বাংলাদেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত হিসেবে মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োগ পেয়েছেন নাহিদা সোবহান। তাকে নিয়োগ করা হয়েছে জর্ডানে। তিনি বলেছেন, অভিবাসী শ্রমিকদের সাহায্য করতে চান। ওই দেশটিতে কমপক্ষে এক লাখ বাংলাদেশি নারী শ্রমিক আছেন। তাদের মধ্যে যারা নির্যাতিত হয়েছেন তাদের পাশে দাঁড়াতে চান তিনি। নাহিদা সোবহানকে (৫২) গত বছরের শেষের দিকে জর্ডানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব দেয়া হয়েছে। তিনি বলেছেন, তার প্রথম কাজগুলোর মধ্যে হবে জর্ডানের রাজধানী আম্মানে বাংলাদেশি দূতাবাসের ভেতরে বিপন্ন নারী শ্রমিকদের জন্য একটি আশ্রয় কেন্দ্র নির্মাণ করা। বাংলাদেশের পররাষ্ট্র বিভাগের এই অফিসার এরই মধ্যে রোম, কলকাতা ও জেনেভায় কূটনৈতিক পদে দায়িত্ব পালন করেছেন।

তাকে নিয়ে এসব কথা প্রকাশ করেছে অনলাইন বিজনেস ইন্টারন্যাশনাল। এতে আরো বলা হয়েছে, নাহিদা সোবহান নেদারল্যান্ডসের দ্য হেগ একাডেমি অব ইন্টারন্যাশনাল ল’তে আন্তর্জাতিক আইন নিয়ে পড়াশোনা করেছেন। আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিষয়ে ডিপ্লোমা করেছেন প্যারিসের ইন্সটিটিউট অব পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন থেকে। তার আগে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ব্যাচেলর ও মাস্টার্স ডিগ্রি অর্জন করেন ইংরেজি সাহিত্যের ওপর।

মধ্যপ্রাচ্য ও উত্তর আফ্রিকার অনেক দেশের মধ্যে জর্ডান হলো এমন একটি দেশ, যেখানে বাংলাদেশের হাজার হাজার নারী অভিবাসী অবস্থান করছেন। তার মধ্যে রয়েছেন গৃহকর্মী, পরিচারিকা ও গার্মেন্টকর্মী। কিন্তু এসব নারীর বেশির ভাগই শোষণ, বঞ্চনার শিকার। নির্যাতিত হন তাদের নিয়োগকর্তাদের হাতে। শুধু জর্ডানে আছেন বাংলাদেশের কমপক্ষে এক লাখ নারী শ্রমিক। তাদের বেশির ভাগই গরিব এবং গ্রাম থেকে যাওয়া। নাহিদা সোবহান বলেন, সুনির্দিষ্ট কিছু ইস্যু আছে যার মুখোমুখি হন নারী অভিবাসীরা। তাদের সমস্যা সমাধানে আমি সর্বোত্তম চেষ্টা করবো। যখন আপনি দায়িত্ব পালন করবেন তখন আপনি একজন নারী নাকি একজন পুরুষ সেটা কোনো বিষয় নয়। কিন্তু এটা সত্য যে, যখন বাংলাদেশি একজন নারী সমস্যায় পড়েন তিনি তা অন্য কোনো নারীর কাছে বলতে স্বস্তি বোধ করেন না।
নির্যাতিত কমপক্ষে ১৫০০ নারী ২০১৯ সালে সৌদি আরব থেকে দেশে ফিরে এসেছেন। ২০১৮ সালে এই সংখ্যা ছিল ১৩০০। জর্ডানে যে মাত্রায় নির্যাতন হয় তা সৌদি আরবের চেয়ে অনেক কম। বাংলাদেশি অভিবাসীদের অধিকার নিয়ে কাজ করে বিওএমএসএ নামের একটি গ্রুপ। এর চেয়ারম্যান লিলি জাহান বলেন, জর্ডান থেকে বাংলাদেশি শ্রমিকদের প্রায় ২০ থেকে ২৫টি অভিযোগ ২০১৯ সালে পেয়েছি আমরা। তার বেশির ভাগই বেতন সংক্রান্ত ইস্যুতে। ওইসব নারীকে যথাযথ বেতন দেয়া হতো না। তিনি আরো বলেন, এসব নারী বেতন নিয়ে সমস্যা করার প্রতিবাদ করলেও তাদের অনেককে প্রহার করা হতো। এসব ইস্যুতে আমরা সরকারকে জানিয়েছি।

নাহিদা সোবহান বলেন, জর্ডানের শ্রম আইন সহায়ক এবং সেখানে অভিবাসীরা ভয়াবহ জটিলতার মুখোমুখি হননি। আমি বিশ্বাস করি যেহেতু আমি একজন নারী, তাই বাংলাদেশি নারী শ্রমিকদের আস্থা অর্জনে সেটা আমাকে একটু বাড়তি সুবিধা দেবে। একই সঙ্গে তিনি যত বেশি সম্ভব নারী রাষ্ট্রদূত নিয়োগের জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি বলেন, বর্তমানে ৫০ জন রাষ্ট্রদূতের মধ্যে মাত্র ৭ জন নারী। আমাকে নিয়োগ দেয়ার মাধ্যমে এই বার্তাই দেয়া হচ্ছে যে, পরিস্থিতি উন্নতির দিকে যাচ্ছে এং তা অব্যাহতভাবে পাল্টাতে থাকবে।

জর্ডানে নারীর অগ্রগতির জন্য যা করা হয়েছে তারও প্রশংসা করেন তিনি। নাহিদা সোবহান বলেন, সামাজিক উন্নয়ন, বিশেষ করে মেয়েদের শিক্ষায় শক্তিশালী সাদৃশ্য রয়েছে বাংলাদেশ ও জর্ডানের মধ্যে। জর্ডানে নারীদের উচ্চ শিক্ষার প্রশংসা করেন তিনি। সেখানে নারীরা অগ্রসরমান, অর্থনীতি, সামাজিক ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখায় তিনি এ প্রশংসা করেন। তিনি আরো বলেন, বিশ্বের মধ্যে বাংলাদেশ সম্ভবত একমাত্র দেশ, যেখানকার জাতীয় সংসদের নেতা, উপনেতা, স্পিকার এবং বিরোধীদলীয় নেতা সবাই নারী। বর্তমান পার্লামেন্টে রয়েছেন ৭২ জন নারী এমপি। লিঙ্গ অসমতা কমিয়ে আনার ক্ষেত্রে দক্ষিণ এশিয়ায় বাংলাদেশ শীর্ষ স্থান দখল করেছে।

বৃটেনে বর্তমানে বাংলাদেশের হাইকমিশনার সাইদা মুনা তাসনিম। এর আগে তিনি কম্বোডিয়া ও থাইল্যান্ডে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেছেন। তিনি বলেছেন, পুরুষ রাষ্ট্রদূতের পাশাপাশি  সব নারীই কূটনীতিক এবং রাষ্ট্রদূত হিসেবে চমৎকার পারফর্মিং করে চলেছেন। এক্ষেত্রে নারী হিসেবে লিঙ্গ ভেদাভেদ নেই। তাই তারা নারী হওয়ার কারণে তাদের দিকে আলাদা করে মাইক্রোস্কোপ সেট করার প্রয়োজন নেই। তিনি আরো বলেন, কূটনৈতিক এবং দেশপ্রেমের ক্ষেত্রে দায়িত্ব পালনের বেলায় আমি কখনো কোনো জটিলতার মুখোমুখি হইনি একজন নারী বা একজন নারী কূটনীতিক হিসেবে।

দক্ষিণ কোরিয়াতে বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত আবিদা ইসলাম। তিনি বলেছেন, প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যে নীতি নিয়েছেন তাতে ব্যাপক সুবিধা পেয়েছেন নারীরা। যদি আপনি বাংলাদেশের ইতিহাসের দিকে তাকান, তাহলে দেখবেন নারীদের ক্ষমতায়ন এক উল্লেখযোগ্য বিষয়। আমি এজন্য কৃতিত্ব দেবো আমাদের মাননীয় প্রধানমন্ত্রীকে। কারণ, তিনি বিশ্বাস করেন, যদি আমরা আমাদের এই অর্ধেক জনসংখ্যাকে পেছনে ফেলে রাখি তাহলে আমাদের কোনো উন্নয়নই টেকসই হবে না। বাংলাদেশে প্রতিটি ক্ষেত্রে নারীরা আছেন। তারা সব রকম পেশায় আছেন। তারা সরকারে, বেসরকারি খাত, প্রতিরক্ষা সবখানেই আছেন। আমাদের অবিস্মরণীয় উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রয়েছে নারীদের ক্ষমতায়ন।

উল্লেখ্য, বাংলাদেশের একেবারে প্রথম নারী কূটনীতিক ছিলেন নাসিম ফিরদাউস। তিনি ১৯৭৭ সালে পররাষ্ট্র সার্ভিসে যোগ দিয়েছিলেন। এটা ঘটেছিল দেশ স্বাধীন হওয়ার ৬ বছর পরে। ২০০২ সালের আগে পর্যন্ত তিনি একজন পূর্ণাঙ্গ রাষ্ট্রদূত হতে পারেন নি। ২০০২ সালেই তাকে প্রথম ইন্দোনেশিয়ায় রাষ্ট্রদূত নিয়োগ করা হয়। বাংলাদেশের প্রথম নারী রাষ্ট্রদূত ছিলেন মাহমুদা হক চৌধুরী। তিনি ১৯৯৬ থেকে ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত ভুটানে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালন করেন।

নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে