মধ্যপ্রাচ্য যুদ্ধের প্রভাবে ইরান হরমুজ প্রণালি বন্ধ করায় বিশ্বে তেল-গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের টান পড়েছে। এখন পর্যন্ত প্রয়োজনীয় মজুত থাকলেও বাংলাদেশের ওপর সংকটের প্রভাব পড়েছে। এমন পরিস্থিতিতে সংকট থেকে রেহাই পেতে বাংলাদেশের জন্য দুটি নতুন সম্ভাবনা সৃষ্টি হয়েছে।

ঢাকায় গতকাল ইরানের রাষ্ট্রদূত জানিয়েছেন, বাংলাদেশি তেলবাহী জাহাজ নিরাপদে হরমুজ পার হতে দিতে বাংলাদেশ সরকারের অনুরোধ তিনি তেহরানে পৌঁছে দিয়েছেন। রাষ্ট্রদূত বলেছেন, কর্মকর্তারা এ ব্যাপারে ইতিবাচক সাড়া দিয়েছেন। অন্যদিকে রাশিয়া থেকে তেল কেনার জন্যও যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড়ের (ওয়েভার) অপেক্ষা করছে ঢাকা। এদিকে জ্বালানিমন্ত্রীকে উদ্ধৃত করে গতকাল রেলপথমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম বলেছেন, আগামীকাল ১৫ মার্চ থেকে গণপরিবহন পর্যাপ্ত জ্বালানি তেল পাবে এবং তেলের দামও বাড়বে না।

ইরানের রাষ্ট্রদূত জালিল রাহিমী জাহানাবাদী গতকাল ঢাকার বাংলাদেশ মেডিকেল অ্যাসোসিয়েশন (বিএমএ) মিলনায়তনে আন্তর্জাতিক কুদস কমিটি বাংলাদেশ আয়োজিত আলোচনা অনুষ্ঠানে বক্তব্য দেন। এর এক ফাঁকে তিনি সাংবাদিকদের বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধের মধ্যে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানিবাহী জাহাজকে হরমুজ প্রণালি পার হওয়ার সুযোগ দেওয়া হবে।

ইরানি রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘আমি দেখেছি, আপনাদের দেশে জ্বালানি সংকট রয়েছে। এ জন্য প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও জ্বালানিমন্ত্রী বাংলাদেশের তেল ট্যাংকারগুলোকে চলাচলের অনুমতি দেওয়ার জন্য ইরান সরকারকে অনুরোধ করতে বলেছেন। আমি এটি করেছি। আমি ইরানের সরকারি কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছি এবং তাঁরা এ জন্য প্রস্তুত। রাষ্ট্রদূত বলেন, ‘যদি আপনাদের কোনো জাহাজ হরমুজ প্রণালি দিয়ে জ্বালানি পরিবহন করতে চায়, তাহলে আমরা সেগুলোকে নিরাপদে যেতে দেব, যাতে বাংলাদেশের প্রিয় মানুষদের কোনো সমস্যার সম্মুখীন না হতে হয়। মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে হরমুজ প্রণালির এক পাশে শত শত তেলবাহী জাহাজ আটকা পড়েছে। সৌদি আরবের রাস তানুকা বন্দর থেকে প্রায় এক লাখ টন অপরিশোধিত তেল নিয়ে বাংলাদেশমুখী একটি ট্যাংকার কয়েক দিন ধরে বন্দরে আটকে রয়েছে। নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে জাহাজটি হরমুজ প্রণালি দিয়ে খোলা সাগরে বের হতে পারছে না। সংযুক্ত আরব আমিরাত থেকে তেলবাহী আরেকটি ট্যাংকারের যাত্রাও বিলম্বিত হওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের একটি জাহাজও মধ্যপ্রাচ্যের নিরাপত্তাঝুঁকির কারণে নির্ধারিত গন্তব্যে যেতে পারছে না। যুক্তরাষ্ট্র বা তাদের মিত্রদেশের প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে ভাড়া করা জাহাজগুলোর ক্ষেত্রে ঝুঁকি আরও বেশি। কারণ, বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র-সংশ্লিষ্ট জাহাজগুলো ইরানের প্রতিশোধমূলক হামলার সম্ভাব্য লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।

বাংলাদেশ মার্চেন্ট মেরিন অফিসার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি এবং সমুদ্রবিষয়ক বিশেষজ্ঞ ক্যাপ্টেন আনাম চৌধুরী বলেন, ‘মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যুক্ত জাহাজের জন্য হরমুজ প্রণালি এখন খুব স্পর্শকাতর রুট। বাংলাদেশের জাহাজ এই প্রণালি দিয়ে নিরাপদ যাতায়াতের নিশ্চয়তা পেলেও মার্কিন প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতা থাকা জাহাজগুলো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে থাকবে।

রুশ তেলেও আগ্রহ দেখিয়েছে সরকার
চাপে পড়ে বিশ্ববাজারে জ্বালানি সরবরাহ সচল রাখতে রাশিয়ার তেলের ওপর আরোপিত নিষেধাজ্ঞা আংশিকভাবে শিথিল করেছে যুক্তরাষ্ট্র। এই পরিস্থিতিতে রাশিয়া থেকে জ্বালানি তেল ও এলএনজি আমদানির সম্ভাবনা কয়েক দিন ধরে খতিয়ে দেখছে বাংলাদেশ। তবে এ জন্য যুক্তরাষ্ট্রের বিশেষ ছাড় (ওয়েভার) প্রয়োজন হবে। প্রসঙ্গত, ইউক্রেনে হামলার কারণে যুক্তরাষ্ট্র রাশিয়ার তেল কেনার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত মার্কিন রাষ্ট্রদূতের মাধ্যমে ওয়াশিংটনের কাছে এ জন্য ওয়েভারের অনুরোধ করা হয়েছে।

বিশ্লেষকদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ দীর্ঘায়িত হলে বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় চাপ বাড়তে পারে। ফলে বিকল্প উৎস হিসেবে রাশিয়ার তেল আমদানির প্রশ্নটি নতুন করে গুরুত্ব পাচ্ছে। ছাড় দিয়ে কিছু দেশকে রাশিয়ার তেল কেনার অনুমতি দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। তবে শুধু যেসব দেশের জাহাজ ইতিমধ্যে রাশিয়ার তেল বোঝাই করে সমুদ্রে রয়েছে, বৈধভাবে সেগুলোর লেনদেন সম্পন্ন করার সুযোগ দেওয়া হয়েছে। মার্কিন বাণিজ্যমন্ত্রী স্কট বেসেন্ট জানিয়েছেন, এই অনুমতি সাময়িক এবং আগামী ১১ এপ্রিল পর্যন্ত কার্যকর থাকবে। যুক্তরাষ্ট্র বলছে, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহের সংকট এড়াতে এটি একটি স্বল্পমেয়াদি ব্যবস্থা। এতে রাশিয়ার অর্থনীতিতে বড় কোনো সুবিধা তৈরি হবে না। সম্প্রতি একই ধরনের ছাড় দেওয়া হয়েছিল ভারতকে।

অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানিয়েছেন, রাশিয়া বাংলাদেশকে জ্বালানি সরবরাহে আগ্রহ প্রকাশ করেছে। ঢাকায় নিযুক্ত রাশিয়ার রাষ্ট্রদূত আলেকজান্ডার খোজিনের সঙ্গে বৈঠকের পর অর্থমন্ত্রী সাংবাদিকদের বলেছেন, রাশিয়ার সঙ্গে জ্বালানি খাতে সহযোগিতার সুযোগ রয়েছে। তবে রাশিয়া থেকে তেল বা এলএনজি আমদানির জন্য যুক্তরাষ্ট্রের পক্ষ থেকে বিশেষ অনুমতি বা ওয়েভার প্রয়োজন। মন্ত্রী জানান, এ বিষয়ে ইতিমধ্যে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে আলোচনা হয়েছে এবং আনুষ্ঠানিকভাবে ওয়েভার চাওয়া হয়েছে।এই অনুমতি পাওয়া গেলে বাংলাদেশের জন্য জ্বালানি সংগ্রহের একটি নতুন উৎস তৈরি হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তবে অর্থনীতিবিদ ড. মইনুল ইসলাম বলেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র খুব সহজে ওয়েভার দিতে রাজি হবে না। তবে হলে আমাদের জন্য ভালো হবে।’

বিপিসির বিকল্প ভাবনা
বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) কর্মকর্তারা বলছেন, প্রয়োজনে সংযুক্ত আরব আমিরাতের ফুজাইরাহ বন্দরসহ হরমুজ প্রণালির একটু বাইরে ওমান উপসাগরের দিকে অবস্থিত জ্বালানি টার্মিনালগুলো ব্যবহার করার কথা বিবেচনা করা হচ্ছে। পাশাপাশি তেলবাহী জাহাজের নিরাপদ চলাচল নিশ্চিত করতে কূটনৈতিক তৎপরতাও বাড়ানো হয়েছে। নাম প্রকাশ না করার শর্তে রাষ্ট্রীয় কোম্পানি যমুনা অয়েলের সাবেক এক ব্যবস্থাপনা পরিচালক বলেন, মধ্যপ্রাচ্যের সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশের মতো আমদানিনির্ভর দেশের জন্য জ্বালানির উৎস বহুমুখীকরণ জরুরি হয়ে উঠবে। যুক্তরাষ্ট্রের ওয়েভার পাওয়া গেলে রাশিয়ার জ্বালানি বাংলাদেশের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প সরবরাহ উৎস হতে পারে। প্রসঙ্গত, তাঁরা এসব কথা বলেছেন ইরানি রাষ্ট্রদূতের কথা প্রচারিত হওয়ার আগে। সার্বিক বিষয়ে জানতে বিপিসির চেয়ারম্যান মো. রেজানুর রহমানের ব্যক্তিগত মুঠোফোন ও হোয়াটসঅ্যাপে একাধিকবার চেষ্টা করেও যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি।

বাংলাদেশের জ্বালানি সরবরাহব্যবস্থা মূলত আমদানিনির্ভর। সিলেটের গ্যাসক্ষেত্র থেকে উপজাত (কনডেনসেট) হিসেবে কিছু তেল পাওয়া যায়। বিপিসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে বছরে প্রায় ৭২ লাখ টন জ্বালানি তেলের চাহিদা রয়েছে। এর ৯০ শতাংশের বেশি আমদানি করতে হয়। এই আমদানির বড় অংশই মধ্যপ্রাচ্য থেকে আসে। আর মধ্যপ্রাচ্যের তেল-গ্যাসের উল্লেখযোগ্য অংশ পারস্য উপসাগরের হরমুজ প্রণালি পেরিয়েই আরব সাগর হয়ে দক্ষিণ এশিয়ায় আসে। বিদেশ থেকে আনা এই অপরিশোধিত তেল দেশের একমাত্র শোধনাগার চট্টগ্রামের ইস্টার্ন রিফাইনারিতে শোধন করে ব্যবহারের উপযোগী করা হয়।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে