ইয়াছির আরাফাত, সাংবাদিক ও সাংস্কৃতিক কর্মী(উদীচী)
বাংলাদেশের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনৈতিক প্রতিরোধ, গণতান্ত্রিক চেতনা, নারীর অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলায় সংস্কৃতি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বারবার। এই প্রেক্ষাপটে ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়—বরং এটি বাংলাদেশের প্রতিরোধ-সংস্কৃতির প্রতীক। ১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত উদীচী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানী দমন-পীড়নের সময় থেকে শুরু করে আজ অবধি তারা গণসংগীত, পথনাটক, আবৃত্তি, নাচ ও নাটকের মাধ্যমে যে সমাজ সচেতনতা তৈরি করেছে তা বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ। বিশেষ করে নারীর বিরুদ্ধে সহিংসতা, যৌন হয়রানি, নিপীড়নবিরোধী সচেতনতা তৈরিতে উদীচীর ভুমিকা উজ্জ্বল।
বর্তমানে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। একদিকে আইনি কাঠামো দুর্বল, অন্যদিকে সামাজিক ও ধর্মীয় গোঁড়ামি নারীর প্রতি সহিংসতাকে প্রশ্রয় দেয়। পারিবারিক নির্যাতন, কর্মক্ষেত্রে বৈষম্য, রাস্তাঘাটে হয়রানি—এসব যেন নারীর দৈনন্দিন বাস্তবতা হয়ে দাঁড়িয়েছে।এই সংকটময় সময়ে সংস্কৃতি হয়ে উঠতে পারে এক প্রকার বিকল্প প্রতিরোধের ভাষা। উদীচী তার কার্যক্রমে নারীর সমান অধিকার, বৈষম্যবিরোধী বার্তা, এবং মানবিক মূল্যবোধকে কেন্দ্রে রেখে কাজ করে আসছে। তাদের নাট্যচর্চায় ‘নারীর চোখে সমাজ’, ‘যৌন নিপীড়নের গল্প’, ‘প্রতিবাদী কণ্ঠ’—এমন থিম উঠে আসে যা শ্রোতাদের মনে প্রশ্ন জাগায়, সংলাপ তৈরি করে।উদীচীর মতো সংগঠন শুধু সমস্যা তুলে ধরেই থেমে থাকে না, বরং সৃজনশীলভাবে প্রতিকার ও প্রতিরোধের চিন্তাভাবনাও তুলে ধরে। তাদের কর্মশালা, আবৃত্তি অনুষ্ঠান, নাট্যোৎসব, পোস্টার ক্যাম্পেইন ইত্যাদির মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মাঝে সচেতনতা তৈরি করা হয়। বিশেষ করে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক কর্মসূচিতে নারীবান্ধব মানসিকতা গড়ে তুলতে তাদের কার্যক্রম অত্যন্ত কার্যকর।তবে শুধু উদীচী বা কিছু সংগঠনের কাঁধে দায়িত্ব তুলে দিলে চলবে না। আমাদের সকলের সম্মিলিত দায়বদ্ধতাই পারে এই লড়াইকে শক্তিশালী করতে। পরিবার থেকে শুরু করে রাষ্ট্র—সবখানে নারীকে মানুষ হিসেবে সমান মর্যাদা দিতে হবে। মিডিয়া, সাহিত্য, নাটক, সংগীত, চলচ্চিত্র—সবখানে নারীকে ভিকটিম নয়, সংগ্রামী হিসেবে উপস্থাপন করতে হবে।বিশেষ করে তরুণ সমাজকে সংস্কৃতি দিয়ে একত্রিত করতে হবে। কারণ আজকের তরুণরাই আগামী দিনের সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী। তারা যেন নারীঘৃণা, গুজব, মৌলবাদ, নিপীড়নের বিরুদ্ধে স্পষ্ট অবস্থান নিতে পারে—এই চেতনা গড়ে তুলতে সংস্কৃতি অপরিহার্য।উদীচীর মতো সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোকে প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা দেওয়া, তাদের অনুষ্ঠান আয়োজনের জায়গা, অর্থায়ন, প্রচার—এসব নিশ্চিত করা রাষ্ট্রের দায়িত্ব। কারণ সাংস্কৃতিক আন্দোলন কোনো বিলাসিতা নয়—এটি গণতান্ত্রিক ও মানবিক সমাজের অন্যতম ভিত্তি।বাংলাদেশের ইতিহাসে সাংস্কৃতিক আন্দোলনের ভূমিকাকে অস্বীকার করার উপায় নেই। রাজনৈতিক প্রতিরোধ, গণতান্ত্রিক চেতনা, নারীর অধিকার, ধর্মীয় মৌলবাদের বিরুদ্ধে সচেতনতা গড়ে তোলায় সংস্কৃতি একটি শক্তিশালী হাতিয়ার হয়ে উঠেছে বারবার। এই প্রেক্ষাপটে ‘উদীচী শিল্পীগোষ্ঠী’ শুধুমাত্র একটি সাংস্কৃতিক সংগঠন নয়—বরং এটি বাংলাদেশের প্রতিরোধ-সংস্কৃতির প্রতীক।
১৯৬৮ সালে প্রতিষ্ঠিত উদীচী মুক্তিযুদ্ধের চেতনা, গণতন্ত্র, মানবাধিকার ও প্রগতিশীল মূল্যবোধ ছড়িয়ে দেওয়ার মাধ্যমে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছে। পাকিস্তানি দমন-পীড়নের সময় থেকে শুরু করে একুশ শতকের জঙ্গিবাদ, মৌলবাদ, নারীর প্রতি সহিংসতা—সবকিছুর বিরুদ্ধে তারা গান, কবিতা, নাটক, পথনাট্য ও শিল্পের মাধ্যমে প্রতিবাদ করেছে। ২০০১ সালের ১৪ মার্চ যশোরে উদীচীর সম্মেলনে বোমা হামলা হয়, যেখানে ১০ জন প্রাণ হারান এবং বহু মানুষ আহত হন। এটি ছিল প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক প্রতিরোধের বিরুদ্ধে মৌলবাদী শক্তির নগ্ন আক্রমণ। কিন্তু এই হামলাও উদীচীর অগ্রযাত্রা থামাতে পারেনি। বরং তারা আরও দৃঢ়ভাবে সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ গড়ে তোলে।বর্তমানে বাংলাদেশে নারী নির্যাতন, ধর্ষণ, যৌন হয়রানি আশঙ্কাজনক হারে বেড়েছে। বাংলাদেশ মহিলা পরিষদের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে দেশে ধর্ষণের শিকার হয়েছেন প্রায় ১,২০০ নারী ও শিশু, যার মধ্যে গ্যাং-রেপ এবং ধর্ষণের পর হত্যা-এর ঘটনাও উল্লেখযোগ্য। একই সময়ে জেন্ডারভিত্তিক সহিংসতা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৫,০০০ ঘটনার ওপরে। এই পরিস্থিতিতে রাষ্ট্রীয় আইন যেমন “নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন-২০০০” থাকলেও বাস্তব প্রয়োগ ও সামাজিক প্রতিরোধ দুর্বল। আইনি লড়াইয়ের পাশাপাশি চাই মানসিকতা ও চেতনার পরিবর্তন—যেখানে সংস্কৃতি ভূমিকা রাখতে পারে সবচেয়ে কার্যকরভাবে।
উদীচীর কর্মসূচিতে বারবার উঠে এসেছে নারীর অধিকার, যৌন নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ, নারীবাদী চেতনা ও সমাজ পরিবর্তনের সংকল্প। তাদের মঞ্চনাটক ‘জাগো নারী জাগো’, ‘ভালোবাসা ও বিক্ষোভ’ কিংবা ‘ধর্ষিতা’—এমন সব প্রযোজনা দর্শকদের মনে প্রভাব বিস্তার করে। তারা নারীদের শুধু ভিকটিম হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধী চরিত্রে তুলে আনে।শুধু রাজধানীতে নয়, জেলা শহর, গ্রামাঞ্চলেও উদীচী সাংস্কৃতিক প্রতিরোধ ছড়িয়ে দিয়েছে। স্কুল-কলেজ পর্যায়ে নাট্য কর্মশালা, লোকগান, আবৃত্তি ও গণসংগীতের মাধ্যমে তরুণ প্রজন্মের মধ্যে নারীবান্ধব ও বৈষম্যবিরোধী মনোভাব গড়ে তুলছে। এখানে উল্লেখযোগ্য যে, ঢাকায় “ধর্ষণের বিরুদ্ধে গণআন্দোলন” বা “মেট্রোরেলে যৌন হয়রানি প্রতিরোধে ক্যাম্পেইন”-এ উদীচীর সদস্যরা সক্রিয় ভূমিকা রেখেছে। নারীপক্ষ, বাংলাদেশ নারী মুক্তি কেন্দ্র বা জাগরণী চক্র-এর সঙ্গে একযোগে কাজ করে তারা মাঠপর্যায়ে গিয়ে নাটক পরিবেশন, লিফলেট বিতরণ ও মানববন্ধনের আয়োজন করেছে। তবে এখানে আমাদের সামাজিক দায়ও বড় প্রশ্ন। নারী নির্যাতনের বিরুদ্ধে কেবল কয়েকটি সংগঠন মুখ তুললেই হবে না। পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, ধর্মীয় মঞ্চ—সবখানেই নারী-পুরুষের সমতা ও মর্যাদা বিষয়ক আলোচনা জরুরি। মিডিয়া ও বিজ্ঞাপন জগতে নারীর উপস্থাপনাও পরিবর্তনের দাবি রাখে।
প্রতিরোধ তখনই শক্তিশালী হয়, যখন তা গণমানুষের অংশগ্রহণে গড়ে ওঠে। উদীচী তার সাংস্কৃতিক চর্চায় সাধারণ মানুষকে যুক্ত করে একপ্রকার গণতান্ত্রিক প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেছে, যেখানে নারীর কণ্ঠস্বর চাপা পড়ে না, বরং উচ্চকিত হয়।রাষ্ট্রকে এই সাংস্কৃতিক প্রতিরোধে পৃষ্ঠপোষক হতে হবে। উদীচীর মতো সংগঠনকে নিয়মিত অনুদান, স্থানীয় পর্যায়ে সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ, নাট্যশালার ব্যবস্থা, ও গণমাধ্যমে প্রচারের সুযোগ করে দিতে হবে।সংস্কৃতি নিছক বিনোদন নয়, এটি প্রতিবাদ ও বিকল্প চিন্তার একটি শক্তিশালী মাধ্যম। উদীচী তার পথচলায় দেখিয়ে দিয়েছে কিভাবে শিল্প ও সংস্কৃতি হয়ে উঠতে পারে শোষণ ও নিপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদের ভাষা। নারী নির্যাতন, যৌন হয়রানি ও বৈষম্যের বিরুদ্ধে শুধু আইন নয়, চাই সামাজিক মানসিকতার পরিবর্তন—যা সম্ভব সংস্কৃতির মাধ্যমে।এই পরিবর্তনের পথে আমাদের সক্রিয় অংশগ্রহণই ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য একটি মানবিক, নিরাপদ ও সমানাধিকারভিত্তিক সমাজ গঠনে সহায়ক হবে। উদীচীর দীপ্ত সুর, প্রতিরোধী নাটক, প্রতিবাদী চিত্রকর্ম আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যেখানে রাজনীতি ও আইন ব্যর্থ, সেখানেও সংস্কৃতি পথ দেখাতে পারে।




























