মেহেরপুর প্রতিনিধিঃ পৃথিবীতে মানবের জন্ম মৃত্যুর অমোঘ নিয়মের মধ্যদিয়ে বয়ে চলেছে মানব সমাজ। সমাজে জন্ম নেয়া মানুষের মধ্যে কিছু মানুষ ব্যতিক্রমি কর্মকান্ড দ্বারা স্মরণীয় হয়ে থাকেন। তাঁরা এ কর্মভূমিতে কর্মযোগী হিসেবে পরিচিতি পেয়ে থাকে। আর কর্মই হয়ে যায় তাদের কর্মফল।

এসব মণীষিদের সমাজের মানুষ স্মরণ করে রাখে। জন্মেনজয় মজুমদার ওরফে নাফা সাধু তাদেরই একজন। তিনি মেহেরপুর সদর থানার টুঙ্গিগ্রামে মধ্যবিত্ত এক হিন্দু পরিবারে ১৯১১ সালে জন্মগ্রহন করেন। তার পিতা সুরেন্দ্রনাথ মজুমদার। জানা যায়, তিনি এন্ট্রাস পর্যন্ত লেখাপড়া করেছিলেন। তিনি অত্র এলাকায় ফুটবল খেলায় ভাল গোলকীপার হিসেবে সুনাম অর্জন করেছিলেন। এই খেলায় লাফিয়ে লাফিয়ে বল ধরার কারণে এলাকার মানুষের কাছে তিনি নাফা নামে পরিচিত হয়েছিলেন। সে সময় তার দল যাদুখালি খেলার মাঠে ফুটবল খেলায় কয়েকবার ইংরেজ ফুটবল টিমকে হারিয়ে দিয়েছে বলে স্থানীয়রা জানায়। এরপর তিনি বৈবাহিক জীবনে এক কন্যসন্তানের জনক হন। সংসার জীবনের কোন এক সময় দাম্পত্য কলহের কারণে তিনি বৈরাগ্যে জীবন বেচে নেন। এরই ধারবাহিকতায় তিনি পিরোজপুরের বাঘতলার জঙ্গলের নির্জনে নিভৃতে ৪ বছরের কঠোর কৃচ্ছসাধনে দিব্যজ্ঞান লাভ করেন।
আধ্যাত্মিক জ্ঞান লাভের পরে নিজগৃহে না ফিরে তিনি দাদপুর ভৈরব মোহনার তীরে যাদুখালীর সোনাপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বারান্দায় অবস্থান করেছিলেন। গড়ে ওঠা ভক্তকূল নিয়ে একেশ্বরবাদী ধর্ম পালন করতেন তিনি। মেহেরপুর চুয়াডায়সহ দেশের বিভিন্ন স্থানে এ আধ্যাত্মিক পুরুষের অসংখ্য অনুসারী রয়েছে। তিনি প্রচার করতেন “আমার আমিত্ব কীর্তি গৌরব যা কিছু বৈভব সকলই রহিল তোমারই স্মরণে।”
এদেশের স্বাধীনতা যুদ্ধের আগে অত্র এলাকার বিভিন্ন শিক্ষাঙ্গন ভবনের দেয়ালে দেয়ালে তিনি তীরধনুক বল্লম রাইফেলসহ নানা ধরণের আগ্নেয়াস্ত্রের ছবি আঁকতেন এবং প্রচার করতেন “ হাতে নাও ঢাল সমন আসিতেছে”।
একাকীত্ব জীবনে তিনি কখনো অনাহারে থাকেননি। এলাকার মানুষ ধর্ম বর্ণের সীমা পেরিয়ে এই সাধুর জন্য রান্না করে খাবার পৌঁছে দিয়েছেন তার আস্তানায়। তিনিও ভক্তদের নিরাশ করেন নাই। পরমানন্দে এসব অন্নে তিনি উদরপূর্তি করেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পূর্বে স্ত্রী ও একমাত্র কন্যা ভারতে চলে যান। সেখানে কন্যা জীবিত থাকলেও তার স্ত্রীর সন্ধান পাওয়া যায়নি। গত শতাব্দির আশির দশকের প্রথমভাগে তার অনুজ বলাই মজুমদার পৈত্রিক সম্পদ বিক্রি করে পশ্চিমবঙ্গের মালিয়াপোতায় বসতি স্থাপন করেছেন। দিব্যজ্ঞান লাভের পর থেকে আমৃত্যু এ সাধুপুরুষ অনুসারিদের নিয়ে যাদুখালীতেই পরম নিষ্ঠার সাথে সাধনকর্ম অব্যাহত রেখেছিলেন। ১৯৯৩ সালের ২১ ডিসেম্বর জন্মেনজয় মজুমদার ওরফে নাফা সাধু নির্বান লাভ করেন।এলাকাবাসী যাদুখালী বিদ্যালয় প্রাঙ্গনে এ সাধুপুরুষকে সমাধিস্থ করে।
পিরোজপুর গ্রামের স্কুল শিক্ষক আব্দুস সালাম ও টুঙ্গীর শরীফের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় ১৯৯৪ সালে সরকারি বরাদ্দ আর স্থানীয়দের অনুদানে এ সাধুপুরুষের সমাধিসৌধ নির্মাণ করা হয়। অদ্যবদি প্রতিবছরের বাংলা ৭ পৌষ নাফা সাধুর মৃত্যুদিবসে বাৎসরিক ওরশ অনুষ্ঠিত হয়ে আসছে। বাৎসরিক এ ওরশে কমিটিকে সরকারি অনুদান দেয়া হয়। ওরশে সকল ধর্মের মানুষের উপস্থিতি লক্ষ্য করা যায়।এ উপলক্ষে দু’দিন ব্যাপি মেলার আয়োজন করে সমাধি কমিটি।
এসময় সেখানে পিরোজপুর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আব্দুস সালাম, পিরোজপুর ইউপি প্যানেল ওহিদুর রহমান ডাবলু,লাফা সামাধি কমিটির সভাপতি তৌহিদ হোসেন মাস্টার, সহ-সভাপতি আইয়ুব আলী, সাধারণ সম্পাদক আব্দুস সাত্তার, কোষাধক্ষ্য গাজিউর রহমান, সাধক মহিউদ্দিন ফকির হাফেজ মাস্টার আব্দুস সালাম সহ হাজারো ভক্তরা উপস্থিত ছিলেন। এ মেলায় ১০ সহস্রাধিক লোকের সমাগম হয়ে থাকে। এসময় মেলায় প্রচুর গৃহস্থলিপণ্য ও বিনোদনমূলক সামগ্রী কেনাবেচা হয়ে থাকে।
মাসুদ রানা
নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ














