সম্প্রতি মিয়ানমারের জান্তা সরকার ঘোষণা দিয়েছে যে, বাংলাদেশে অবস্থানরত তালিকাভুক্ত ৮ লাখ রোহিঙ্গার মধ্যে ১ লাখ ৮০ হাজার রোহিঙ্গা মিয়ানমারে ফেরত যাওয়ার জন্য উপযুক্ত। আরও ৭০ হাজার রোহিঙ্গার যাচাই-বাছাই চূড়ান্ত পর্যায়ে রয়েছে এবং বাকি ৫ লাখ রোহিঙ্গার যাচাই প্রক্রিয়া দ্রুত সম্পন্ন করার আগ্রহ প্রকাশ করেছে তারা। ব্যাংককে অনুষ্ঠিত বিমসটেক সম্মেলনে মিয়ানমারের প্রধানমন্ত্রী ইউ থান সিউ বাংলাদেশি প্রতিনিধি খলিলুর রহমানকে এই তথ্য জানান।
বাংলাদেশ ২০১৮ থেকে ২০২০ সালের মধ্যে ছয় দফায় রোহিঙ্গাদের তালিকা মিয়ানমারকে দিয়েছিল, কিন্তু সে সময় জান্তা সরকার খুবই সামান্য সংখ্যক রোহিঙ্গাকেই স্বীকৃতি দিয়েছিল। ২০২৩ সালে চীনের মধ্যস্থতায় ১১০০ রোহিঙ্গা ফেরত পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হলেও সেটিও ব্যর্থ হয়। মিয়ানমার সরকার ইচ্ছাকৃতভাবে তালিকায় বিভ্রান্তিমূলক তথ্য দিয়ে পরিবারগুলোকে বিচ্ছিন্ন করেছিল, ফলে রোহিঙ্গারা ফিরতে রাজি হয়নি। ২০১৭ সালের রোহিঙ্গা গণহত্যা ও ১১ লক্ষ রোহিঙ্গাকে বাংলাদেশে ঠেলে দেয়ার পর থেকে বাংলাদেশ-মিয়ানমার সম্পর্ক তীব্র অবনতির দিকে যায়। ২০১৮ সালে একটি প্রত্যাবাসন চুক্তি স্বাক্ষরিত হলেও সেখানে রোহিঙ্গাদের “নাগরিক” স্বীকৃতি না দিয়ে শুধুমাত্র “Forcibly Displaced Myanmar Nationals” বলা হয়।
রোহিঙ্গারা বরাবরই রাখাইনের সরকারি প্রত্যাবাসন ক্যাম্পে ফিরতে অনাগ্রহী, কারণ তাদের দাবি তারা তাদের পুরোনো বসতভিটায় ফিরতে চায়। কিন্তু রাখাইনে নিরাপত্তা নেই, এবং সেখানে বর্তমানে আরাকান আর্মির দখল অনেকাংশে বিস্তৃত। এছাড়াও পশ্চিমা দাতা সংস্থাগুলো চীনের মাধ্যমে হওয়া প্রত্যাবাসন প্রক্রিয়াকে সমর্থন করেনি। শেখ হাসিনা এই ইস্যুকে আন্তর্জাতিকভাবে ‘মানবতার মা’ খেতাব আদায়ের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করেছেন, কিন্তু বাস্তবে কোনো কার্যকর সমাধান আনতে ব্যর্থ হয়েছেন। বরং রোহিঙ্গা ইস্যু পশ্চিমা ভূ-রাজনীতির কৌশলে ব্যবহৃত হয়ে কক্সবাজার ও বঙ্গোপসাগরে পশ্চিমা আগ্রহ আরও বাড়িয়ে তোলে।
বর্তমানে মিয়ানমারের প্রায় ৪৫% ভূখণ্ড বিদ্রোহী গোষ্ঠীর নিয়ন্ত্রণে, বিশেষ করে রাখাইন ও চিন রাজ্য। রাখাইনের প্রায় ৯০% এলাকাই এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, এবং কিয়াকফিউ ও সিটুয়ে বন্দরের নিয়ন্ত্রণ হারানো শুধু সময়ের ব্যাপার। চীন ও ভারতের গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক প্রকল্প যেমন সিএমইসি ও কালাদান প্রজেক্ট রাখাইনের উপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চল হারালে জান্তা সরকার শুধু ভূখণ্ডই নয়, তাদের জিও-পলিটিকাল প্রভাবও হারাবে। ফলে রোহিঙ্গাদের ফিরিয়ে এনে রাখাইনে নিজেদের উপস্থিতি ও নিয়ন্ত্রণ পুনরুদ্ধার জান্তার জন্য অত্যন্ত জরুরি হয়ে উঠেছে।
ভারত কৌশলগতভাবে আরাকান আর্মির সঙ্গে সম্পর্ক মজবুত করেছে এবং তাদের সহযোগিতা নিয়ে রাখাইনে তাদের ডিপ সি পোর্ট এবং সংযুক্ত সড়ক প্রকল্প নিরাপদ করেছে। মিজোরামে আরাকান আর্মির নেতাদের বসবাস এবং ভারতীয় পাসপোর্ট ব্যবহার নিয়ে অনেক তথ্য ইতিমধ্যেই আলোচনায় এসেছে।
চীন ও ভারতের উপস্থিতির পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার মতো পরাশক্তিরাও বঙ্গোপসাগরে নিজেদের উপস্থিতি নিশ্চিত করতে চাইবে। এই প্রেক্ষাপটে আরাকান আর্মির সাথে তাদের যোগাযোগ বা সামুদ্রিক দ্বীপে সামরিক ঘাঁটি গড়ে তোলার উদ্যোগ অদূর ভবিষ্যতে দেখা যেতে পারে।
বাংলাদেশ, মিয়ানমার এবং ভারতের সীমান্তবর্তী অঞ্চলজুড়ে ভূ-রাজনীতির এক নতুন অধ্যায়ের সম্ভাবনা দেখা যাচ্ছে। মিজোরামের মুখ্যমন্ত্রী সম্প্রতি তিন রাষ্ট্রে বিচ্ছিন্ন জো জাতিকে খ্রিষ্ট ধর্মের ভিত্তিতে পুনঃসংযুক্ত করার কথা বলেছেন, যা ভবিষ্যতে অঞ্চলটির মানচিত্রে পরিবর্তন আনতে পারে। রাখাইনে জান্তা সরকারের সেনা ঘাটতি এবং যুদ্ধের জন্য জনবল সংকটের প্রেক্ষিতে রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীই এখন তাদের শেষ ভরসা। এরই ধারাবাহিকতায় তারা বাংলাদেশে থাকা রোহিঙ্গাদের সেনাবাহিনীতে যোগ দিলে নাগরিকত্বসহ নানা সুযোগ-সুবিধার ঘোষণা দিয়েছে।
রাখাইনে আরাকান আর্মিকে প্রতিহত করতে জান্তা সরকারের জন্য বাংলাদেশের সমর্থন অপরিহার্য। বাংলাদেশের সহযোগিতা ছাড়া তারা আরাকান আর্মির বিরুদ্ধে যুদ্ধ জিততে পারবে না। এই বাস্তবতা বাংলাদেশকে এখন একটি কৌশলগত সুবিধাজনক অবস্থানে নিয়ে এসেছে। সম্প্রতি মিয়ানমারে ঘটে যাওয়া ভূমিকম্প দেশটির অবকাঠামোকে ধ্বংস করেছে। মিয়ানমার সরকারের পুনর্বাসন ও উদ্ধার কার্যক্রম পরিচালনার সক্ষমতা নেই বললেই চলে। এই প্রেক্ষাপটে যুদ্ধ চালিয়ে যাওয়া অসম্ভব হয়ে পড়েছে এবং তারা যুদ্ধবিরতি ঘোষণা করেছে।
সব দিক বিবেচনায় দেখা যায়, মিয়ানমার সরকারের রোহিঙ্গা প্রত্যাবাসন ইচ্ছা কেবল মানবিক বা রাজনৈতিক কূটনীতির ফল নয়, বরং এটি একটি চরম নিরাপত্তা ও অস্তিত্ব রক্ষার কৌশল। রাখাইনে প্রভাব হারানোর আশঙ্কা এবং আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ চাপ জান্তা সরকারকে এই পথে হাঁটতে বাধ্য করেছে। তবে বাস্তবতা হলো, রোহিঙ্গাদের অধিকাংশ অঞ্চল এখন আরাকান আর্মির নিয়ন্ত্রণে, ফলে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত তাদের হাতেই।



























