ডেটলাইন কলাপাড়া, ভ্রাম্যমান প্রতিনিধি।। জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের ঘনি্ষ্ঠ সহচর কলাপাড়ার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুরেন্দ্র মোহন চৌধুরির স্মরণে স্থাপিত কলাপাড়া ভূমি অফিস সংলগ্ন পথের নামফলক ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিয়েছে কতিপয় দুস্কৃতিকারীরা। পটুয়াখালী জেলাধীন কলাপাড়া(খেপুপাড়া) উপজেলা শহরের প্রাণকেন্দ্রে সম্প্রতি স্বাধীনতা বিরোধীরা অত্যন্ত সুপরিকল্পিত ভাবে তাঁর নামের সড়কের ‘স্মৃতি্ফলক’ ভেঙ্গে ফেলেছে। অথচ কলাপাড়া থেকে সামান্য দূরত্বে থানা পুলিশের নাকের ডগায় এই ঘটনাটি ঘটলেও এখন পর্যন্ত কাউকেই গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ, নির্বিকার রয়েছে উপজেলা প্রশাসনও, যেন তাদের কিছুই করার নেই? এই প্রতিনিধিকে ঠিক এমনটাই বলেছেন কলাপাড়া থানা কর্তৃপক্ষ।

সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয়, বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণীত হয়ে মুক্তিয়ুদ্ধ পূর্বকালীন যে দলটিকে এলাকায় দীর্ঘকাল যিনি নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তিনিই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরী। সেই দলটির বর্তমান বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের উপজালা শাখা(তৎকালিন থানা আওয়ামীলীগ)-এর বর্তমান কর্মী, নেতৃবৃন্দ বা দলের ভোটে নির্বাচিত গণপ্রতিনিধিবর্গ বলতে যারা তাঁদের পক্ষ থেকেও এব্যাপারে জোড়ালো কোন প্রতিবাদ করা হয়নি। যাঁর আত্মত্যগের বিনিময়ে তৈরি আজকের উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কম্যান্ড, তারাও এর বিরুদ্ধে কোন পদক্ষেপ গ্রহণ করেনি। স্থানীয়ভাবে প্রগতিশীল বলে দাবীদার প্রগতি মনষ্করাও ঠায় নিরব নির্বিকার।

কিন্তু এলাকার সাধারণ, সচেতন নাগরিকরা এদের বিরুদ্ধে ধিক্কার জানিয়ে বলেছেন, যাঁদের আত্মত্যগের বিনিময়ে আমরা আজ স্বাধীনতা পেয়েছি তাঁদের স্মৃতিস্মরণে রাখার উদ্দেশ্যে সরকারি সিদ্ধান্তে সেখানকার একটি সড়ক তাঁর নামে উৎস্বর্গ করে নামকরণ করা হয় শহীদ সুরেন্দ্র মোহন চৌধূরী সড়ক। লাগানো হয় দু’টি স্মারক ‘নাম ফলক’, একজন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সেই স্মারক স্মৃতি গুলো কি ভেঙ্গে গুঁড়িয়ে দিতে হবে? কেন এই মানসিকতা? অবিলম্বে এই দুস্কৃতিকারীদের ধরে বিচারের আওতায় সোপর্দ করার দাবী জানিয়েছেন এলাকার সুশীল সমাজ।

শহীদ সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরী একদা চট্রলা(বর্তমানে চট্রগ্রম)-এর বাসিন্দা ছিলেন। ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সেনানী ছিলেন। বাল্যকাল থেকে কৈশোরে পা রেখে ছিলেন যখন, তখন থেকেই তাঁর দু’চোখ জুড়ে ছিল স্বাধীনতার স্বপ্ন। সেই সময় থেকেই মাস্টারদা সুর্যসেনের সাথে তিনি ব্রিটিশ বিরোধী আন্দোলনের একজন সহযোগী ছিলেন। অস্ত্রাগার লুন্ঠনের পরে ব্রিটিশ সরকারের ব্যাপক ধরপাকর শুরু হলে আত্মগোপন করতে তিনি পটুয়াখালীর দক্ষিনাঞ্চলের ‘মগঅধ্যূষিত’ এলাকা কলাপাড়ায় চলে আসেন, সেই থেকে পরিবার পরিজন নিয়ে স্থায়ীভাবে বসবাস শুরু করেন কলাপাড়াস্থ পুরান বাজার এলাকায়।

পরবর্তীতে তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের সাথে দেখা করেন এবং তাঁর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে আওয়ামীলীগে যোগদান করেন। অল্পকালের মধ্যেই তিনি একজন দক্ষ সাংগঠক হিসেবে বঙ্গবন্ধুর নজরে আসেন এবং খুব কম সময়ের মধ্যে বঙ্গবন্ধুর প্রিয়ভাজনে পরিণত হন। এমনকি যখন তখন বঙ্গবন্ধু তাঁকে রাজনৈতিক কাজের জন্য ঢাকায় ডেকে পাঠাতেন। বঙ্গবন্ধু যতবারই কলাপাড়ায় সাংগঠনিক সফরে আসতেন ততবারই সুরেন্দ্র মোহন চৌধুরীর বাড়িতে পরিবারের সাথে দেখা না করে ফিরতেন না, সুরেন্দ্র মোহন চৌধূরীর প্রতি বঙ্গবন্ধুর এমনই ভালোবাসা ছিল। বলেছেন এলাকার লোকজন।

উল্লেখ, সুরেন্দ্র মোহন চৌধূরী সড়কের স্মৃতিচিহৃগুলো এমন সময় ভাঙ্গা হলো যখন জাতি বাংলাদেশর স্থপতি হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালী জাতিরজনক বঙ্গবন্ধু শেখমুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকী ও বাংলাদেশের স্বাধীনতার ৫০’বছরপূর্তি অনুষ্ঠান পালন করছে, স্বাধীনতার বিরোধীরা ঠিক এই সময়টাকেই বেঁছে নিয়েছে কেন বলার অপেক্ষা রাখেনা?

ছবিঃ কলাপাড়ার শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরি
একজন শহীদ মুক্তিঝোদ্ধা যিনি দেশের প্রতি অকুন্ঠ দায়িত্ববোধ আর স্বাধীনতার জন্য সন্মুখ সমরে জীবন দিয়ে প্রমাণ করে গেছেন, দিয়ে গেছেন দেশের প্রতি ভালোবাসার প্রতিদান। যাঁর আত্মত্যগের বিনিময়ে জাতি স্বাধীনতা লাভ করেছে, সেই বীর শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুরেন্দ্র মোহন চৌধূরীর প্রতি জাতির কি কোন দায়বদ্ধতা নেই? নেই বলেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুরেন্দ্র মোহন চৌধূরির স্মৃতিচিহৃ আজ কতিপয় দানবদের পদাঘাতে বিদীর্ণ, ক্ষত-বিক্ষত।

মুক্তিযুদ্ধে তাঁর আত্নত্যাগের জন্য জাতির কি কোন দায়বদ্ধতা নেই? আরও আবাক করার মতো তথ্য দিয়েছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধা সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরির সন্তান ও প্রজন্ম ৭১-এর সাধারণ সম্পাদসক (মুক্তিযুদ্ধে শহীদ সন্তানদের সংগঠন) সন্তান সলিল চৌধূরি, জানিয়েছেন তার বাবা একজন শহিদ মুক্তযোদ্ধা কিন্তু বিগত ৫০’বছরেও শহীদ পরিবার হিসেবে সরকারি অনুকূল্যে একটি ‘কানাকড়ি’-ও পায়নি তারা!

মুক্তিযোদ্ধা সংসদ, মুক্তযোদ্ধা কল্যান ট্রাস্ট, সংশ্লিষ্ট মন্ত্রনালয় ছাড়াও স্থানীয় পর্যায়ে বছরের পর বছর ঘুরেও কর্তব্যক্তিদের কাছ থেকে আজ অব্দি ‘সরকারি ভাবে প্রাপ্য” কোন সাহায্যই পায়নি পরিবারটি। পেয়েছে শুধু হচ্ছে-হবে, দেখবো-দেখছি ইত্যাদি আশ্বাস। গত পঞ্চাশ বছরে এই শহীদ পরিবারটিকে কতটা ভয়াবহ দূ:খ-দুর্দাশা আর নিদারুণ অর্থকষ্টের মধ্যে দিন-মাস, বছরের পর বছর কাটাতে হয়েছে তার কোন শুমার নেই। কান্নাজড়িত কন্ঠে এই কথাগুলো বলেছেন শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সন্তান সলিল চৌধূরী। সলিল চৌধূরী আরও বলেছেন ”জাতির কাছে আমার একটাই প্রশ্ন, একটি শহীদ পরিবারকে কেন ঘুষের বিনিময়ে সুবিধা পেতে হবে? শুধু একটি করণেই আমাদের সমস্ত সরকারী সুবিধা থেকে বঞ্চিত করা হয়েছে, দেশের জন্য আমার বাবার মহান আত্মত্যগের কি কোনই দায়বদ্ধতা নেই’ দেশে ও জাতির কাছে? যিনি নিজের জীবন বিলিয়ে দিয়েছেন বাংলার স্বাধীনতার জন্য, সেই আত্মবলিদানে তাঁকেই আজ আঘাতে আঘাতে বিদীর্ণি আর ক্ষত-বিক্ষত হতে হয়। পদাঘাতে ভু-লুন্ঠিত হতে হয় তাঁর স্মৃতিময়-স্মৃতিফলক-ও।

ছবিঃ মুক্তিযোদ্ধা সুরেন্দ্রমোহন চৌধুরি’র সন্তান সলিল চৌধুরী
এ ব্যাপারে শহীদ সন্তান সলিল চৌধুরী জানান ”আমি মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর সাথে দেখা করার জন্য অনেক চে্ষ্টা করেছিলাম কিন্তু আমলাতান্ত্রিক জটিলতা আর রাজনেতিক চাটুকারদের অসহিষনুতার কারণে ব্যর্থ হয়েছি বার বার, দেখা করতে পারিনি”। তাই প্রধনমন্ত্রী শেখ হাসিনার নিকট সলিল চৌধূরীর একটিই ফরিয়াদ, ”মাননীয় প্রধানমন্ত্রী আপনার পিতার আমার বাবাকে অত্যান্ত স্নেহ করতেন, ভালোবাসতেন। বঙ্গবন্ধু সাংগঠনিক কাজে যখনই কলাপাড়ায় যেতেন আমাদের বাড়িতে আমার বাবার সাথে, পরিবারের সাথে দেখা না করে ফিরতেন না, সেই শহীদ মুক্তিযোদ্ধা পরিবারের সন্তান হিসেবে আমরা আজ পর্যন্ত কোনও রাষ্ট্রীয় সুবিধা পাইনি, কিন্তু কেন জানিনা”?

মুক্তিযুদ্ধের সনদ

নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে