে এসেছেন আরিফুল ইসলাম। তবে কোন কোচিং সেন্টারে না। হিসাববিজ্ঞান ও তথ্য ব্যবস্থা বিভাগের এক শিক্ষার্থী বিনামূল্যে পড়াচ্ছেন এখানে।  বিশ্ববিদ্যালয় গ্রন্থাগারের পেছনে কথা হয় তার সাথে। আরিফুল বলেন ‘কোচিং করবো সেই পরিস্থিতি আমার নাই। আমি ভেঙ্গে পড়ছিলাম। আমার বাবার অত টাকা নাই যে রাজশাহী বা ঢাকার কোন কোচিংয়ে পড়াবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ার স্বপ্নটা নস্যাৎ হতে চলছিল।  একজন বড় ভাই দরিদ্র-মেধাবী শিক্ষার্থীদের জন্য ফ্রিতে ভর্তি প্রাইভেট পড়াচ্ছেন। তার সুবাদে কোচিং-এ এসেছি। কিন্তু ফরমের যে মূল্য, এলাকায় ঘরবাড়ি বন্যায় শেষ। কিভাবে কি করব। স্বপ্ন টা হয়তো এটুকুতেই থেমে যাবে। “
আরিফুলের মতো সে বিনামূল্যের কোচিং-এ পড়ছেন শিরিন আক্তার। তিনি এবার রাজশাহী সরকারি মহিলা কলেজ থেকে এবার এইচ এস সি পরিক্ষা দিয়েছেন। দরিদ্র পরিবারের সন্তান হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরিক্ষা দেয়ার স্বপ্নটা অনেকটাই ফিকে হতে যাচ্ছিল। আর্থিক অনটন, শিরিনের বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং করার প্রচেষ্টাকে পেছন টেনে ধরলেও, এতোদূর এসেছে। অন্তত ভর্তি পরীক্ষার প্রস্তুতি পর্যন্ত। কিন্তু এ যাত্রা আর হয়তো আগাবে না তার।
কারণ এবার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রাথমিক আবেদন ফি নির্ধারণ করা হয়েছে ৫৫ টাকা। তবে চূড়ান্ত নির্বাচিতদের গুনতে হবে আরো  ১৯৮০ টাকা। অর্থাৎ শুধু ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে একজন শিক্ষার্থীকে গুনতে হবে সর্বমোট ২০৩৫ টাকা। এরই মধ্যে বিষয়টি নিয়ে সমালোচনা চলছে নানা মহলে। অনেকেই ভর্তি বাণিজ্য বলে অভিহিত করেছেন ইতোমধ্যে। সে মূল্য পুনরায় নির্ধারণের দাবিতে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে ১২ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছে আন্দোলন কারী শিক্ষার্থীরা।
দেশের স্বায়ত্তশাসিত উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান গুলোর মধ্যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার ফি প্রতি ইউনিট নির্ধারণ করা হয়েছে ৪৫০ টাকা। জাহাঙ্গীর নগর বিশ্ববিদ্যালয়ের টাকা ৩৫০-৫৫০ টাকা। জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে মাত্র ১০০ টাকা। সে হিসেবে সর্বোচ্চ টাকা আদায় করবে রাবি। যা রীতিমতো ভর্তি বাণিজ্য বলে অভিহিত করেছেন অনেকেই। এতে স্বপ্ন দুঃস্বপ্নে রূপ নিতে শুরু করেছে অনেক অসচ্ছল মেধাবী শিক্ষার্থীদের।
বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিষয় গুলো নিয়ে কাজ করেন, স্টুডেন্টস রাইটস এসোসিয়েশন। এ বিষয়ে কথা হয় সংগঠনটির আহবায়ক কেএম সাকিব আল হাসানের সাথে তিনি বলেন,” এ ফরমের মূল্য টা অনেক বেশী এবং অযৌক্তিক। বিশেষ করে এখানে পরীক্ষা দিতে আসবে মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান রা, তাদের জন্য এটা একটা বিরাট বোঝা হয়ে দাঁড়াবে। বিভাগ পরিবর্তনের বিষয়ে তিনি বলেন সরাসরি বিভাগ পরিবর্তনের সুযোগ না রাখাটা সুন্দর দেখায় নি। সাইন্সের শিক্ষার্থীরা আর্টসে পরীক্ষা দিতে পারবে না। এটাতো ত্রুটিপূর্ণ একটা বিষয়।”
“এই ভর্তি পরিক্ষার ফর্ম বিক্রি করেই রাবি প্রশাসন হাতিয়ে নেবে প্রায় ১৯ কোটি টাকা ! এইযে, নিম্ন-মধ্যবৃত্ত পরিবারের পকেট কাটার সিদ্ধান্ত, এটা শুধু অযৌক্তিকই নয়, অনৈতিক এবং অমানবিকও বটে। যেটি জাতীয় বুদ্ধিজীবী হিসেবে শিক্ষকদের কাছ থেকে জনসাধারণ একটি কখনই প্রত্যাশা করে না।ভর্তি পরিক্ষা নিতে নিশ্চয় ১৯ কোটি টাকা ব্যয় হবে না? এমনকি ১৯ লক্ষ টাকাও ব্যয় হওয়ার কথা নয়, যদি অযৌক্তিকভাবে ব্যয় না দেখানো হয়। এই টাকাগুলোর অধিকাংশই শিক্ষকেরা ভাগ-বাটোয়ারা করে নিজেদের পকেটে ভরবেন! ” বলেছেন রাকসু আন্দোলন মঞ্চের সমন্বয়ক আব্দুল মজিদ অন্তর।
তিনি আরো বলেন, “বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে আরও উদার ও মানবিক হওয়ার আহ্বান জানাই। ফর্মের দাম কমিয়ে ৩০০ টাকা করুন। গরিবের পকেট না কেটে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাজেট বাড়ানোর চেষ্টা করুন। শিক্ষা ক্ষেত্রে বাজেট বাড়ানোর চেষ্টা করুন।”তবে ভর্তি পরীক্ষা ও বিভাগ পরিবর্তন নিয়ে বেশ কিছু ভুল ধারনার সৃষ্টি হয়েছে বলে মনে করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর অধ্যাপক লুৎফর রহমান। রবিবার সাংবাদিকদের সাথে একান্ত সাক্ষাৎকালে তিনি একথা বলেন।তিনি বলেন, বাস্তবে এবারের রাবির ভর্তি পরীক্ষা সবদিক থেকে বিবেচনা করলে সম্পূর্ণ নতুন একটি পদ্ধতিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে। মূলত অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষার পদ্ধতির সাথে তুলনা করার ফলেই কনফিউশন গুলো তৈরি হয়েছে।
এবারের রাবির ভর্তি পরীক্ষা অনুষ্ঠিত হচ্ছে তিনটি ইউনিটে। ‘এ’ ‘বি’ এবং ‘সি’ ইউনিট। ‘এ’ ইউনিটে সামাজিক বিজ্ঞান, কলা, চারুকলা, আইন অনুষদের বিভাগগুলোর সাথে রয়েছে শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট। ‘বি’ ইউনিটে রয়েছে ব্যবসায় শিক্ষা অনুষদের বিভাগগুলো। ‘সি’ ইউনিটে রয়েছে বিজ্ঞান, প্রকৌশল, জীব ও ভূ-বিজ্ঞান ও কৃষি অনুষদের বিভাগ গুলো।
এবারের নিয়মানুযায়ী একজন শিক্ষার্থী শুধুমাত্র একটি ইউনিটে পরীক্ষা দিতে পারবেন এবং শুধুমাত্র আর্টস ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরাই ‘এ’ ইউনিটের পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবেন। তেমনি ভাবে ব্যবসায় শিক্ষা ও বিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ডের শিক্ষার্থীরা কেবল ‘বি’ ও ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবেন।এতে আপাতদৃষ্টিতে মনে হচ্ছে বিভাগ পরিবর্তনের কোনো সুযোগ এবার রাখা হয়নি।তবে সাবজেক্ট চয়েজ দেয়ার সময় একজন শিক্ষার্থী তার পরীক্ষা দেয়া ইউনিটের বাইরেও অন্যান্য ইউনিটের বিভাগ গুলোও চয়েজ করতে পারবেন। ঢাবির সাথে তুলনা করলে ওখানে একজন বিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ড এর পরীক্ষার্থী ‘এ’ এবং ‘ডি’ ইউনিটে পরীক্ষা দিতে পারেন। আর এবারের রাবির ভর্তি পরীক্ষা পদ্ধতি অনুসারে বিজ্ঞান ব্যাকগ্রাউন্ডের একজন শিক্ষার্থী শুধুমাত্র ‘সি’ ইউনিটের পরীক্ষায় অংশ নিয়েই ঢাবির নিয়মানুযায়ী ‘এ’ ও ‘ডি’ ইউনিটেও পরীক্ষা দিয়েছেন বলে গণ্য হবেন।
তবে এবারের নিয়মে একজন শিক্ষার্থীকে উচ্চ মাধ্যমিকে পড়া বিষয়গুলোর উপরই পরীক্ষা দিতে হবে তিনি বিভাগ পরিবর্তন করতে চাইলেও।আবেদন ফি উচ্চমূল্যের ব্যাপারে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এবার গতবারের থেকে তুলনামূলক কম ফি নেয়া হচ্ছে। কারন ইউনিট কমানো হয়েছে।
মেশকাত মিশু
রাবি নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে