রাবি প্রতিনিধিঃ রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় (রাবি) শাখা ছাত্রলীগের সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে আগামী ১২ নভেম্বর। সর্বশেষ ২০১৬ সালে কিবরিয়া-রুনুকে সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক করে কমিটি গঠন করা হয়েছিলো। এক বছরের এই কমিটি দীর্ঘ ছয় বছর অতিক্রম শেষে নতুন কমিটির তারিখ ঘোষণা করা হয়েছে। তবে রাবির ছাত্রলীগের কমিটি ৬৪ জেলা থেকে ক্রমান্বয়ে সংকীর্ণ হয়ে বর্তমানে রাজশাহী মহানগরের মধ্যে সীমাবদ্ধ রয়েছে। এদিকে ছাত্রলীগের শীর্ষ পদ পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন রাজশাহীর বাহির থেকে এসে রাজনীতিতে সক্রিয় হওয়া নেতাকর্মীরা।
বাইরে থেকে নেতৃত্ব না আসায় একদিকে যেমন যোগ্য নেতৃত্ব গড়ে উঠছে না অন্যদিকে স্থানীয়রা রাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্বে আসায় ক্যাম্পাসে বাড়ছে ছিনতাই ও বিভিন্ন অসামাজিক কার্যকলাপ। বহিরাগতরা অপকর্ম করে স্থানীয়দের পরিচয় দিয়ে পার পেয়ে যাচ্ছে। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, রাজশাহীর বাহির থেকে যারা রাবি ছাত্রলীগের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন এমন অনেকেই এখন বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের সম্মুখ সারিতে বসে নেতৃত্ব দিচ্ছেন। তাদের মধ্যে অন্যতম হলেন, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বর্তমান সাংগঠনিক সম্পাদক ও সাবেক বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি
সাখাওয়াত হোসেন শফিক। তার বাসা বগুড়া জেলায়। তিনি রাবি শাখার ১৯তম কমিটি (১৯৯৭-২০০২) সেশনের সভাপতি দায়িত্ব পালন করেন।
বর্তমান মাগুরা ১ আসনের সাংসদ সদস্য, বাংলাদেশের কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক, প্রধানমন্ত্রীর সাবেক এপিএস সাইফুজ্জামান শিখর। তার বাসা মাগুরাতে। তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় শাখার ১৮ তম কমিটির (১৯৯৪-৯৭) সেশনের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। এমন আরও অনেকেই যারা রাজশাহীর বাহির থেকে এসে রাবি ক্যাম্পাসে রাজনীতি করেছেন।
সর্বশেষ কমিটিতে সভাপতি দায়িত্ব পেয়েছিলেন গোলাম কিবরিয়া, যার বাসা রাজশাহী মহানগর সংলগ্ন বুধপাড়া এলাকার ৩০ নং ওয়ার্ডে। অন্যদিকে সাধারণ সম্পাদক হয়েছিলেন ফয়সাল আহমেদ রুনু। তার বাসা রাজশাহী মহানগর সংলগ্ন নওহাটাতে।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় কমিটির সমীকরণ ঘেঁটে দেখা যায়, ১৯৬২ সাল থেকে এখন পর্যন্ত ২৫টি কমিটি গঠন করা হয়েছে। ১৯৬২ সাল থেকে নব্বই দশক পর্যন্ত বাংলাদেশের বিভিন্ন জেলা থেকে আসা নেতৃত্ব রাবি ছাত্রলীগের হাল ধরেছেন। কিন্তু ২০০০ সালের পর সেটা ক্রমান্বয়ে কমে উত্তরাঞ্চল তথা বৃহত্তর রাজশাহী ও রংপুর বিভাগের মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়ে যায়। এদিকে ২০০৪ সালের পর থেকে রাজশাহী বিভাগে তথা ৮টি জেলার ছাত্রলীগ কর্মীরা রাবির এ গুরুত্বপূর্ণ পদ পেতে দেখা যায়। ২০১০ সালে এ পদগুলোর বণ্টন আরও সীমাবদ্ধ হয়ে রাজশাহী জেলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ হয়ে যায় এবং ২০১৩ সালের পর থেকে বর্তমান ছাত্রলীগের কমিটিতে যারা সভাপতি-সাধারণ সম্পাদক হয়েছেন তারা সকলেই বিশ্ববিদ্যালয়ের আশে পাশের এলাকার। সর্বশেষ ২০১৬ সালের ২৫ তম ছাত্রলীগের কমিটি রাজশাহী জেলা থেকে আরও সংকীর্ণ হয়ে রাজশাহী মহানগরে চলে আসে।
ছাত্রলীগের গুরুত্বপূর্ণ এ পদগুলো আরও সংকীর্ণ হয় কিনা এটা দেখার বিষয় এখন। তবে দিন দিনে এমন সংকীর্ণ হওয়ার পিছনের কারণ কি? এখানে কি স্থানীয়দের প্রভাব নিহিত রয়েছে নাকি অন্য কিছু প্রশ্ন সকলের?
এবছর ছাত্রলীগের শাখা সম্মেলনে স্থানীয় নাকি রাজশাহী বাহির থেকে নেতৃত্ব আসবে বিশ্ববিদ্যালয়ের সকলের চোখ এখন সেদিকে। সকলেই বলছেন যারা, যারা যোগ্য প্রার্থী, বিশ্ববিদ্যালয়কে সুন্দর ভাবে নেতৃত্ব দিবে তারাই যেন আসে এ শীর্ষ পদে।
রাজশাহীর বাহিরের পদপ্রত্যাশী নেতা কর্মীরা বলছেন, প্রথম বর্ষ থেকে রাজনীতি করেন তারা। আওয়ামী লীগ পরিবারের জন্মগ্রহণ করেও এবং এলাকায় ভালো প্রভাব থাকলেও স্থানীয় না হওয়ার কারণে সর্বাত্বক চেষ্টা করেও ছাত্রলীগের শীর্ষস্থানীয় পদ পেতে ব্যর্থ হোন তারা। অনেকেই তার কারণ হিসেবে বলছেন, ক্যাম্পাসে ভালো অবস্থান থাকলেও স্থানীয় এলাকায় তাদের প্রভাব নেই। স্থানীয় প্রভাব রয়েছে এমন কাউকে এই শীর্ষ পদগুলোতে রাখা হয়। তবে কি এবারেও এমনটা ঘটবে এ নিয়ে বহিরাগত পদপ্রত্যাশীদের রয়েছে সংশয়।
আগামী ১২ তারিখের রাবি ছাত্রলীগের সম্মেলনেও আলোচিত পদপ্রত্যাশীদের মধ্যে রাজশাহীর বুধপাড়া (ডন), মেহেরচন্ডি (লিংকন), ভদ্রা (রাজু, সাজ্জাদ ও গালিব), বিনোদপুর (বনি) ও কাটাখালি (মিশু) ৭ জন রয়েছেন। আর মহানগরের মতিহার থানা থেকে তরঙ্গ আর দূর্গাপু উপজেলা থেকে ইমতিয়াজ ২ জন মিলিয়ে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশে মোট ৯ জন ক্যান্ডিডেট আছে। এদের মধ্যে থেকেই নেতৃত্ব নির্বাচনের জোর প্রক্রিয়া চলছে। এই সম্মেলনে ৯৪ জন প্রার্থীর মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের আশেপাশের এলাকার স্থানীয় আরও অন্তত ৫ জন পদ প্রত্যাশী রয়েছেন।
রাবি শাখা ছাত্রলীগের সহ-সভাপতি মেজবাহুল ইসলাম বলেন, আমরা যারা ক্যাম্পাসে রাজনীতি করছি তাদের মূল বয়সের চেয়ে লিটন ভাইয়ের রাজনৈতিক বয়স অনেক বেশি।এছাড়া ছাত্রলীগের বর্তমান সভাপতি -সাধারণ সম্পাদক অত্যন্ত বিচক্ষণ এবং অর্ণা আপুও রাজনৈতিক ভাবে পরিপক্ব। তারা সকলেই সামনের নির্বাচনে যারা শিবির-ছাত্রদলের মারমুখী রাজনীতির বিপক্ষে যেই নেতৃত্ব বুদ্ধিদীপ্ততার সাথে ক্ষিপ্রতা নিয়ে তাদের প্রতিহত করবে এমনই নেতৃত্ব তারা আনবে বলে বিশ্বাস করি।এক্ষেত্রে আঞ্চলিকতা আনা উচিত নয় বলে মনে করি।
নাম বলতে অনিচ্ছুক স্থানীয় নয় এমন এক ছাত্রলীগ নেতা বলেন, স্থানীয়দের নিয়ে এভাবে ছাত্রলীগের কমিটি গঠনের ফলে সারাদেশ থেকে আসা অনেক ছাত্রলীগের কর্মী রাজনীতিতে অনাগ্রহী হয়ে উঠছে। সবার মুখে মুখে রাজশাহীর না হলে নেতা হওয়া যায় না। তাই ছাত্রলীগের এই শীর্ষ দুটি পদ এলাকা ভিত্তিক বিবেচনা না করে যোগ্যতার ভিত্তিতে সারা দেশে নেতৃত্ব সৃষ্টির জন্য বিবেচনা করা উচিত।
বিশ্ববিদ্যালয় আওয়ামীপন্থী শিক্ষরা বলছেন, স্থানীয় নেতাকর্মীরা তাদের ক্ষমতাবৃদ্ধির জন্য স্থানীয় পর্যায়ে নেতৃত্ব রাখার ব্যাপারে সোচ্চার থাকেন। স্থানীয় পর্যায়ের ছাত্রলীগের নেতাকর্মীকে এ শীর্ষ পদে রাখলে তাদের নির্বাচনী ভোট, সভা মিছিল সবকিছুতেই তাদের অগ্রাধিকার থাকে। এর পিছনের কারণ তারা বলছেন, একজন স্থানীয় পর্যায়েররাবি ছাত্রলীগ নেতা এলাকায় তার বেশ পরিচিত থাকে ও তার এলাকায় অনেক ভোট থাকে এবং নেতাদের ভোটের জন্য সক্রিয়ভাবে কাজ করতে পারেন। ফলে বহিরাগতদের থেকে তারা পদ পদবিতে এগিয়ে থাকে।
ক্রমান্বয়ে ছাত্রলীগের শীর্ষ দুই পদ এভাবে সংকীর্ণ হতে থাকলে রাজশাহীর বাহিরের নেতাকর্মীরা উৎসাহ হারিয়ে ফেলবেন। এমনটাই বলছেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. দুলাল চন্দ্র বিশ্বাস।
তিনি বলেন, সারাদেশে থেকে যারা নেতৃত্ব দিতে পারে তাদের সুযোগ পাওয়া উচিত বলে আমি মনে করি। যদি একাবেরেই সংকীর্ণ করে ফেলা হয় তাহলে অন্যারা তাতে উৎসাহ হারিয়ে ফেলবে। এখানে রাজশাহীর বাহিরের ছেলেরা যদি যোগ্য থাকে তাহলে সমতার ভিত্তিতে অবশ্যই তাদেরকে নেতৃত্ব দেওয়া উচিত। অর্থের বিনিময়ে না হয়ে যোগ্যদের হাতে এ পদগুলো তুলে দেওয়া। সামনে জাতীয় নির্বাচন এ মুহূর্তে যদি ভালো নেতৃত্ব না আসে এবং ছাত্রলীগ কর্মীদের মাঝে হতাশা কাজ করে তাহলে নির্বাচনে তার বড় একটা প্রভাব পড়তে পারে।
কমিটি নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রলীগ করে আসা নেতৃত্ব ও সামাজিক বিজ্ঞান অনুষদের ডীন অধ্যাপক ড. মো. ইলিয়াছ হোসেন জাগো বলেন, ছাত্রলীগের কমিটি এখন ছাত্রলীগের হাতে নেই এখন তা আওয়ামী লীগের হাতে। এখন আর যোগ্যতার ভিত্তিতে এখন আর পদ বন্টন করা হয়না। যার ফলে অনেকেই উৎসাহ হারিয়ে ফেলে। আমরা চাই যোগ্যতার ভিত্তিতে
দায়িত্বে আসুক। স্থানীয় নেতাকর্মীরা দায়িত্বে আসলে তারা অধিকাংশ সময় বাসায় কাটায় কিন্তু বাহির থেকে নেতৃত্ব আসলে তারা সবসময়ই হলে অবস্থান করে শিক্ষার্থীদের সকল বিষয়ে কনসার্ন থাকে। এসময় আসন্ন কমিটি নিয়ে তিনি উদ্যেগ প্রকাশ করেন।
বাংলাদেশ কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সাবেক সহ-সভাপতি, বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের বন-পরিবেশ বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য ও রাজশাহী জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য ডা: আনিকা ফারিহা জামান অর্ণা বলেন, ঢাবির পরেই রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রলীগের বড় একটা ইউনিট। নেতৃত্ব বাছাইয়ের ক্ষেত্রে আমাদের চাওয়া থাকে আদর্শিক রাজনীতি যারা করে সেটা হতে পারে রাজশাহীর বাহিরের পদপ্রত্যাশী অবশ্যই তাদেরকে সুযোগ দেওয়া হবে।
তিনি আরও বলেন, আমি নিজেও দেখেছি গত কমিটিগুলো কিছুটা সীমাবদ্ধতার মধ্যে চলে আসছে। যদি বাহিরের এমন কোনো ছেলে-মেয়ে থাকে যারা ছাত্রলীগকে আরও গতিশীল ও শক্তিশালী করতে পারবে তাহলে অবশ্যই তাদেরকে সুযোগ দেওয়া হবে। আমি আশাকরি কেন্দ্রীয় ছাত্রলীগের সভাপতি- সাধারণ সম্পাদক আছেন, বিচক্ষণ আওয়ামী লীগের নেতারা আছেন তারা অবশ্যই যৌক্তিক সিদ্ধান্ত নিবেন।
জাকারিয়া সোহাগ
ক্যাম্পাস ডেস্ক ।। বিডি টাইমস নিউজ




























