সংগীত মানুষের মনন তৈরী করে, সংগীত আমাদের সংস্কৃবান বানায়, সংগীত নিজেকে সুশীল, সৃজনশীল ভাবে তৈরি করতে বড় এক ভূমিকা রাখে। সংস্কৃবান, সুশীল, সৃজনশীল এই কথাগুলি বোধহয় আজ আমরা ডিজিটালাইজেশনের ঘোড়দৌড়ে ক্রমশ জীবনের অভিধান থেকে ফেলে দেয়ার প্রতিযোগিতায় নেমেছি। আজ একজন তেমনি সংস্কৃবান, সুশীল, সৃজনশীল শিল্পীর জীবনের গল্প বলতে গিয়ে ভূমিকাতেই বাক্যগুলি বলতে ইচ্ছা হলো।
আমাদের বাংলাদেশের সংগীত জগতের তেমনই একজন প্রবীনতম উজ্জল নক্ষত্র, লোকসংগীতের অত্যন্ত শ্রদ্ধার একটি নাম সুনামগঞ্জের সন্তান একুশে পদকে ভূষীত শিল্পী সুষমা দাশ। পিতা রসিকলাল দাশ এবং মা দিব্যময়ী দাশ। সুনামগঞ্জ জেলার দিরাই থানার পৈরুয়া গ্রামের এক সাংস্কৃতিক পরিবারে ১৯৩০ সালে জন্মগ্রহন করেন শ্রদ্ধেয়া এই শিল্পী সুষমা দাশ। বাবা রসিকলাল দাশ মা দিব্যময়ী দাশ দুজনেই ছিলেন লোকসংগীতের জনপ্রিয় শিল্পী এবং সুপ্রসিদ্ধ পদরচয়িতা এবং সুরকার।
আমাদের লোকসংগীতের ইতিহাসে যাঁদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রাধারমণ দত্ত ছিলেন তাঁর সংগীতের ভাবগুরু। পারিবারিক সাংগীতিক আবহাওয়ায় বেড়ে ওঠা সুষমা আজ একুশে পদকে ভূষীত বাংলাদেশের বরেণ্য শিল্পী এবং একজন সংগীত সাধক। সংগীত তাঁর ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা। ১৯৩০ থেকে ২০২০ সাল, তাঁর ছেলেবেলাটুকু বাদ দিলেও আশি বছরের জীবন প্রবাহে আজও তিনি সু-নীপুন ভাবে সংগীতের প্রতি শ্রদ্ধা নিয়ে, র্নিমোহ চিত্তে¡ শ্রোতাদের দান করে যাচ্ছেন তিনি তাঁর তাঁর কণ্ঠের মাধুর্য যা তিনি ধারণ করেছিলেন বাবা রসিকলাল দাস, মা দিব্যময়ী দাশ সাহচর্যে এবং ভাবগুরু রাধারমণ দত্তের সুরের মহিমায়। পিতা রসিকলাল দাশ ছিলেন রুচিবান একজন সংগীতের সাধক তাঁর সাথে শিল্পী সুষমা দাশের বাড়িতে তাঁর ছেলেবেলায় গানের আড্ডা জমে উঠতো, বাউল শাহ্ আবদুল করিম, আলী হোসেন, কামাল পাশা, কানাইলাল, সুখলাল এমন সব লোকসংগীত জগতের কিংবদন্তি মানুষদের নিয়ে। গান রচনা, সুরের প্রয়োগ এবং সেটা উপস্থাপনা এটাই ছিলো তাঁদের উদ্দেশ্য।
আজ স্বাধীন বাংলাদেশে শুধু নয় যে সুর আর গান আপন মহিমায় ছড়িয়ে আছে বিশ্বব্যাপী শিল্পী আর মানুষের কাছে। ছোট ভাই বাংলাদেশের সুপরিচিত, শ্রদ্ধেয় এবং তিনিও একুশে পদকে ভূষীত সংগীত সাধক প্রয়াত শিল্পী রাকানাই দাশ। লোকসংগীত জগতের অত্যন্ত শ্রদ্ধার শিল্পী, সাধক একুশে পদক প্রাপ্ত সুষমা দাশ আজ তাঁর বর্ণাঢ্য ছেলেবেলার কথাগুলি জানালেন চখের জলে! আমরা কি এতটাই দুর্ভাগা! আমরা কি এতটাই হৃদয়হীন? এই আমাদের জন্যই কি বাংলাদেশকে বিশ্বমানচিত্রে স্বাধীন করে লাল-সবুজের পতাকা এনে দিয়েছিলেন জাতির পিতা এই আমাদের জন্যই কি বুকের শেষ রক্তবিন্দু পর্যন্ত দান করে গেছেন হাসিমুখে ! লজ্জা, হায় লজ্জা আর কতদিন চলতে হবে আমাদের লজ্জাবনত দৃষ্টি নিয়ে ? আমরা কি মাথা উঁচু করে আর কখনোই দাাঁড়াতে জানবোনা..!
কবি গুরুর প্রতি পিতার ছিলো অগাধ বিশ্বাস। কবি গুরুর সেই আশিতম জন্মদিনের বিশ্বাসের শেষ বাণী দিয়ে শেষ করতে চাই আজকের কথা, -“অপেক্ষা করে থাকব সভ্যতার দৈববাণী সে নিয়ে আসবে, মানুষের চরম আশ্বাসের কথা মানুষকে এসে শোনাবে এই পূর্বদিগন্ত থেকেই। আজ পারের দিকে যাত্রা করেছি পিছনের ঘাটে কী দেখে এলুম, কী রেখে এলুম, ইতিহাসের কী অকিঞ্চিৎকর উচ্ছিষ্ট সভ্যতাভিমানের পরির্কীণ ভগ্নস্তুপ ! কিন্তু, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারানো পাপ, সে বিশ্বাস শেষ পর্যন্ত রক্ষা করব। আশা করব, মহাপ্রলয়ের পরে বৈরাগ্যের মেঘমুক্ত আকাশে ইতিহাসের একটি র্নিমল আত্মপ্রকাশ হয়তো আরম্ভ হবে এই পূর্বাচলের সূর্যোদয়ের দিগন্ত থেকে। আর-এক দিন অপরাজিত মানুষ নিজের জয়যাত্রার অভিযানে সকল বাধা অতিক্রম করে অগ্রসর হবে তার মহৎ মর্যাদা ফিরে পাবার পথে।”

লেখকঃ ড. খন্দকার তাজমি নূর
নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ














