নিজস্ব সংবাদদাতা, যশোর জেলা অফিস।।
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন নির্যাতনের ঘটনায় ছাত্রলীগের কর্মীরা জড়িত। যে কক্ষে নিয়ে নির্যাতন করা হয়েছে সেটিও ছাত্রলীগের রুম বলে চিহ্নিত। নির্যাতনের ঘটনায় বিচার দাবি করলেও শিক্ষার্থীরা ছাত্রলীগ ইস্যুতে প্রকাশ্যে বলতে চাননি। তবে এ ঘটনায় ছাত্রলীগের কোন সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন ছাত্রলীগের সভাপতি। এদিকে, ঘটনায় অভিযুক্ত সালমান ও শোয়েবকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন।

যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের মশিউর রহমান হলের ৫২৮ নম্বরের কক্ষে ইসমাইল হোসেনকে ডেকে নিয়ে পাঁচ ঘন্টা ধরে নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত সালমান ও শোয়েব। হলে নিজেদের প্রভাব বিস্তারের জন্য তারা এ কক্ষের দরজায় ছাত্রলীগের স্টিকার লাগিয়ে রেখেছিলেন। যে স্টিকার গতকাল রাতে কক্ষ সিলগালা করার আগ পর্যন্ত দরজায় সাটানো ছিল। সিলগালা করার ঠিক আগ মুহূর্তে ছাত্রলীগের সভাপতি সেক্রেটারির উপস্থিতিতে ওই স্টিকারটি ছিঁড়ে ফেলা হয়।

নাম প্রকাশ না করার শর্তে হলের কিছু শিক্ষার্থী জানান, ছাত্রলীগের একটি সঙ্ঘবদ্ধ সিন্ডিকেট আছে। যারা প্রশ্ন ফাঁস, প্রক্সি দিয়ে ছাত্র ভর্তি বাণিজ্য করে থাকে। পাশাপাশি এই গ্রুপটি বিভিন্ন সময় সাধারণ শিক্ষার্থীদের ধরে নিয়ে প্রক্সি কাণ্ডে জড়িত বলে ভয়ভীতি দেখিয়ে মুক্তিপণ আদায় করে। যারা টাকা দেয় না তাদের উপরে নেমে আসে নির্যাতন। একাধিক ঘটনা ঘটলো ভুক্তভোগীরা প্রাণ ভয়ে তা প্রকাশ্যে আনেননি। এইবারও একইভাবে ইসমাইলের কাছে চাঁদা দাবি করা হয়েছিল। সাদার টাকা না দেয়া য় তার উপরে পাশবিক নির্যাতন চালানো হয়।

নির্যাতিত শিক্ষার্থী ইসমাইল হোসেন দাবি করেছেন, সালমান ও শোয়েব তাকে ডেকে নিয়ে যাওয়ার পর তার কাছে দুই লাখ টাকা চাঁদা দাবি করে। টাকা না দিলে প্রক্সিকাণ্ডের কথা বলে ফাঁসানো হবে বলেও হুমকি দেয়। এক পর্যায়ে তাকে মারপিট করে ভিডিও স্বীকারোক্তি নেওয়ার চেষ্টা করে। দফায় দফায় মারপিটের একপর্যায়ে তারা ১০’লাখ টাকা পর্যন্ত চাঁদা দাবি করে। তাকে মারপিটের সময় সালমান ও শোয়েব ছাড়াও আরো একজন ছিলেন। তবে তিনি তার নাম জানেন না।

তানভীর হোসেন নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, চাঁদাবাজির কারণেই মূলত ইসমাইলকে মারপিট করা হয়েছে। এ ধরনের একটি সিন্ডিকেট দীর্ঘদিন ধরে বিশ্ববিদ্যালয় রয়েছে। এ ধরনের বহু ঘটনার গুঞ্জন থাকলেও এই প্রথমবার বিষয়টি প্রকাশ্যে এসেছে। রুহুল আমিন নামে অপর এক শিক্ষার্থী বলেন, আমরা এই ক্যাম্পাসে এসেছি পড়াশোনার জন্য। এখানে সুষ্ঠু পরিবেশ থাকবে সেটাই কাম্য। কিন্তু কিছু শিক্ষার্থী সিন্ডিকেট গঠন করে যে অত্যাচার নিপীড়ন চালাচ্ছে এটা বন্ধ হওয়া জরুরী। আগে গুঞ্জন শুনতাম এখন তা সত্যিই হতে দেখছি। এটা বন্ধ না হলে লেখাপড়ার পরিবেশ থাকবে না বিশ্ববিদ্যালয়ে।

জীবন নামে অপর শিক্ষার্থী বলেন, নেককার জনকে ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির প্রয়োজন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের কাছে দাবি রাখবো দ্রুততম সময়ের মধ্যে তদন্ত করে অভিযুক্তদের স্থায়ী বহিষ্কার করা হোক। নির্যাতনের সাথে জড়িতরা ও কক্ষটির সাথে ছাত্রলীগের সম্পৃক্ততার অভিযোগ উঠলেও তা অস্বীকার করেছে বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের সভাপতি মোঃ সোহেল রানা। তিনি বলেন, বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগ মিছিল মিটিংয়ের জন্য ডাকলে সকলে চলে আসে। মিছিলের শেষ ব্যক্তিটিও মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী। কিন্তু কারো ব্যক্তিগত অপরাধ কর্মকান্ডের দায় ছাত্রলীগ নিতে পারে না। তাছাড়া যাদের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠেছে তারা কখনোই ছাত্রলীগের সাথে সম্পৃক্ত ছিল না বা তাদের কোন পদ পদবীও নেই। তিনি এই ন্যক্কারজনক ঘটনার বিচারও দাবি করেন।

এদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য্য প্রফেসর ডক্টর আনোয়ার হোসেন বলেন, দীর্ঘদিন ধরে এই সিন্ডিকেটের বিরুদ্ধে অভিযোগ শুনে আসছিলাম। কিন্তু কোন তথ্য প্রমাণ পাচ্ছিলাম না। একবার একটি মেয়ে অভিযোগ করলেও পরবর্তীতে সে অভিযোগ উঠিয়ে নেয়। যে কারণে কোন ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব হয়নি। এবার আমরা ঘটনার সত্যতা পেয়েছি, ভিকটিমকে উদ্ধার করে হাসপাতালে ভর্তি করেছি। তাছাড়া হল প্রভোস্টসহ শিক্ষকরা যখন ওই কক্ষটি সিলগালা করতে যায় তখন সালমান শিক্ষকদের সাথে দুর্ব্যবহার করে। আমি ঘটনাস্থলে পৌঁছানোর আগেই সে সেখান থেকে পালিয়ে যায়। আজ সকালে এ ঘটনায় অভিযুক্ত সালমান ও শোয়েবকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করা হয়েছে। পাশাপাশি তদন্ত কমিটি গঠনের প্রক্রিয়া চলছে। তদন্ত রিপোর্ট পেলে তাদের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি গ্রহন করা হবে।

প্রসঙ্গত, নির্যাতিত ইসমাইল হোসেন বিশ্ববিদ্যালয়ের নিউট্রিশন এন্ড ফুড টেকনোলজি (এনএফটি) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের অনাবাসিক ছাত্র। কম্পিউটার সাইন্স এন্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের চতুর্থ বর্ষের ছাত্র সালমান এম রহমান ও শোয়েব আলী তাকে রোববার দুপুর ২টা থেকে সন্ধ্যা ৬টা পর্যন্ত মসিয়ূর রহমান হলের ৫২৮ নম্বর কক্ষে আটকে রেখে নির্যাতন চালায়।

যবিপ্রবি’র শিক্ষার্থীকে নির্যাতন ও চাঁদাবাজির ঘটনায় অপর দুই শিক্ষার্থীর নামে মামলা
যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) শিক্ষার্থীকে হলে আটকে রেখে নির্যাতন ও চাঁদাবাজির ঘটনায় যশোর কোতোয়ালি থানায় মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলায় অজ্ঞাত একজনসহ তিনজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলার বাদী হয়েছেন শহীদ মশিউর রহমান হলের প্রভোস্ট সহযোগী অধ্যাপক আশরাফুজ্জামান জাহিদ। মামলার এজাহারনামীয় আসামিরা হলো বিশ্ববিদ্যালয়ের কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শোয়েব আলী ও সালমান এম রহমান।

যশোর কোতোয়ালি থানার ওসি তাজুল ইসলাম জানান, আজ (সোমবার) রাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে ইসমাইল হোসেন নামে এক শিক্ষার্থীকে মারপিট ও ১০ লাখ টাকা চাঁদার দাবিতে অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে। অভিযোগটি মামলা হিসেবে গ্রহণ করা হয়েছে। মামলা নং ১৫। অভিযোগের বিষয়ে তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।

প্রসঙ্গত, রোববার দুপুর ২টার দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি (এনএফটি) বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইসমাইল হোসেনকে শহীদ মশিউর রহমান হলের ৫২৮ নম্বরের কক্ষে ডেকে নিয়ে পাঁচ ঘন্টা ধরে নির্যাতন চালায় ছাত্রলীগ কর্মী হিসেবে পরিচিত সালমান, শোয়েবসহ তিনজন। এ ঘটনায় ইতিমধ্যে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ অভিযুক্ত সালমান ও শোয়েবকে হল ও বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িক বহিষ্কার করেছে।

হলে শিক্ষার্থী নির্যাতনের ঘটনায় যবিপ্রবির দুই ছাত্র সাময়িক বহিষ্কার
নিজস্ব সংবাদদাতা, যশোর জেলা অফিস।। যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের (যবিপ্রবি) পুষ্টি ও খাদ্য প্রযুক্তি (এনএফটি) বিভাগের শিক্ষার্থী মো. ইসমাইল হোসেনকে ‘শারীরিকভাবে নির্যাতন ও হলে শৃঙ্খলা ভঙ্গের’ দায়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শোয়েব আলী ও সালমান এম রহমানকে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সাময়িকভাবে বহিষ্কার করা হয়েছে। একইসাথে তাদের বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে প্রবেশেও নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা হয়েছে।

আজ সোমবার বিকেলে যবিপ্রবির রেজিস্ট্রার প্রকৌশলী মোঃ আহসান হাবীবের স্বাক্ষরিত এক অফিস আদেশে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে দুপুরে যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন বরাবর লিখিত অভিযোগ দেন এনএফটি বিভাগের শিক্ষার্থী মোঃ ইসমাইল হোসেন।

ঘটনার ভয়াবহতা বিবেচনায় যবিপ্রবি উপাচার্য অধ্যাপক ড. মোঃ আনোয়ার হোসেন ইতিমধ্যে শহীদ মসিয়ূর রহমানের হলের প্রভোস্টকে অভিযুক্ত দুই শিক্ষার্থীদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা দায়ের এবং আক্রান্ত শিক্ষার্থীর নিরাপত্তা নিশ্চিতের জন্য ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ দিয়েছেন। শহীদ মসিয়ূর রহমান হল কর্তৃপক্ষও সহকারী প্রভোস্ট তরুন সেনকে প্রধান করে পাঁচ সদস্যবিশিষ্ট একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করেছে। একইসাথে বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রক্টর বডিকে একটি তদন্ত কমিটি করে আগামী সাত দিনের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দেওয়ারও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। গতকাল রোববার রাতেই শহীদ মসিয়ূর রহমান হল কর্তৃপক্ষ মোঃ ইসমাইল হোসেনকে শারীরিকভাবে নির্যাতন ও হলের শৃঙ্খলা ভঙ্গের দায়ে কম্পিউটার বিজ্ঞান ও প্রকৌশল (সিএসই) বিভাগের চতুর্থ বর্ষের শিক্ষার্থী মোহাম্মদ শোয়েব আলী ও সালমান এম রহমানকে হল থেকে সাময়িক বহিষ্কার করে।

এদিকে, সালমান এম রহমান ও মো. শোয়েব গতকাল রোববার দুপুর ২টার দিকে ইসমাইলকে ডেকে শহীদ মসিয়ূর রহমান হলের ৫২৮নং রুমে নিয়ে যান। এরপর ২টা থেকে ইফতারের আগমুহূর্ত পর্যন্ত স্ট্যাম্প দিয়ে দফায় দফায় তাকে মারধর করা হয়। রাতে ঘটনার শোনার সঙ্গে সঙ্গে যবিপ্রবির হল প্রশাসন আক্রান্ত শিক্ষার্থীকে সাধারণ শিক্ষার্থীদের সহায়তায় উদ্ধারের পর যশোর ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট হাসপাতালে ভর্তি করে। মধ্যরাতে যবিপ্রবি উপাচার্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ডিন, প্রভোস্ট, বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের নেতৃবৃন্দ, সাংবাদিক সমিতির নেতৃবৃন্দকে নিয়ে আক্রান্ত শিক্ষার্থীর শারীরিক খোঁজ-খবর নেওয়ার জন্য হাসপাতালে ছুটে যান। বর্তমানে মো. ইসমাইল হোসেনের শারীরিক অবস্থা উন্নতির দিকে।

যশোর নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে