
জহির সিকদার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা সংবাদদাতা।। ব্রাহ্মনবাড়িয়া জেলার তিতাস নদীর তীর ঘেষে নবীনগর উপজেলা। তারই মাঝে গড়ে ওঠেছে নবীপুর ও দড়িলাপাং গ্রাম। নদী ভাঙনের সঙ্গে যুদ্ধ করেই চলে এ দুই গ্রামের জনজীবন। এক সময় নুন আনতে পান্তা ফুরাত গ্রামবাসীর। তবে এখন দুই গ্রামের অর্থনীতি পাল্টে দিচ্ছে ঢাকার সোয়ারিঘাটের পুরোনো লোহার ড্রাম। এই ড্রাম ব্যবসা করে মাসে প্রায় এক কোটি টাকা আয় করছে নবীনগর উপজেলার নবীপুর ও দড়িলাপাং গ্রামের মানুষ। তবে প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই পুরোনো ড্রাম-বাণিজ্য আরো সম্প্রসারিত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
মূলত ঢাকার সোয়ারীঘাট থেকে তেল ও বিটুমিনের পুরনো ড্রাম কিনে আনেন নবীপুর ও দড়িলাপাং গ্রামের ব্যবসায়ীরা। একেকটি ড্রামের দাম পড়ে ৭৫০ থেকে ৮৫০ টাকা। এরপর ড্রামগুলোকে বিক্রির উপযোগী করতে খরচ হয় আরো ১০০ টাকা। দুই গ্রামে ছোট-বড় মিলিয়ে ব্যবসায়ী আছেন মোট ৫০ জন। এছাড়া এই ড্রাম ব্যবসার ফলে কর্মসংস্থান হয়েছে দুই গ্রামের তিন শতাধিক মানুষের।
জানা যায়, নবীনগর উপজেলার নবীনগর পশ্চিম ইউনিয়নের নবীপুর গ্রামে প্রায় দুই যুগ আগে ড্রাম ব্যবসার সূচনা হয়। ওই গ্রামের বাসিন্দা সুরুজ মিয়া সর্বপ্রথম ড্রাম এনে ব্যবসা শুরু করলে ধীরে ধীরে বিস্তৃত হতে থাকে এই পুরোনো ড্রামের ব্যবসা। নদীপথে নৌকায় করে কিশোরগঞ্জ, নেত্রকোনা, সিলেট, হবিগঞ্জ ও সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন হাওরাঞ্চলে বিক্রি হয় এসব ড্রাম। মূলত চৈত্র ও বৈশাখ মাসে ধানের মৌসুমে ড্রাম বেশি বিক্রি হয়। ড্রামগুলোতে ধান, চাল ও গমসহ অন্যান্য পণ্য সংরক্ষণ করে থাকে হাওরবাসী।
লট হিসেবে কিনে আনা ড্রামগুলোর মধ্যে কিছু ড্রাম মেরামতের প্রয়োজন হয়। গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া তিতাস নদীর তীরে ড্রামের প্রয়োজনীয় মেরামত কাজ করেন শ্রমিকরা। প্রতিটি ড্রামেই ঢাকনা সংযোজন করা হয়। এজন্য ড্রাম প্রতি শ্রমিকদের মজুরি দেওয়া হয় ৬০ টাকা করে। একেকটি ড্রামের প্রয়োজনীয় মেরামত ও ঢাকনা সংযোজনে শ্রমিকদের প্রায় এক ঘণ্টা সময় লাগে। পরে ড্রামগুলো ধুয়ে-মুছে রং করা হয়।
ড্রামগুলো বিক্রির জন্য নৌকায় করে দেশের বিভিন্ন স্থানে নিয়ে যেতে দুই গ্রামের ব্যবসায়ীদের বড় নৌকা আছে ২৪টি এবং ছোট নৌকা আছে ৩-৪টি। বড় নৌকাগুলোতে ৪০০ পিস এবং ছোট নৌকাগুলোতে ১০০ পিস ড্রাম ধারণ করে। এছাড়া ড্রাম বিক্রি করার জন্য বড় নৌকাগুলোতে শ্রমিক থাকে ৮/১০ জন। নৌকাগুলো ড্রাম নিয়ে বিভিন্ন এলাকার ঘাটে ভিড়ে। এরপর গ্রামে-গ্রামে ঘুরে ফেরি করে বিক্রি হয় ড্রামগুলো। ড্রাম নিয়ে রওনা হওয়ার পর বড় একেকটি নৌকার ৪০০ পিস ড্রাম বিক্রি করে শ্রমিকদের গ্রামে ফিরে আসতে সময় লাগে ১৪-১৫ দিন। আর ছোট নৌকার ১০০ পিস ড্রাম বিক্রিতে সময় লাগে ২-৩ দিন। প্রতিটি ড্রাম ১৪০০ থেকে ১৫০০ টাকায় বিক্রি হয়। এভাবে নবীপুর ও দড়িলাপাং থেকে প্রতি মাসে প্রায় ২০ হাজার ড্রাম বিক্রি হয়। যার মূল্য প্রায় ৩ কোটি টাকা। প্রতি পিস ড্রামে ব্যবসায়ীদের লাভ হয় ৪০০ থেকে ৫০০ টাকা পর্যন্ত। ড্রাম মেরামত কাজ করা নবীপুর গ্রামের বাসিন্দা মো. রুস্তম আলী জানান, তিনি ১৫-১৬ বছর ধরে ড্রাম মেরামতের কাজ করছেন। প্রতিদিন ১০-১২টি ড্রাম মেরামত করে ঢাকনা সংযোজন করেন। এ কাজ করে দৈনিক ৬০০ থেকে ৭০০ টাকা আয় করেন তিনি। এই টাকায় তার সংসার ভালোভাবেই চলছে বলে জানান তিনি। আরেক শ্রমিক শাহ আলম জানান, ড্রাম ব্যবসার কারণে গ্রামেই তাদের কর্মসংস্থান হয়েছে। দুই গ্রামে অনেক বেকার যুবক এখন ড্রাম মেরামত এবং ফেরি করে ড্রাম বিক্রির কাজ করছেন। ড্রাম মেরামতের কাজ করে একেকজন শ্রমিক দৈনিক ৭০০-৮০০ টাকা আয় করতে পারেন।
ড্রাম ব্যবসায়ীরা বলছেন, পুরোনো ড্রাম বাণিজ্যে দুই গ্রামের মানুষ অর্থনৈতিকভাবে সমৃদ্ধ হচ্ছে। প্রয়োজনীয় পৃষ্ঠপোষকতা পেলে এই ব্যবসা আরো সম্প্রসারিত করা সম্ভব। গ্রামের আরো অনেকে এ ব্যবসায় আসতে চাইলেও অর্থের অভাবে তারা আসতে পারছেন না। সেজন্য সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেয়ার দাবি জানিয়েছেন ব্যবসায়ীরা।
দড়িলাপাং গ্রামের ড্রাম ব্যবসায়ী মো. রুবেল বলেন, ‘একেকটি নৌকায় আমাদের ৩ থেকে সাড়ে ৩ লাখ টাকার বেশি পুঁজি খাটাতে হয়। মাসে প্রায় ২০ হাজার পিস ড্রাম বিক্রি হয় দুই গ্রাম থেকে। এই ব্যবসা করে আমাদের দুই গ্রামের অনেকের ভাগ্য বদল হয়েছে। তবে পুঁজির অভাবে আমরা ব্যবসা বড় করতে পারছি না। যদি আমাদের সহজ শর্তে ব্যাংক ঋণ দেওয়া হয়, তাহলে এই ড্রাম ব্যবসা আরো বেশি সম্প্রসারিত হবে। নতুন করে আরো অনেকে এ ব্যবসায় আসবেন।’ এ ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া ব্যাংকার্স ফোরামের সভাপতি ও সোনালী ব্যাংকের ব্রাহ্মণবাড়িয়া প্রধান শাখার ব্যবস্থাপক মো. ইকবাল হোসেন বলেন, ‘ঋণের জন্য কয়েকজন ব্যবসায়ী মিলে একটি করে গ্রুপ করতে হবে। এরপর ওই গ্রুপের মাধ্যমে তাদের ব্যবসার পূর্ণ বিবরণ দিয়ে ঢাকায় ঋণের জন্য আবেদন করতে হবে। যদি এটি কোনো শিল্প হয়ে থাকে, তাহলে ব্যবসায়ীরা ৪ শতাংশ হারে ঋণ পেতে পারেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ





























