
দলের প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী উপলক্ষে গত ১’লা জানুয়ারি আয়োজিত সমাবেশে একমঞ্চে দেখা যায় জাতীয় পার্টির প্রধান পৃষ্ঠপোষক রওশন এরশাদ ও দলটির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরকে। প্রধান অতিথির বক্তব্যে সেদিন বিরোধীদলীয় নেতা স্পষ্ট ঘোষণা দেন দলে কোনো বিরোধ না থাকার। এরই ধারাবাহিকতায় মিলেমিশে পার্টি পরিচালনার ডাক দেন সাবেক রাষ্ট্রপতি এরশাদের স্ত্রী। এই বক্তব্যের মধ্য দিয়ে নেতাকর্মীরা আশায় বুক বেঁধেছিলেন, হয়তো দলের শীর্ষ নেতৃত্বে বিরোধ মিটতে যাচ্ছে। সবাই একসঙ্গে দলের শক্তি বাড়াতে পথে নামবেন। বাস্তবে সেই পরিস্থিতির উন্নতি হয়নি। এর মধ্যে গত ৯ জানুয়ারি আকস্মিকভাবেই রওশন ও জি এম কাদের স্বাক্ষরিত একটি বিবৃতি গণমাধ্যমে পাঠানো হয়। এতে লেখা ছিল, জাপায় কোনো বিভক্তির প্রশ্নই ওঠে না।
বিভক্তি নিয়ে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত খবরকে রীতিমতো অপপ্রচার উল্লেখ করে বলা হয়, আমরা ঐক্যবদ্ধভাবে দল পরিচালনায় প্রতিশ্রুতিবদ্ধ। এরকম যৌথ ঘোষণার পরও দলীয় কার্যক্রম থেকে বিরত আছেন জাপা চেয়ারম্যান জি এম কাদের। দলীয় কার্যক্রম কার্যত স্থবির। জেলা-উপজেলা সম্মেলন থেকে শুরু করে জাতীয় সম্মেলনের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত থমকে আছে। পার্টির পক্ষ থেকে রাজনৈতিক কর্মসূচিও নেই। নেই নেতাকর্মীদের প্রতি কোনো নির্দেশনা। রওশনপন্থিরা দল পরিচালনার নাটাই নিজেদের হাতে তুলে নেওয়ার চেষ্টা করছেন। সব মিলিয়ে প্রায় তিন মাস ধরেই দলীয় সব কর্মকাণ্ডের বাইরে জাপা চেয়ারম্যান। বহিষ্কারের ঘটনা কেন্দ্র করে একজন নেতার দায়ের করা মামলার পরিপ্রেক্ষিতে আদালতের নির্দেশে তিনি পার্টির কাজকর্ম থেকে বিরত আছেন। অথচ মামলা করা ব্যক্তি সাবেক এমপি ইউসুফ আলী মৃধা রওশনের অনুসারী হিসেবে পরিচিত। এই প্রেক্ষাপটে কাদেরপন্থিদের প্রশ্ন, মামলা প্রত্যাহার করলেই সব সংকটের সমাধান হয়।
দলীয় নির্ভরযোগ্য সূত্রে জানা গেছে, এ ব্যাপারে রওশনের পক্ষ থেকে মৃধাকে কোনোরকম নির্দেশ দেওয়া হয়নি। মামলা প্রত্যাহারের বিষয়ে মৃধার সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি এ নিয়ে কোনো কথা বলতেও নারাজ। সংগত কারণেই প্রশ্ন ওঠে, সত্যিই কি জাপায় ঐক্যের সুর বাজছে। নাকি প্রকাশ্যে এক, ভেতরে বিরোধ জিইয়ে রয়েছে। তবে ধারাবাহিক ঘটনার আলামত বলছে, রওশনপন্থিরা ঐক্যের কথা বললেও কার্যত জি এম কাদেরকে কৌশলে দলীয় কার্যক্রম থেকে বিরত রাখা হয়েছে। নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তা চলমান থাকার আশঙ্কা অনেকের। এর কারণ হিসেবে তারা বলছেন, বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহণ করা না করার ওপর নির্ভর করছে জি এম কাদেরের ভবিষ্যৎ রাজনীতি। বিএনপি যদি নির্বাচনে আসে, তাহলে আওয়ামী লীগের সঙ্গে গাঁটছড়া বেঁধে আবারও মহাজোটের ঘোষণা দেবে জাপা। না আসলে ৩০০ আসনে প্রার্থী দিয়ে পৃথক নির্বাচনে অংশ নিয়ে ফের বিরোধী দলের জায়গা নেবে জাতীয় পার্টি। আর এসব কিছুই হবে রওশনের নেতৃত্বে। জাপার নির্বাচনী অবস্থান নিশ্চিত করার পরই জি এম কাদেরের হাতে স্বাভাবিক দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ আসতে পারে।
অর্থাৎ নির্বাচনে জাপার অবস্থান নেওয়ার ক্ষেত্রে জি এম কাদেরের হাতে কোনো সুযোগ থাকছে না। আওয়ামী লীগ থেকে শুরু করে রওশনও জি এম কাদেরের ওপর আস্থা রাখতে পারছেন না বলে জানা গেছে। তাই চাপিয়ে দেওয়া সিদ্ধান্ত মেনেই তাকে দলে থাকতে হচ্ছে। মূলত এ কারণেই মামলার বিষয়টি ঝুলিয়ে রাখা হয়েছে বলেও মনে করেন অধিকাংশ নেতা। জি এম কাদেরপন্থি শীর্ষ নেতাদের অভিযোগ, সাম্প্রতিক সময়ে সরকারের কঠোর সমালোচনায় মুখর ছিলেন জি এম কাদের। আলোচনা ছিল, আসন্ন দ্বাদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির সঙ্গে হাত মেলাতে পারেন তিনি। তাই দলকে নিজের হাতের মুঠোয় নেওয়া ও বঞ্চিত নেতাদের পরামর্শে গত ২৬ নভেম্বর দলের সম্মেলনের ডাক দেন রওশন। শেষ পর্যন্ত সম্মেলন থেকে সরে এলেও তার অনুসারীরা আদালতের দ্বারস্থ হন। এর মধ্যে সংবিধান অনুযায়ী যথাসময়ে নির্বাচনে অংশ নেওয়ার ঘোষণা দিয়েছেন রওশন। আওয়ামী লীগের পাশে থেকে পথচলার ইঙ্গিত দিয়েছেন তিনি। এরপর থেকেই জি এম কাদেরের ওপর আদালতের নিষেধাজ্ঞার নেপথ্য কারণ নিয়ে নানা গুঞ্জনের ডালপালা বাড়ছে। গত ১৯’শে জানুয়ারি বিরোধী দলের নেতার কার্যালয়ে রওশনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদীয় দলের বৈঠকে জি এম কাদেরও উপস্থিত ছিলেন। সেখানেও সবাইকে এক হয়ে পথচলার পরামর্শ দেন রওশন। তবে দলের প্রভাবশালী তিনজন এমপি শীর্ষ নেতৃত্বে বিরোধ দূর করার পরামর্শ দিয়ে বক্তব্য দেন। তারা বলেন, বিরোধের কারণে জাপা আরও বেশি শক্তি হারাচ্ছে। নেতাকর্মীরা আমাদের প্রতি আস্থা রাখতে পারছেন না।
ঐক্যের ডাক দেওয়ার পরও মামলা জটিলতায় জি এম কাদের দলীয় কার্যক্রম থেকে বাইরে কেন—এমন প্রশ্নে জাপা মহাসচিব মুজিবুল হক চুন্নু বলেন, মামলার ইস্যু দলের হাতে নেই। পুরোপুরি আদালতের এখতিয়ার। আমরা আশা করেছিলাম, এমনিতেই আদালত মামলাটি খারিজ করে দেবেন। কিন্তু হয়নি। আশা করি, দ্রুত সময়ের মধ্যে সমস্যার সমাধান হবে। বাদীকে মামলা প্রত্যাহারের নির্দেশ দেওয়া প্রসঙ্গে তিনি বলেন, আদালতে মামলা করার এখতিয়ার সবার আছে। কেউ যদি তা প্রত্যাহার না করতে চান, এটা ব্যক্তিগত স্বাধীনতা। জাপা থেকে অব্যাহতি পাওয়া নেতা জিয়াউল হক মৃধার করা মামলার শুনানি নিয়ে গত ৩০ অক্টোবর জি এম কাদেরের সিদ্ধান্ত গ্রহণে অস্থায়ী নিষেধাজ্ঞা দেন আদালত। জিয়াউল হক গত ৪ অক্টোবর জি এম কাদেরকে জাপার চেয়ারম্যান হিসেবে অবৈধ ঘোষণার ডিক্রি চেয়ে প্রথম যুগ্ম জেলা জজ আদালতে মামলা করেন। একই মামলায় দল থেকে জিয়াউল হকের বহিষ্কারাদেশকে বেআইনি ঘোষণা এবং দলীয় গঠনতন্ত্রের ২০-এর উপধারা ১(১) অবৈধ ঘোষণা চাওয়া হয়। মামলায় জি এম কাদের ছাড়াও নির্বাচন কমিশনের সচিব, জাপার মহাসচিব, সাংগঠনিক সম্পাদক ও যুগ্ম দপ্তর সম্পাদককে বিবাদী করা হয়। জিয়াউল হক জাপা দলীয় সাবেক সংসদ সদস্য এবং দলের চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য ছিলেন। গত ১৭ সেপ্টেম্বর তাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। এ’বিষয়ে জি এম কাদেরের পক্ষে আদালতে বলা হয়েছে, জিয়াউল হককে আইন মেনে দলীয় পদ থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া জাপার প্রেসিডিয়াম সদস্যসহ সব পদপদবি থেকে গত ১৪ সেপ্টেম্বর অব্যাহতি পাওয়া মসিউর রহমান গত ২৩ অক্টোবর আরও একটি মামলা করেন।
মামলায় জিয়াউল হক ও মসিউর রহমান দুজনই দাবি করেন, জাপার প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের মৃত্যুর ছয় মাস আগে তার ছোট ভাই জি এম কাদের ভুল বুঝিয়ে ‘জাতীয় পার্টির জন্য ভবিষ্যৎ নির্দেশনা’ শিরোনামে একটি চিঠিতে স্বাক্ষর করান। এরপর জি এম কাদের প্রথমে ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান, পরে চেয়ারম্যান হন, যা ছিল গঠনতন্ত্রের পরিপন্থি। এ নিয়ে দলের ভেতরে বিশৃঙ্খলা দেখা দিলে এরশাদ ২০১৯ সালের ২২ মার্চ জি এম কাদেরকে কো-চেয়ারম্যানের পদ থেকে অব্যাহতি দেন। ৪ মে ফের তাকে জাপার ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান করেন। তখন এরশাদ গুরুতর অসুস্থ থাকায় তিনি স্বাভাবিক বিবেচনা প্রয়োগে সক্ষম ছিলেন না বলে মামলায় দাবি করা হয়েছে। এরশাদের মৃত্যুর পর ২০১৯ সালের ১৮ জুলাই সংবাদ বিজ্ঞপ্তি দিয়ে নিজেকে চেয়ারম্যান ঘোষণা দেন জি এম কাদের। দলের গঠনতন্ত্রে এভাবে চেয়ারম্যান ঘোষণার কোনো বিধান নেই।
মামলায় মসিউর রহমান দাবি করেন, জি এম কাদের নিজেকে জাপার চেয়ারম্যান দাবি করে ২০১৯ সালের ২৮’শে ডিসেম্বর ঢাকার ইঞ্জিনিয়ার্স ইনস্টিটিউশনে সম্মেলন ডাকেন। এর আগে এ সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে ১৯ ডিসেম্বর হাইকোর্টে একটি রিট আবেদন হয়। রিটের প্রাথমিক শুনানি নিয়ে জি এম কাদেরকে চেয়ারম্যান ঘোষণা কেন বেআইনি হবে না মর্মে রুল দেন হাইকোর্ট। এটি বিচারাধীন অবস্থায় দলের কাউন্সিল করেন জি এম কাদের।




























