আইইডিসিআর ছাড়া অন্য কোনো প্রতিষ্ঠান বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করছে না। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলো নিজেদের হাসপাতাল বা প্রতিষ্ঠানের রোগীদের মধ্য থেকে পরীক্ষা করছে বা রেফারেল সিস্টেমের আওতায় অন্যান্য হাসপাতাল থেকে আসা নমুনা পরীক্ষা করে দিচ্ছে।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে অবশ্য নিজেদের ভর্তীকৃত রোগীর বাইরে আলাদা ফিভার ক্লিনিক করে বহির্বিভাগের রোগীদের কিছু পরীক্ষার ব্যবস্থা করছে। একজন সিনিয়র সাংবাদিক কোনো একটি ভাইরাসে আক্রান্ত হওয়ার পর তাঁর পরিবারের সদস্যদের পরীক্ষা করার জন্য আইইডিসিআরের সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করলেও সাড়া পাচ্ছিলেন না ঘণ্টার পর ঘণ্টা। ফলে তিনি একদিকে নিজের অবস্থা, অন্যদিকে পরিবারের অন্য সদস্যদের নিয়ে দীর্ঘ সময় রীতিমতো দুর্বিষহ মানসিক যন্ত্রণায় কাটাচ্ছেন। এ রকম এক-দুজন নয়, প্রতিদিন অনেকেই অভিযোগ জানান গণমাধ্যমকর্মীদের কাছে।

অন্যদিকে সরকারি বুলেটিনে প্রতিদিন জানানো হয়, ঢাকায় ১০টি প্রতিষ্ঠানে চলছে করোনাভাইরাস পরীক্ষা। কিটের অভাব নেই। তবু কেন পরীক্ষার ক্ষেত্রে মানুষের অপেক্ষা দীর্ঘায়িত হচ্ছে, কেন মানসিকভাবে হয়রানির শিকার হচ্ছে তা খুঁজতে গিয়ে ভিন্ন পরিস্থিতির তথ্য মেলে। জানা যায় কাগজে-কলমে বা সরকারি ঘোষণায় ঢাকায় এ পর্যন্ত আটটি পরীক্ষাকেন্দ্র চালু হলেও তার মধ্যে অনেক রকমফের রয়েছে। এর মধ্যে এখন পর্যন্ত শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরীক্ষা শুরু করা যায়নি। পিসি আর যন্ত্র থাকলেও ওই প্রতিষ্ঠানের ল্যাবরেটরি এখনো প্রস্তুত নয়।

ঢাকার একমাত্র আইইডিসিআর বাড়ি থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ করতে গিয়ে পড়েছে প্রচণ্ড চাপের মুখে। বিশেষ করে প্রতিদিন যত লোকের নমুনা সংগ্রহ করার তালিকা প্রস্তুত হয় তার সবটা সংগ্রহ করা যাচ্ছে না জনবল ও পরিবহনের অভাবে। ফলে সব মিলিয়ে নমুনা সংগ্রহ এখনো গতি পায়নি খোদ ঢাকা শহরে। অথচ ঢাকায় এখন আক্রান্ত সবচেয়ে বেশি আবার বিস্তারের ঝুঁকিও বেশি। জনবলের অভাবকেই এ জন্য বেশি দুষছে কর্তৃপক্ষ।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের অতিরিক্ত মহাপরিচালক অধ্যাপক ডা. নাসিমা সুলতানা বলেন, ‘নমুনা সংগ্রহের ক্ষেত্রে ঢাকায় আমরা এখনো বড় ধরনের সংকটের মধ্যে রয়ে গেছি। এ ক্ষেত্রে আগে থেকেই বাংলাদেশের স্বাস্থ্য ব্যবস্থায় তৃণমূল পর্যায়ে যত শক্তিশালী ব্যবস্থাপনা রয়েছে সরকারিভাবে, ঢাকাসহ মহানগরীগুলোতে তা নেই। কারণ মহানগরের স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা  রয়েছে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের আরবান হেলথ কার্যক্রমের আওতায়। সেখানে আমাদের সুযোগ নেই। এ ক্ষেত্রে স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়কে আমরা ইতিমধ্যেই আমাদের সঙ্গে যুক্ত হয়ে কাজ করার আহ্বান জানিয়েছি। এই কর্মকর্তা আরো বলেন, ‘পাশাপাশি আইইডিসিআর ছাড়া অন্য যেসব প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার ব্যবস্থা করা হয়েছে, সেগুলোর কোনোটিতেই মানুষের বাড়ি বাড়ি গিয়ে নমুনা সংগ্রহ করে আনার মতো জনবল ব্যবস্থাপনা নেই। ওই প্রতিষ্ঠানগুলো কেবল নিজেদের রোগী বা কিছু রেফারেল নমুনা পরীক্ষা করছে। সব মিলিয়ে আমরা পরীক্ষার বিষয়টিকে আরো জোরালোভাবে কার্যকর করার চেষ্টা চালাচ্ছি। এ ক্ষেত্রে মানুষের যে কিছুটা হয়রানি বা ধৈর্য বিচ্যুতি ঘটছে সেটা আমরা বুঝতে পারি।’

আইইডিসিআরের পরিচালক অধ্যাপক মীরজাদী সেব্রিনা ফ্লোরা বলেন, ‘আসলেই আমাদের এখন চাপ সামলানো মুশকিল হয়ে পড়েছে। প্রতিদিন যে পরিমাণ মানুষের নমুনা সংগ্রহ করার তালিকা করছি সে অনুযায়ী এক দিনের মধ্যে সবার নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। বিষয়টি নিয়ে আমরা রীতিমতো হিমশিম খাচ্ছি। ইতিমধ্যে আমরা দক্ষ টেকনোলজিস্ট সংগ্রহের চেষ্টা করছি। আমাদের আরো ল্যাব টেকনোলজিস্ট সাপোর্ট দেওয়ার জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তর প্রক্রিয়া শুরু করেছে।’

আইইডিসিআরের প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ড. এস এম আলমগীর বলেন, ‘প্রতিদিন আমাদের হটলাইনে যত ফোন কল আসে সেগুলো আমরা কয়েকটি ক্যাটাগরিতে ভাগ করি। এর মধ্যে যেসব ফোন কলে করোনাভাইরাসের উপসর্গ আছে বলে জানানো হয় কিংবা উপসর্গ না থাকলেও পজিটিভ কোনো রোগীর সংস্পর্শে থাকার তথ্য জানানো হয়, তাদের নমুনা সংগ্রহ করার একটি তালিকা প্রস্তুত করা হয়।

প্রতিদিন সেই তালিকা ধরে সিরিয়াল অনুযায়ী প্রায় ২৪ ঘণ্টা ঘুরে ঘুরে নমুনা সংগ্রহ করা হয়। এ জন্য ১৬-১৭ জনের একটি টিম কাজ করে। ইতিমধ্যেই এই টিমের তিন-চারজন সংক্রমিত হয়েছেন। যাঁদের আইসোলেশনে রাখা হয়েছে। তিনি বলেন, ‘প্রতিটি নমুনা সংগ্রহ করতে প্রতিটি টিমে কমপক্ষে দুজনকে কাজ করতে হয়। সময় একেবারে কম লাগে না। এ ক্ষেত্রে আপাতত প্রতিদিন আমরা প্রায় ৬০০ জনের মতো একটি তালিকা করি। কিন্তু জনবল এবং পরিবহনের অভাবে সবার নমুনা এক দিনের মধ্যে সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। ৪৫০-৫০০ জনের মতো নমুনা সংগ্রহ করা সম্ভব হয়। বাকিদের আমরা অপেক্ষা করতে বলি। এ বিষয়টি সবার বোঝা উচিত। সবার একটু ধৈর্য ধরা উচিত। যারা আগে থেকে বিভিন্ন জটিলতায় ভুগছে কিংবা যাদের অবস্থা তুলনামূলক খারাপ, আমরা তাদের নমুনা আগে সংগ্রহ করি। যাদের তেমন কোনো উপসর্গ নেই বা সুস্থ আছে তাদেরটা একটু শেষের দিকে রাখি। এতে হয়তো এক দিনেরটা আরেক দিন সংগ্রহ করতে হচ্ছে। কিন্তু আমাদের আন্তরিকতার কোনো ঘাটতি নেই।’

ড. আলমগীর আরো বলেন, ‘এর বাইরে কেউ শুধু সাধারণ কিছু প্রশ্ন করেন বা তথ্য জানতে চান। কেউ পরামর্শ চান সাধারণ উপসর্গ অনুসারে কী চিকিৎসা নেবেন সেগুলোর জন্য। আবার যাঁরা পজিটিভ হয়েছেন, কিন্তু বাসায় আইসোলেশনে আছেন, তাঁরা কী করবেন না করবেন সে বিষয়ে জানতে চান। পাশাপাশি যারা কোয়ারেন্টিনে আছেন তাঁরাও কিছু তথ্য জানতে চান। আর এসব কল রিসিভ করা, তাঁদের সঙ্গে কথা বলার জন্য অনেক লোককে ব্যস্ত থাকতে হয়।’

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের পাশেই শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার ইনস্টিটিউট ও হাসপাতালে পরীক্ষা না হওয়ার বিষয়ে জানতে চাইলে এর পরিচালক অধ্যাপক ডাক্তার গোলাম ফারুক বলেন, ‘আমাদের এখানে করোনাভাইরাস পরীক্ষার যন্ত্র ও কিট আগেই আছে। সমস্যা হচ্ছে এখন পর্যন্ত উপযুক্ত মানের ল্যাবরেটরির প্রস্তুতি সম্পন্ন হয়নি। এ জন্য কাজ চলছে। আশা করি, আর দু-তিন দিনের মধ্যে এই কাজ শেষ হয়ে যাবে। এদিকে শুধু পরীক্ষা নিয়ে মানুষের হয়রানি বা উৎকণ্ঠা নয়, পরীক্ষায় পজিটিভ ফলাফল আসার পরে চিকিৎসা নিয়েও মানুষ উৎকণ্ঠার মধ্যে আছে। তাদের কখন কিভাবে বাসা থেকে হাসপাতালে নেওয়া হবে কিংবা হাসপাতালে কিভাবে  চিকিৎসা পাবে তা নিয়ে রয়েছে বিস্তার উদ্বেগ। এখনো সরকারি ও বেসরকারি হাসপাতালে গিয়ে রোগীদের পড়তে হচ্ছে ঠেলাঠেলির মুখে। করোনাভাইরাসের উপসর্গ জানলেই হাসপাতালগুলো তাদের ফিরিয়ে দিচ্ছে। প্রাইভেট হাসপাতালগুলো রোগীদের অনেক ক্ষেত্রে ভেতরেই ঢুকতে দিচ্ছে না বলে অভিযোগ করেছে কোনো কোনো রোগীর স্বজনরা। সরকারি হাসপাতালেও একই অবস্থা। এমনকি কভিড-১৯-এর বিশেষায়িত হাসপাতাল হিসেবে নির্ধারণ করা কোনো কোনো হাসপাতালে যাওয়ার পরও রোগীরা হয়রানির শিকার হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন রোগী বলেন, ‘রেজাল্ট পজিটিভ জানানোর পরে আমি শেখ রাসেল জাতীয় গ্যাস্ট্রোলিভার হাসপাতালে গেলে সেখান থেকে ফিরিয়ে দেওয়া হয়। এমন অভিযোগ সম্পর্কে ওই হাসপাতালের পরিচালক বলেন, ‘এই হাসপাতালটি বিশেষায়িত কভিড-১৯ হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে গত মাসে। আমরা প্রস্তুত আছি। কিন্তু এখন পর্যন্ত আমাদের এখানে কোনো রোগী পাঠানো হয়নি। এ ক্ষেত্রে মৌখিকভাবে জানতে পেরেছি আপাতত ডিপ্লোমেটিক জোনের রোগীদের জন্য এই হাসপাতাল সংরক্ষিত থাকতে পারে। তবে যদি তেমন কোনো রোগী না আসে সে ক্ষেত্রে আমরা সাধারণ রোগীদেরও ভর্তি  করব।’

অন্যদিকে প্রথম নির্ধারিত কভিড-১৯ হাসপাতাল হিসেবে চালু করা কুয়েত বাংলাদেশ মৈত্রী হাসপাতালটির ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তন এলেও ভেতরে কিছু কিছু সমস্যা এখনো বিদ্যমান। এ ক্ষেত্রে জনবল ও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম না থাকা বড় সমস্যা বলে জানিয়েছেন ওই হাসপাতালে কর্মরত একাধিক চিকিৎসক।

কুর্মিটোলা জেনারেল হাসপাতালেও সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম না থাকায় একই ধরনের সমস্যা হচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক ওই হাসপাতালের একজন চিকিৎসক বলেন,  ‘এখানেও জনবলের বড় ঘাটতি রয়েছে। আবার সেন্ট্রাল অক্সিজেন সিস্টেম নেই। ফলে রোগীর চাপ বেড়ে গেলে অক্সিজেনের সংকট দেখা দেয়। অক্সিজেনের টানাটানির কারণে আমরা ডাক্তাররাও ছোটাছুটি করি। অনেক ক্ষেত্রে রোগীরা বিষয়টি বুঝতে পারে না। তারা আমাদের সম্পর্কে ভুল ধারণা করে। আমরা নিজেদের জীবন বাজি রেখে তাদের জন্য কাজ করছি ব্যবস্থাপনার সীমাবদ্ধতার মধ্যেই।’

অন্যদিকে কভিড হাসপাতালগুলোয় করোনা পজিটিভ কোনো রোগীর মৃত্যু হলে সেই মরদেহ নেওয়ার ক্ষেত্রেও স্বজনদের ভোগান্তি পোহাতে হচ্ছে। কেউ কেউ অভিযোগ করেছে, দু-তিন দিনেও তারা মরদেহের সন্ধান পাচ্ছে না। এমনকি কাউকে কাউকে ঢাকায় দাফন করা হলেও স্বজনরা ঠিকমতো জানতে পারছে বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে