ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ১৯২২-২৩ শিক্ষাবর্ষে প্রতিষ্ঠিত হয়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শুরুতে এর নাম ছিল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র সংসদ (ডাসু)। শিক্ষার্থীদের এক টাকা চাঁদা দিয়ে এর সদস্য হওয়ার মধ্য দিয়েই যাত্রা শুরু হয় দেশের স্বাধিকার, ভাষার সংগ্রাম ও স্বাধীনতা এবং গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অন্যতম সূতিকাগার ডাকসুর। প্রাথমিক ভাবে অরাজনৈতিক কার্যকলাপ পরিচালনার উদ্দেশ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের অনুমতি পায়। সে সময়ের বিশ্ববিদ্যালয় এর তিনটি হল – ঢাকা হল, সলিমুল্লাহ মুসলিম হল ও জগন্নাথ হল থেকে একজন করে শিক্ষক ও ছাত্র প্রতিনিধি এবং উপাচার্য মনোনীত একজন শিক্ষক দিয়ে সংসদ গঠিত হত।

১৯২৫ সালের ৩০ অক্টোবর সংসদের সাধারণ সভায় খসড়া গঠনতন্ত্র অনুমোদন করা হয়। পরবর্তীতে বিশ্ববিদ্যালয়ের নির্বাহী পরিষদ অনুমোদন করলে তা কার্যকর হয়। ১৯৫৩ সালে গঠনতন্ত্র সংশোধনের মাধ্যমে নাম পরিবর্তন করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) রাখা হয়। প্রথমদিকে ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হত, ১৯২৪-২৫ সালে প্রথম ডাকসুর ভিপি মনোনীত করা হয়। ১৯৫৩ সালে বিশ্ববিদ্যালয়ের সাধারণ শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে ডাকসুর প্রথম নিবার্চন অনুষ্ঠিত হয়। উপাচার্যকে সভাপতি এবং ১৬ জন ছাত্র প্রতিনিধি থেকে ১০ জন কর্মকর্তা নির্বাচনের ব্যবস্থা রাখা হয়, কোষাধাক্ষের দায়িত্ব পালন করেন একজন শিক্ষক। ১৯৭০ সালে ডাকসুতে পরোক্ষ নির্বাচনের বদলে প্রত্যক্ষ নির্বাচন পদ্ধতি চালু হয়।
ঢাকসুর প্রথম ভিপি ও জিএস হিসেবে মনোনীত হন মমতাজ উদ্দিন আহমেদ ও যোগেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত এবং প্রথম নির্বাচিত হন এস এ রারী এটি ও জুলমত আলী খান।[৪] বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৭২ সালের ডাকসুর ভিপি হিসেবে নির্বাচিত হন বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন থেকে মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম এবং জিএস নির্বাচিত হন মাহবুবুর জামান। সর্বশেষ ১৯৯০-৯১ সেশনের জন্য ভিপি ও জিএস পদে যথাক্রমে নির্বাচিত হন ছাত্রদলের আমানউল্লাহ আমান ও খায়রুল কবির খোকন।

১৯৭১ সালে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধে ডাকসু এক গৌরবোজ্বল ভূমিকা পালন করে। ডাকসুর নেতৃবৃন্দের সাহসী ও বলিষ্ঠ উদ্যোগে ১৯৭১ সালের ২রা মার্চ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক বটতলায় প্রথম স্বাধীন বাংলার পতাকা উত্তোলন করা হয়।
নেতৃবৃন্দের তালিকাঃ
মার্চে হতে পারে ডাকসু নির্বাচন
দীর্ঘ ২৮ বছর পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ নির্বাচনের উদ্যোগ নিয়েছে প্রশাসন। বিশ্ববিদ্যালয় সূত্রে জানা গেছে, আগামী মার্চ মাসের যে কোনো দিন নির্বাচন অনুষ্ঠিত হতে পারে। ফেব্রুয়ারি মাসেই ঘোষণা করা হতে পারে নির্বাচনী তফসিল। নির্বাচনকে সামনে রেখে এরমধ্যে ডাকসুর গঠনতন্ত্র যুগোপযোগী করতে আইন বিভাগের অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমানকে আহ্বায়ক করে পাঁচ সদস্যের একটি কমিটি করা হয়েছে।
গঠনতন্ত্র নিয়ে আলোচনা করতে ক্রিয়াশীল সব ছাত্রসংগঠনের সঙ্গে বৃহস্পতিবার মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে এই কমিটি। এই সংক্রান্ত একটি চিঠি ছাত্রসংগঠনগুলোর কাছে পৌঁছে দেয়া হয়েছে বলে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে। মতবিনিময় সভায় উপস্থিত হয়ে সংগঠনের বক্তব্য বা সুপারিশমালা উপস্থাপনের জন্য ছাত্র সংগঠনগুলোর বিশ্ববিদ্যালয় শাখার শীর্ষ নেতাদের আহ্বান জানিয়ে পাঠানো এই চিঠির সঙ্গে ডাকসুর বর্তমান গঠনতন্ত্রের একটি কপি পাঠানো হয়েছে।

ডাকসুর গঠনতন্ত্র সংশোধন কমিটির আহ্বায়ক অধ্যাপক মিজানুর রহমান স্বাক্ষরিত ওই চিঠিতে বলা হয়েছে, ‘আপনি জেনে আনন্দিত হবেন যে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ দীর্ঘদিন পর ডাকসু নির্বাচনের উদ্যোগ গ্রহণ করেছে। এ লক্ষ্যে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদ (ডাকসু) ও হল সংসদ গঠনতন্ত্র যুগোপযোগী করার জন্য ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনের মতামত নিয়ে প্রয়োজনীয় সংশোধনী/পরিমার্জনের সুপারিশ প্রণয়নের জন্য মাননীয় উপাচার্য একটি কমিটি গঠন করেছেন। এর নিমিত্তে ছাত্রসংগঠনসমূহের সঙ্গে একটি মতবিনিময় সভা আগামী ১০ জানুয়ারি সকাল ১১টায় উপাচার্য কার্যালয় সংলগ্ন লাউঞ্জে অনুষ্ঠিত হবে।’
এ বিষয়ে অধ্যাপক ড. মিজানুর রহমান বলেন, বিদ্যমান গঠনতন্ত্র সামঞ্জস্যপূর্ণ কিনা বা কোনো কিছু সংযোজন বিয়োজন করতে হবে কিনা, সেটা জানতেই বৈঠকে ছাত্রসংগঠনগুলোর পরামর্শ নেয়া হবে। কমিটি তাদের মতামত ও পরামর্শের ভিত্তিতে ভোটার ও প্রার্থী হওয়ার যোগ্যতা নির্ধারণের সুপারিশ করবে।

আসন্ন নির্বাচনে কারা ভোটার হতে পারবেন, কারা প্রার্থী হতে পারবেন তা নিয়ে সাধারণ শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে ছাত্রসংগঠনগুলোর নেতাকর্মীদের মধ্যে চলছে আলোচনা। ডাকসুর গঠনতন্ত্রের ৪ ধারার ১, ২ ও ৬ উপধারা অনুযায়ী, বিশ্ববিদ্যালয়ের আবাসিক ও অনাবাসিক সব নিয়মিত শিক্ষার্থীই ডাকসুর সদস্য। তবে তাদের বিশ্ববিদ্যালয়ের সব আর্থিক প্রাপ্য পরিশোধ করতে হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের সব প্রিডিগ্রি, বিএফএ, এমফিল ও পিএইচডি শিক্ষার্থীরা ভোটার হতে পারবেন কিন্তু প্রার্থী হতে পারবেন না।
এদিকে আসন্ন নির্বাচনকে সামনে রেখে গত বছরের ৩১ অক্টোবর একটি খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশ করেছিল প্রশাসন। সেখানে ১৮টি হলের আবাসিক অনাবাসিক মিলিয়ে ৩৮ হাজার ৪৯৩ জন শিক্ষার্থীর নাম ছিল। এতে ২৩ হাজার ৯৮৪ জন ছাত্র ও ১৪ হাজার ৫০৯ জন ছাত্রী।
ভোটার তালিকার বিষয়ে উপাচার্য অধ্যাপক মো. আখতারুজ্জামান বলেন, সবকিছু কমিটি দেখবে। কিছু নিয়ম যে আছে, সেগুলো যথার্থ কিনা এবং কোন ক্ষেত্রে কী করা উচিত, সবই দেখবে কমিটি। সবকিছু দেখে তারা একটি সুপারিশ করবে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিয়াশীল ছাত্র সংগঠনগুলোর শীর্ষ নেতাদের বেশির ভাগই নিয়মিত শিক্ষার্থী নন। নেতাদের অনেকে বিভিন্ন বিষয়ে এমফিল বা পিএসডি করছেন। তাদের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, আসন্ন নির্বাচনে যাতে প্রার্থিতার বিষয়টি শিথিল করা হয়। এ বিষয়ে ছাত্রলীগের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি সনজিৎ চন্দ্র দাস বলেন, পিএইচডি, এমফিলের শিক্ষার্থীদের গঠনতন্ত্র অনুযায়ী নির্বাচনে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ নেই। কিন্তু সব ছাত্রসংগঠনই নিয়মটি শিথিল করা যায় কিনা, সেটা ভাবছে। সেক্ষেত্রে একটি টাইমফ্রেম বেঁধে দেয়া যায় কিনা, আমাদের সে প্রস্তাব থাকবে।
ছাত্র ইউনিয়নের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সাধারণ সম্পাদক রাজিব দাস বলেন, ডাকসুর গঠনতন্ত্র পর্যালোচনা করার জন্য সাংগঠনিকভাবে আমরা একটা কমিটি করেছি। আগামীকাল (বুধবার) আমাদের হাতে কমিটির প্রস্তাবগুলো আসবে। সেই প্রস্তাবগুলো প্রশাসনের কাছে আমাদের পক্ষ থেকে তুলে ধরা হবে। এদিকে ডাকসু নির্বাচনের পূর্বে ক্যাম্পাসে সবার সহাবস্থান নিশ্চিত করতে প্রশাসনের প্রতি আহ্বান জানিয়েছে ছাত্রদলসহ অন্যান্য সংগঠনগুলো। ছাত্রদলের দাবি তাদের নেতাকর্মীদের বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না।
ছাত্রদলের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সহসাংগঠনিক সম্পাদক নাসির উদ্দিন নাসির বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে আমরা চিঠি পেয়েছি। ছাত্রদল ডাকসু নির্বাচনের ব্যাপারে সবসময় আন্তরিক। তবে বর্তমান সময়ের নির্বাচনগুলো থেকে আমরা আশাবাদী হতে পারছি না। আগের রাতে ব্যালটবক্স ভর্তি করে রাখা হবে না প্রশাসনকে সেই নিশ্চয়তা দিতে হবে। তাছাড়াও আমাদের নেতাকর্মীদের ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে দেয়া হয় না। তাদের মারধর করা হয়, পুলিশে ধরিয়ে দেয়া হয়। তাই সবার আগে ক্যাম্পাসে আমাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। আমরা চাই একটি গণতান্ত্রিক ক্যাম্পাস।
ছাত্র ফেডারেশনের বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি উম্মে হাবিবা বেনজির বলেন, মতবিনিময় সভায় তো সবাই অংশগ্রহণ করতে পারবে কিন্তু নির্বাচন হলে সবাই অংশগ্রহণ করতে পারবে কিনা সেটা একটা বিষয়। কারণ, ক্যাম্পাসে সহাবস্থান নাই। কিছুদিন আগেও আমাদের ওপর হামলা হয়েছে ক্যাম্পাসের জিমনেসিয়ামে। আরেকটা বিষয় হচ্ছে, আমরা চাই যে প্রশাসন যেন অতি দ্রুত তফসিল ঘোষণা করে। যেহেতু তারা আশ্বাস দিয়েছিল মার্চে নির্বাচন হবে, সে অনুযায়ী যেন তফসিল ঘোষণা করে এবং সব দলের সহাবস্থান নিশ্চিত করা হয়।

নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ

























