বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) চেয়ারম্যান তারেক রহমান প্রায় দুই দশকের নির্বাসন শেষে দেশে ফিরেছেন। আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে জয়ী হলে তিনি প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন। এর মধ্য দিয়ে তিনি তার বাবা–মায়ের মতোই দেশের নেতৃত্বে আসতে পারেন বলে জানিয়েছে বার্তা সংস্থা রয়টার্স।

মঙ্গলবার (১০ ফেব্রুয়ারি) রয়টার্স তাদের ওয়েবসাইটে এ–সংক্রান্ত একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করে।রয়টার্সে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির বাংলা অনুবাদ তুলে ধরা হলো।

লন্ডনে প্রায় দুই দশকের স্বেচ্ছা নির্বাসন শেষে দেশে ফেরার দুই মাসেরও কম সময়ের মধ্যে বাংলাদেশের ইতিহাসের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি নির্বাচনে জয়ী হয়ে প্রধানমন্ত্রী হতে পারেন তারেক রহমান। এর মধ্য দিয়ে তিনি তার বাবা-মায়ের মতোই দেশের নেতৃত্বে আসতে পারেন।

জনমত জরিপের পূর্বাভাস সঠিক হলে, বৃহস্পতিবারের নির্বাচনটি ৬০ বছর বয়সী নীরবভাষী এই নেতার জন্য হবে এক বিস্ময়কর প্রত্যাবর্তনের গল্প। ২০০৮ সালে সামরিক-সমর্থিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দুর্নীতিবিরোধী অভিযানে আটক হওয়ার পর মুক্তি পেয়ে চিকিৎসার জন্য তিনি দেশ ছাড়েন।

গত বছরের বড়দিনে তিনি দেশে ফেরেন এক অভূতপূর্ব সংবর্ধনার মধ্য দিয়ে। এর কয়েক মাস আগেই, ২০২৪ সালের আগস্টে ছাত্র-যুব নেতৃত্বাধীন গণঅভ্যুত্থানে তার দল বিএনপির চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী, দীর্ঘদিনের প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ক্ষমতাচ্যুত হন।

বর্তমানে শেখ হাসিনা ভারতের নয়াদিল্লিতে নির্বাসনে রয়েছেন। একসময় বাংলাদেশের রাজনীতিতে শেখ হাসিনা ও তারেক রহমানের মা সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন প্রভাব বিস্তার করেন। আর তারেক রহমানের বাবা জিয়াউর রহমান ছিলেন বাংলাদেশের স্বাধীনতার অন্যতম নেতা, যিনি ১৯৭৭ থেকে ১৯৮১ সাল পর্যন্ত দেশ শাসন করেন, পরে নিহত হন।

তারেক রহমান বলেছেন, তিনি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক নতুনভাবে ভারসাম্যপূর্ণ করতে চান, যাতে কোনো একক শক্তির ওপর অতিরিক্ত নির্ভর না করে বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণ করা যায়। এটি শেখ হাসিনার নীতির বিপরীত, যিনি নয়াদিল্লির ঘনিষ্ঠ বলে বিবেচিত ছিলেন।

তিনি আরও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেনঃ
১।দরিদ্র পরিবারগুলোর জন্য আর্থিক সহায়তা বাড়ানো। ২।খেলনা ও চামড়াসহ অন্যান্য শিল্প খাতের উন্নয়নের মাধ্যমে তৈরি পোশাক রপ্তানির ওপর নির্ভরতা কমানো। ৩।প্রধানমন্ত্রীর জন্য দুই মেয়াদে সর্বোচ্চ ১০ বছরের সীমা নির্ধারণ, যাতে কর্তৃত্ববাদী প্রবণতা রোধ করা যায়।

ঢাকায় অবতরণের পর থেকে ঘটনাপ্রবাহ এত দ্রুত ঘটেছে যে, নিজের জন্য ভাবার সময়ই পাননি বলে জানান তারেক রহমান।রয়টার্সকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারের ফাঁকে তিনি বলেন, “আমরা ঢাকায় নামার পর প্রতিটি মিনিট কীভাবে কেটেছে, আমি নিজেও বুঝতে পারছি না।”সাক্ষাৎকারের সময় তার পাশে ছিলেন তার মেয়ে জাইমা, যিনি বাবার পক্ষে জনসমর্থন আদায়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখছেন।

ভাবমূর্তি বদলের চেষ্টাঃ চশমাধারী তারেক রহমানের জন্ম ১৯৬৫ সালের ২০ নভেম্বর, ঢাকায়। তিনি খালেদা জিয়া ও সাবেক রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের সন্তান। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করলেও তা শেষ করেননি। পরে তিনি বস্ত্র ও কৃষিপণ্য খাতে ব্যবসা শুরু করেন।

দেশে ফেরার পর থেকে তিনি নিজেকে এমন একজন রাষ্ট্রনায়ক হিসেবে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন, যিনি শেখ হাসিনার শাসনামলে পরিবারের ওপর ঘটে যাওয়া ঘটনার বাইরে গিয়ে ভবিষ্যতের দিকে তাকাতে চান।তিনি বলেন, “প্রতিশোধ থেকে কী আসে? প্রতিশোধের কারণে মানুষ দেশ ছাড়তে বাধ্য হয়। এতে ভালো কিছু আসে না। এই মুহূর্তে আমাদের দেশের প্রয়োজন শান্তি ও স্থিতিশীলতা।”

শেখ হাসিনার শাসনামলে তারেক রহমান দুর্নীতির একাধিক মামলায় অভিযুক্ত হন এবং অনুপস্থিতিতেই দণ্ডিত হন। ২০১৮ সালে ২০০৪ সালের গ্রেনেড হামলা মামলায় তাকে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেওয়া হয়—যে হামলায় শেখ হাসিনার সমাবেশে বহু মানুষ নিহত ও আহত হন।তবে তিনি সব অভিযোগকে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে দাবি করেন। শেখ হাসিনার পতনের পর তিনি সব মামলায় খালাস পান।লন্ডনে অবস্থানকালে তিনি দেখেছেন, কীভাবে একের পর এক নির্বাচনে বিএনপি কোণঠাসা হয়ে পড়েছে—শীর্ষ নেতারা কারাবন্দী হয়েছেন, কর্মীরা নিখোঁজ হয়েছেন, দলীয় কার্যালয় বন্ধ হয়ে গেছে।

দেশে ফেরার পর তারেক রহমান অনেক বেশি সংযত ও শান্ত ভাষা ব্যবহার করছেন। উসকানিমূলক বক্তব্য এড়িয়ে তিনি সংযম ও জাতীয় ঐক্যের আহ্বান জানাচ্ছেন। তিনি “রাষ্ট্রের ওপর জনগণের মালিকানা ফিরিয়ে দেওয়া” এবং প্রতিষ্ঠান পুনর্গঠনের কথা বলছেন—যা নতুন করে বিএনপি সমর্থকদের উদ্দীপ্ত করেছে।তার ভাবমূর্তি নরম করতে ভূমিকা রেখেছে পরিবারের পোষা সাইবেরিয়ান বিড়াল ‘জেবু’, যা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভাইরাল হয়েছে।

রয়টার্স
বঙ্গানুবাদঃ একুশে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে