লেখকঃ সন্দীপ ব্যানার্জি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট(কলকতা)
বর্তমানে আমরা সবাই অদ্ভুত পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে চলেছি। এমন এক পরিস্থিতি হয়ত দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পরে মানবসমাজ আর দেখেনি। আমরা এটা মেনে নিতে পারছি না, আবার মেনে না নিয়েও কোনো উপায় নেই। কোভিড-১৯ মানুষের জীবন-জীবিকা, এমনকি অস্তিত্ব পর্যন্ত বিপন্ন করে তুলেছে।
করোনা এখন আর কেবলমাত্র একটি ব্যাধি নয়, এটা এখন আমাদের জীবনযাত্রার দিক নির্ণায়ক। কিন্তু সমস্যা হল, মানুষের জীবনে করোনাই একমাত্র সমস্যা নয়! প্রতিদিনের জীবনসংগ্রামে বাস্তব ও কল্পনার যে সংঘাত নিয়ে আমরা বাঁচি, তা যেন এখন আরো বেশি কঠিন। করোনাকে শুধু একটা মহামারী বললে কম বলা হবে, কারণ আমাদের সামাজিক, অর্থনৈতিক ও মানসিক অবস্থান আজ করোনার দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এই রোগ আমাদের ভাবতে বাধ্য করছে কোনটি আমাদের কাছে গুরুত্বপূর্ণ, আমাদের জীবনের অভিমুখ কোন দিকে হবে। আমরা যখন প্রতিনিয়ত ভেবে চলেছি এই অতিমারী থেকে বাঁচার উপায়, তখন একটি অভিব্যক্তি করোনা থেকে বাঁচার ব্যাপারে প্রায় সমার্থক হয়ে উঠেছে। এই অভিব্যক্তি হলো সামাজিক দূরত্ব একটু গভীরভাবে চিন্তা করলে একটা প্রশ্ন উঠে আসতেই পারে- আমাদের কি সামাজিক দূরত্ব দরকার? নাকি আমরা আসলে শারীরিক দূরত্বের কথা ভাবছি? সামাজিক দূরত্ব কথাটার মধ্যে একটা কূটাভাস আছে।
সামাজিক দূরত্ব শুধু শারীরিক দূরত্ব বোঝায় না, তা মনস্তাত্ত্বিক দূরত্বকেও বোঝায়। এখন আমাদের ভাবতে হবে যে এই মহামারির কালে আমরা সবাই একে অপরের পাশে থাকবো কিনা। যদি থাকি তবে সামাজিক ভাবেই থাকতে হবে এবং সেখানে মনের মধ্যে পাঁচিল তুলে থাকা সম্ভব নয় এবং তার কোনো মানেও হয় না। কিন্তু করোনা থেকে বাঁচতে হলে একটা পাঁচিল তো তুলতেই হবে; তাহলে সেটা শারীরিক হওয়াটাই শ্রেয়। মনে রাখতে হবে, কোনো মানুষই একা বাঁচতে পারে না। আমরা সবাই জানি, একটা দ্বীপের মধ্যে আলাদা হয়ে থাকা কাম্য নয়; আর যদি তা নাই হয়, তাহলে সামাজিক দূরত্ব কিসের? আমাদের আসলে কি দরকার, সামাজিক দূরত্ব না সামাজিক বন্ধন অথবা শারীরিক দূরত্ব? এটা ঠিক কিন্তু আমাদেরকেই করতে হবে; আমাদের ভাবতে হবে যে সামাজিক দূরত্ব সত্যি আমাদের সাহায্য করবে, না করবে না। তারচেয়ে বরং ভালো, আবেগ ও সম্পর্কের নৈকট্য, হোকই না তা শারীরিকভাবে দূরে থেকে।

এটা আমাদের অনেকেরই জানা যে, সম্পর্ক কখনোই দূরত্বের উপর নির্ভর করে না; আর যদি তা করে, তাহলে সেটা নিয়ে যথেষ্ট ভাবার আছে। ভৌগলিক দূরত্ব কখনোই কোনো মানবিক ভাবনার পরিপন্থী হতে পারে না, কিন্তু মানসিক দূরত্ব পারে। আর এই সামাজিক দূরত্ব আসলে মানসিক দূরত্বেরই একটা প্রতিফলন। আম্ফান ঝড়ের তাণ্ডবের পরে একটা ছবিতে আমরা দেখেছিলাম, একটি বাচ্চা ছেলে জলের মধ্যে দাঁড়িয়ে খাবার নিচ্ছে। ছবিটা বিভিন্ন সংবাদপত্রে এবং সোশ্যাল মিডিয়াতে আলোড়ন সৃষ্টি করেছিল। আমরা অনেকেই এই ব্যাথা অনুভব করেছিলাম, যার ফলশ্রুতিতে সরকারি-বেসরকারি বহু সংগঠন এবং বহু ব্যক্তি নিজের তাগিদে নিপীড়িত মানুষদের ত্রাণের ব্যবস্থা করে।
এছাড়া, করোনা মহামারীর প্রকোপ চলাকালীন, বিশেষত আম্ফান ঝড়ের পরে, বহু মানুষ নিজ নিজ এলাকাবর্তী বয়স্ক মানুষদের, যারা বাইরে বেরিয়ে খাদ্য ও ওষুধের মত প্রয়োজনীয় সামগ্রী সংগ্রহ করতে অসমর্থ, তাদের সাহায্য করেছে। অধিকাংশ বয়স্ক মানুষই অনলাইন শপিং বা অনলাইন ব্যাংকিং ইত্যাদি পরিষেবার সঙ্গে পরিচিত নন। এই প্রতিকূল পরিস্থিতিতে তাদের পাড়াপড়শিরাই এগিয়ে এসেছে নিঃস্বার্থভাবে সাহায্য করতে। অর্থ এবং খাদ্য, ওষুধ বা গুরুতর মুহূর্তে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া- সব ক্ষেত্রেই বয়স্ক মানুষদের সাহায্য করেছে তাদের আশেপাশের অন্যান্য মানুষেরা। তাহলে প্রশ্ন হল, আমরা যদি সত্যিই সামাজিকভাবে দূরে সরে যেতাম তাহলে কি ছুটে যেতাম সেইসব মানুষদের সাহায্যার্থে যারা জীবনের এক অনিশ্চিত প্রান্তে দাঁড়িয়ে?
কোভিড-১৯কে কেন্দ্র করে যখন মানুষের রুটিরুজি ব্যাহত হয়েছে, তখন বহু মানুষ তাদের পরিবার-পরিজন নিয়ে বিপাকে পড়েছে। এই পরিস্থিতিতে বিভিন্ন প্রান্ত থেকে বহু সংগঠন নানাভাবে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছে তাদের দিকে। আমরা দেখেছি রোগের ভয়কে তোয়াক্কা না করে মানুষের মাঝখানে ত্রাণ নিয়ে অনেকে পৌঁছে গেছেন এবং এখনো যাচ্ছেন। এই যে সহমর্মিতা ও সংবেদনশীলতা, এটা কি সামাজিকভাবে দূরত্ব হলে সম্ভবপর হত? বহু জায়গায় শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখেই মানুষের পাশে মানুষ দাঁড়িয়েছে- এটাই দরকার। আমরা বিধিনিষেধ মানব, কিন্তু মানবিকতার নিষেধাজ্ঞা তৈরি করব না।
আমরা সবাই একই সমাজের অঙ্গঃ একদল না খেয়ে অনাহারে দিন কাটাবে আর একদল সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে থাকবে, এটা সামাজিকভাবে সুস্থতার লক্ষণ নয়। তাই আমাদের সামাজিক দায়বদ্ধতা পালন করতে হবে সামাজিক দূরত্ব নয়, শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে।
করোনার দাপটে শিক্ষা আজ আর শ্রেণিকক্ষে প্রদান করা সম্ভব হচ্ছে না। আমরা তাই ফলিত শিক্ষা বা এর পথ অবলম্বন করেছি। শিক্ষক-শিক্ষিকাগণ তথ্য প্রযুক্তির সাহায্যে পাঠদান করছেন; টেলিভিশন, কম্পিউটার, স্মার্টফোন এসব ব্যবহার হচ্ছে যাতে ছাত্রছাত্রীরা পড়াশোনা থেকে বঞ্চিত না হয়। হয়তো শ্রেণিকক্ষে পাঠদানের মত পুরোটা করা যাচ্ছেনা, কিন্তু শিক্ষা স্তব্ধ হয়ে যায়নি। শিক্ষক-শিক্ষিকারা দূরে থেকেও অনলাইন ব্যবস্থায় ছাত্র-ছাত্রীদের কাছে গেছেন, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ রাখছেন নিয়মিত। এটা কি সামাজিক দূরত্বের নিদর্শন? সত্যি যদি তাই হত, তাহলে যারা পাঠদান করছেন, তারা ছাত্রদের কথা ভাবতেই ভুলে যেতেন, শুধু নিজেদেরকে নিয়েই ভাবতেন। এই ধারণা বোধহয় আরও বেশি প্রযোজ্য চিকিৎসক ও স্বাস্থ্যকর্মীদের ব্যাপারে। মনে রাখতে হবে, এনারা সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কাজ করছেন। পরিবার-পরিজন ছেড়ে শুধু রুগীর কথা মাথায় রেখে নিজেদের সুরক্ষা ভুলে দায়িত্ব পালন করে চলেছেন।
সামাজিক দায়িত্ববোধ না থাকলে এটা হয় না কখনো। তাই এরা সামাজিকভাবে এত কাছে আমাদের। যে মুহূর্তে আমরা সামাজিকভাবে দূরত্ব তৈরি করার কথা ভাববো, সেই সময় থেকেই আমাদের মানসিকতায় বিচ্ছিন্নতা প্রকাশ পাবে। আমাদের সমাজের নিম্নে থাকা শ্রেণীর পাশে দাঁড়াতে হবে, হতভাগ্য মানুষগুলোর দুঃখ-ব্যথা বুঝতে হবে, অনুভব করতে হবে। আমরা সচেতন থাকবো শারীরিকভাবে, কিন্তু মানসিকভাবে অবচেতন না হয়ে। এ প্রসঙ্গে আমেরিকার প্রাক্তন রাষ্ট্রপতি জন এফ কেনেডির কথা স্মরণ করা যেতে পারে: If a free society cannot help the many who are poor, it cannot save the few who are rich. আমাদের পৃথিবীতে থাকার একটা মূল্য দেওয়া দরকার এবং তা দিতে হবে সামাজিক কাজের মাধ্যমে। সামাজিক দূরত্ব রেখে কি আর সামাজিক কাজ হয়?
বর্তমানে করোনার নিরিখে আমরা অনেক সামাজিক ধ্বংসাত্মক কাজ দেখেছি। আমাদের ব্যবহারে তার বহিঃপ্রকাশ ঘটেছে। বহু উদাহরণ মেলে- পারিবারিক কলহ, আবেগজনিত সমস্যা, মানসিক অবসাদে আক্রান্ত হওয়া; শিশুরা সব থেকে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। জীবনে একটা কঠিন জিনিস হল ভিড়ের মধ্যে একলা থাকা। তাই সামাজিকভাবে আমাদের কাছাকাছি থাকতে হবে শারীরিকভাবে দূরে থেকে। আমাদের সমব্যথী হতে হবে, পরের কথা ভাবতে হবে। করোনা ভাইরাসকে যথার্থভাবে পরাজিত করতে হলে সব ধরনের বিধিনিষেধ পালন যেমন করতে হবে, তেমনি করোনার দ্বারা সামাজিক ক্ষতির ব্যাপারেও সজাগ থাকতে হবে। সামাজিক দূরত্ব নয়, শারীরিক দূরত্ব বজায় রাখতে হবে, কারণ তাহলেই আমরা সবাই মিলে এই মহামারী ও তার প্রভাবকে পরাস্ত করতে পারব।
এই মুহূর্তে শুধু কোন দেশ বা রাজ্য এই করোনা মহামারীর দ্বারা ক্ষতিগ্রস্ত নয়, সারা পৃথিবী আজ ধরাশায়ী। সবাই মিলে একটি চেষ্টাতে ব্যস্ত- একটি প্রতিষেধক আবিষ্কার করা। সামাজিকভাবে বন্ধুত্ব না হলে কি করে সবাই মিলে সমস্যার মোকাবিলা করব? শুধু আমেরিকা বা আফ্রিকা বা নিজের দেশের লোক না, এখন সব মানুষের ভাগ্য এক সূত্রে বাঁধা।
আমরা ভৌগোলিকভাবে দূরে থাকি, কিন্তু ঐক্যবদ্ধ থাকি- এটাই সময়ের দাবি। ভালোবাসা, সহমর্মিতা, আন্তরিকতা ছাড়া মানবসমাজ সদা বিপন্ন। আজকের দিনে, এই বিশ্বব্যাপী সংকটে, আমাদের সবাইকে সবার কথা ভাবতে হবে। আর এই ভাবনা সামাজিকভাবে দূরে সরে গিয়ে কিভাবে বাস্তবে সফল করা যায়? স্বামী বিবেকানন্দের একটি উক্তি এ প্রসঙ্গে মনে রাখতে হবে, তারাই যথার্থভাবে বাঁচে, যারা অন্যের জন্য বাঁচে। আমরা অন্যের জন্য বাঁচি বা ভাবি বা কিছু করি, সবটাই নির্ভর করে আমরা অন্যের সম্বন্ধে, নিজেদের মনে নিয়ত কি চিন্তা করছি তার ওপর। জীবন ও জীবিকার এই সংঘাতের কালে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে আমাদের সামাজিকভাবে কাছে থাকতে হবে, আর সেটাই হবে করোনার প্রভাবকে সবদিক থেকে নির্মূল করার শ্রেষ্ঠ প্রচেষ্টা।

লেখকঃ সন্দীপ ব্যানার্জি, শিক্ষাবিদ ও কলামিস্ট(কলকতা)
নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ



























