জাকারিয়া সোহাগ, রাবি প্রতিনিধি।।
‘সন্দেশ, সন্দেশ, সন্দেশ লিবেন সন্দেশ’ ! এই কথার সঙ্গে যেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের (রাবি) ক্যাম্পাসের প্রতিটি শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের এক গভীর সম্পর্ক। সকাল থেকে সন্ধ্যা, সন্ধ্যা থেকে রাত এমনই ধ্বনিতে মুখোরিত করে নিবারণ ঘোষ নামের একজন সন্দেশ বিক্রেতা। যিনি তাঁর জীবনের প্রায় ৫০টি বছর চষে বেড়িয়েছেন মতিহারের এই সবুজ চত্বরে।

জীবিকা নির্বাহের জন্য অন্য দশজনের মত প্রতিদিন ছুটতে হয় এই মানুষটিকেও। সাদা-মাটা জীবন, নেই কোনরূপ বিলাসিতা, উচ্চাকাঙ্ক্ষা বর্জিত জীবন যেন তার ‘নুন আনতে পানতা ফুরায়’ প্রবাদ বাক্যের মতোই সত্য। সকল দুঃখ-কষ্ট হাসিমুখে বরণ করার এক বিষ্ময়কর শক্তি নিয়েই যেন পৃথিবীতে নিরন্তর ছুটে চলা নিবারণের। প্রত্যহ সূর্য যখন তার লাল আভা ছাড়তে শুরু করে নিবারণ বেরিয়ে পড়েন পুরোনো কাশের তৈরি একটি ডিসে থরে থরে সাজানো ছানার সন্দেশ নিয়ে।

জীবন যুদ্ধে লড়াকু এই সন্দেশ বিক্রেতার সাথে আলাপ হয় বিডি টাইমস নিউজের
আলাপ কালে নিজের একান্ত সুখ-দুঃখের অব্যক্ত গল্পগুলো শুনালেন হাসি মুখে। ১৬’বছর বয়সেই বাবাকে হারান নিবারণ।পারিবারিক অসচ্ছলতার দায় ঘুচাতে বিদ্যা শেখার সুযোগ হয়নি তার। বাবার মৃত্যুর এক বছরের মাথাই বিধবা হয় বড় বোন।নি:সন্তান হওয়ায় বোনের ভরণ-পোষণের দায়িত্বও নিতে হয় তাকেই। পরিবারের এই নিষ্ঠুর অনটনের এক মহা দুশ্চিন্তায় পড়ে যায় নিবারণ। কাঁধেচাপা সংসারের হাল ধরতে পরিচিত এক চাচার পরামর্শে জীবিকা নির্বাহের পথ হিসেবে সন্দেশ বিক্রির ব্যবসাকেই বেছে নেন তিনি। ১৭ বছর বয়স থেকে এই ক্যাম্পাসে তিনি সন্দেশ বিক্রি করছেন। বয়সের কোঠা এখন সত্তরের ঘরে। ব্যবসা জীবনের এই সুদীর্ঘ সময়ে ক্যাম্পাসের প্রতিটি জায়গায় রয়েছে তাঁর পদচারণা।

নিবারণ বলছিলেন, প্রতিদিন তিনি প্রায় এক হাজার টাকার মতো সন্দেশ বিক্রি করেন। খরচা-পাতি বাদ দিয়ে দৈনন্দিন চার শত থেকে সাড়ে চারশত টাকা আয় হয়। এই সামান্য আয়ে ছেলের পড়াশোনা, মায়ের ঔষধ, বিধবা বোনসহ নিবারণের সংসার চলে।তবে দুধ, চিনি, ময়দা, তেলসহ নিত্য প্রয়োজনীয় দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে আগের সেই স্বাদে এখন সন্দেশ বানাতে হিমশিম খেতে হচ্ছে তাকে। যদিও বা স্বাদ আর মান ঠিক রাখতে যান তাহলে দাম ঠিক রাখা অনেকটাই কঠিন হয়ে পড়ে বলেন জানান এই সন্দেশ বিক্রেতা।

”সন্দেশ বিক্রির এই ৫০ বছরে খুব কমদিনই আমি দুপুরের খাবার খেয়েছি। সিঙ্গারা, পুরি আর চা আমার প্রতিদিনের দুপুরের খাবার।” জীবনের কঠিন বাস্তবতার কথাগুলো খুব সহজেই হাসিমুখে এভাবেই বলে ফেললেন তিনি। তার এই সন্দেশের আলাদা একটা কদর রয়েছে ক্যাপাসের প্রতিটি শিক্ষার্থীর কাছে। ক্যাম্পাস জীবনে এই সন্দেশ স্বাদ নেয়নি এমন শিক্ষার্থী কমই পাওয়া যাবে। তবে নিবারণের নিষ্পাপ মুখ আর ব্যবহার দেখেও অনেক কিনে নেন তার ছানার এই সন্দেশ। এমনি একজন শিক্ষার্থীর সাথে কথা হয় বিশ্ববিদ্যালয় পশ্চিমপাড়া এলাকায়। ওই শিক্ষার্থীর নাম ওয়ালিদা ইয়াসমিন। তিনি তাপসী রাবেয়া হলের আবাসিক শিক্ষার্থী। তিনি বলেন, ক্যাম্পাসে আসার পর থেকেই উনার সন্দেশ, সন্দেশ হাঁকছাড়া ডাক শুনে আসছি। ক্যাম্পাসের এমন কোনো জায়গা আর এমন কেউ নেই যে উনার এই ডাকের সাথে পরিচিত না। হাতের মুঠোয় ভার সাজিয়ে পায়ে হেঁটে বিরতিহীন ছুটে চলা দেখে অনেকেই তাঁর ক্লান্ত-শ্রান্ত চোখের চাহনির দিকে চেয়ে ইচ্ছা না হলেও অন্তত একটা সন্দেশ কেনার চেষ্টা করেন। আমিও নিজেও মাঝে মধ্যেই কাজটা করি। বড্ড মায়া হয় দেখে, হালাল রিজিকের জন্য মানুষ এখনো কতটা পরিশ্রম করতে পারে।

সত্তরোর্ধ্ব এই মানুষটির কাজে প্রতি ভালোবাসা ও পরিশ্রম প্রিয়তাকে অনেক শিক্ষার্থী আবার শ্রদ্ধা করার পাশাপাশি দেখছেন অনুকরণীয় আদর্শ হিসেবেও। এমনই কথা বলছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় আইন বিভাগের শিক্ষার্থী তারিকুল ইসলাম তৌফিক। এই শিক্ষার্থী বলেন, তিনি ক্যাম্পাসে এতটাই পরিচিত যে সন্দেশ শব্দটা কানে বাজলেই বুঝি নিবারণ মামা চলে আসছেন। দীর্ঘ সময়ের পদচারণায় ও একই সুরের ডাকের সাথে মিশে গেছে তার নাম। অত্যন্ত নম্র-ভদ্র একজন মানুষ তিনি। তার এই দীর্ঘ জীবন থেকে আমাদের অনেক কিছুই শেখার রয়েছে। প্রথমত নিজ কাজের প্রতি ভালোবাসা ও ভালোলাগা। সেটা যতই ছোট হোক না কেন। দ্বিতীয়ত, বৈধভাবে অল্প উপার্জনেও সন্তুষ্ট থাকার মানসিকতা। তৃতীয়ত, এই বয়সেও তার ত্যাগ ও কষ্ট স্বীকার করার যে প্রবণতা সেটা আলসেমি ছাড়তে উৎসাহী করে। সবশেষে তার স্বপ্নমুখর জীবন আমাদেরকে আরো স্বাপ্নিক হতে অনুপ্রেরণা দেয়।

ভবিষ্যতের কথা জানতে চাইলে এই সন্দেশ বিক্রেতা বলেন, জীবনের বাকী সময়টুকু এভাবেই পার করতে পারলেই হই। পেশা পরিবর্তনের আগ্রহ নেই। তবে একমাত্র ছেলেকে মানুষ করাই এখন তার প্রধান লক্ষ্য। তিনি তার ছেলেকে এই চির পরিচিত ক্যাম্পাসের ছাত্র হিসেবে দেখতে স্বপ্ন বুনেছেন। এইরকম হাজারো নিবারণ ঘোষের দেখা মেলে আমাদের চারপাশে। যাঁদের দেখে অজান্তেই পুলোকিত হয় হৃদয়। অভাব আর দারিদ্র যাদের পিছু ছাড়েনা কিছুতেই। তবুও বেঁচে থাকার তাগিদে আত্মনির্ভরতা আর কাজের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে নিরন্তর ছুটে চলা তাঁদেরকে নিত্য নতুন স্বপ্ন দেখায়। ভালো থাকুক নিবারণ ঘোষের মতো শত শত জীবন যুদ্ধে লড়াকু সৈনিকরা।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে