
শাহীন রেজা, স্টাফ রিপোর্টার, কুষ্টিয়া।। কুষ্টিয়া কুমারখালী উপজেলার শিলাইদহে কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাচারি বাড়ি দীর্ঘ দিন সংস্কারের অভাবে পড়ে আছে জরাজীর্ণ অবস্থায়। এভাবে নিরব পড়ে থাকলে হয়তো রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজরিত কাচারি বাড়ি বিলুপ্ত হয়ে আগামী প্রজন্ম এর গন্ধ খুঁজে পাবে না। তাই আগামী প্রজন্মকে কবিগুরুর কাচারি বাড়ী সম্পর্কে জানাতে এবং বোঝাতে এখনও এর সংস্কারসহ প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেয়া দরকার। সাহিত্যের পাশাপাশি মানব কল্যাণে দরিদ্র জনগণের সঙ্গে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যে সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন সে বিষয়টি ভবিষ্যৎ প্রজন্মকে জানাতে হলে রবিন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত নিদর্শনগুলোকে টিকিয়ে রাখা খুবই জরুরি বলে মনে করেন রবিন্দ্র ভক্ত ও অনুরাগীরা।
স্মৃতি বিজড়িত কাচারি বাড়িটিকে স্থানীয়রা এখন গোবরের ভাগারে পরিণত করেছেন। এমন অবস্থায় কুঠিবাড়িটির মতো বিশ্বকবির স্মৃতিবিজড়িত এই দুটো স্থাপনা সংরক্ষণের জন্য দীর্ঘদিন ধরে দাবি জানিয়ে আসছে কবিগুরুর ভক্ত ও অনুরাগীরা। কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর শিলাইদহে যে শুধুমাত্র সাহিত্য চর্চা করেছেন তা নয়। সাহিত্য চর্চার পাশাপাশি মানব কল্যাণে দরিদ্র জনগণের সঙ্গে নিবিড় সেতুবন্ধন স্থাপন করেছিলেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। তিনি মানবকল্যাণে স্থাপন করেছিলেন কাচারি বাড়ি ও দাতব্য চিকিৎসালয়। রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিবিজড়িত কুষ্টিয়ার কুমারখালীর শিলাইদহে নির্মাণ করা কাচারি বাড়ি ও দাতব্য চিকিৎসালয়টি বর্তমানে পরিণত হয়েছে পরিত্যাক্ত স্থাপনায়। তার সেই স্মৃতি বিজড়িত বাড়িতেই এখন গোবর শুকাচ্ছেন স্থানীয়রা। অযত্ন আর অবহেলায় ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে বিশ্ব কবির স্মৃতি বহনকারী ঐতিহাসিক এই কাচারি বাড়িটি। ইতিমধ্যে কাচারি বাড়িটির বিভিন্ন আসবাবপত্রসহ দরজা ও জানালা চুরি হয়ে গেছে।
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শিলাইদহের কাচারি বাড়িটি বাঙালি জাতির জন্য একটি অমূল্য সম্পদ। কিন্তু অবহেলায় আর অযত্নে এ বাড়িটি দিনে দিনে ধ্বংস হয়ে যাচ্ছে। অথচ ঠিকমতো সংস্কার ও সংরক্ষণ করা হলে এই কাচারি বাড়িটিও পর্যটনদের কাছে আরও একটি দর্শনীয় স্থানে পরিণত হতো। ফলে কাচারি বাড়িটি হয়ে উঠত সরকারের রাজস্ব আয়ের একটি নতুন উৎস হিসেবে। কয়েক বছর আগেও এই বাড়িতে শিলাইদহ ইউনিয়ন ভূমি অফিসের কার্যক্রম পরিচালিত হতো। শিলাইদহ ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণের ফলে বর্তমানে ইউনিয়ন ভূমি অফিস সেখানে স্থানান্তর করা হয়েছে। এ কারণে কাচারি বাড়িটি এখন পরিত্যক্ত জরাজীর্ণ অবস্থায় পড়ে আছে। বর্তমানে কাচারি বাড়িটি স্থানীয় লোকজনের গোবরের, লাকড়ি শোকানোর আদর্শ স্থান ও মাদকসেবীদের আড্ডাস্থলে পরিণত হয়েছে। বাড়ির সামনের ফাঁকা জায়গা পরিণত হয়েছে গরু, ছাগলের চারণভূমিতে। দাতব্য চিকিৎসালয়ের ভাঙা চারটি কক্ষের মধ্যে দুটি কক্ষের ছাদ সংস্কার করা হলেও কাচারি বাড়িটির এখনো কিছুই করা হয়নি। এর ফলে কাচারি বাড়ির পলেস্তারা, বারান্দাসহ কয়েকটি কক্ষের ছাদের কিছু অংশ ভেঙে পড়েছে, কিছু কিছু জায়গার ইট খসে পড়েছে, দেয়ালের গায়ে জন্মেছে বট, পাকর গাছ, আগাছায় ছেয়ে গেছে চারপাশ। বিশ্ব কবির কাচারি বাড়িটিতে পাঁচ একর জমি রয়েছে, যা ইতিমধ্যে অনেক প্রভাবশালীরা দখল করে নিয়েছেন।
এদিকে বিশ্বকবির কাচারি বাড়ি ও দাতব্য চিকিৎসালয়টিতে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কর্তৃক সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করে নোটিশ টাঙিয়ে রাখলেও কেউ মানছে না নোটিশে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞা। ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের কলা বিভাগের ডিন ও রবীন্দ্র গবেষক অধ্যাপক ড. সরোওয়ার মুর্শেদ বলেন, রবীন্দ্রনাথ আমাদের আবেগের জায়গা। রবীন্দ্রনাথের শিলাইদহ কাচারি বাড়ি ও মহৌষি দাতব্য চিকিৎসালয়টিকে শুনেছি পুরাকীর্তি বিভাগ অধিগ্রহণ করেছে। অতি দুঃখের বিষয় পুরাকীর্তি হিসেবে এগুলো যে নিয়েছে তার প্রতিফলন কিন্তু আমরা দেখছি না। আমরা চাই রবীন্দ্রনাথের অমূল্য যে স্মৃতি সেগুলো বাঙালি জাতির জন্য, বাঙালি পর্যটকদের জন্য, বিদেশি পর্যটকদের জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এটাকে আকর্ষনীয় করে গড়ে তুলবেন বলে আমরা আশা রাখি।
অনদিকে কুমারখালী উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বিতান কুমার মন্ডল বিডি টাইম্স নিউজকে বলেন, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত কাচারি বাড়িটি ঐতিহাসিক স্থাপনা। এই বাড়ির সংস্কার করে ঐতিহ্য সংরক্ষণ করা খুবই জরুরি। রবীন্দ্র স্মৃতিবিজড়িত এই কাচারি বাড়িটি রক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে মন্ত্রণালয়ে আবেদন করা হয়েছে। খুব দ্রুতই কাচারি বাড়িটি সংরক্ষণের জন্য প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের নির্দেশনা অনুযায়ী কাজ শুরু করা হবে। বিষয়টি নিয়ে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরের খুলনা অঞ্চলের আঞ্চলিক পরিচালক আপরোজা খান মিতা জানান, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্মৃতিবিজড়িত শিলাইদহ কাচারি বাড়ি ও দাতব্য চিকিৎসালয় সংরক্ষণে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর কাজ করছে। কাচারি বাড়িটির মূল ভবনের কয়েকটি কক্ষ ও বারান্দার ছাদ ভেঙে গেছে। ২০২২-২৩ অর্থবছরের বরাদ্দ দিয়ে ভেঙে যাওয়া ওই ছাদ সংস্কার করাসহ অন্যান্য কাজ করা হবে। পর্যায়ক্রমে পুরো ভবনটাই আগের রূপে ফিরিয়ে নেওয়া হবে। তিনি আরও বলেন, প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তরকে সুধুমাত্র কাচারি বাড়ির বিল্ডিং ও দাতব্য চিকিৎসালয়ের বিল্ডিং দেওয়া হয়েছে। আমরা পাশের আর কিছু খাস জমি চেয়েছি, যাতে করে এসব স্থাপনাগুলোর চারপাশে প্রাচীর দিয়ে রক্ষা করতে পারি। আমরা ইতিমধ্যে দাতব্য চিকিৎসালয়ের বেশ কিছু কাজ করেছি। খুব শিগগিরই বিশ্বকবির স্মৃতি বিজড়িত কাচারি বাড়িটিকেও আমরা আগের রূপে দেখতে পারব।






























