নগরের অভিভাবক হিসেবে নগরবাসীর দেখভালের দায়িত্ব নগরের মেয়র। অভিভক্ত ঢাকার প্রথম নগরপিতা বা মেয়র ছিলেন মোহাম্মদ হানিফ। তিনিই ঢাকার প্রথম জননির্বাচিত মেয়র। মেয়র শব্দটা কানে এলেই আমাদের চোখে ভেসে ওঠে মোহাম্মদ হানিফের ছবি। মোহাম্মদ হানিফের পর এই দায়িত্ব পালন করেছেন আরো অনেকে। নাজির হোসেনের ‘কিংবদন্তির ঢাকা’ বইটি থেকে জানা যায়, ১৮৬৪ সালের ১ আগস্ট ঢাকা পৌরসভা (মিউনিসিপ্যালিটি) প্রতিষ্ঠিত হয়। ব্রিটিশ আমলে ঢাকা পৌরসভায় ১৭ জন চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন। এর মধ্যে প্রথম তিনজন বাদে বাকি ১৪ জন ছিলেন কমিশনারদের ভোটে নির্বাচিত। পৌরসভার প্রথম চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন তখনকার জেলা ম্যাজিস্ট্রেট স্কিনার। ১৮৮৪ সাল পর্যন্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেট পদাধিকার বলে এ পদে নিয়োগ পেতেন। প্রথম তিন চেয়ারম্যান, স্কিনার, ড. লাইএ্যল ও জে ব্রাডব্যারিকে নিয়োগ দেন ব্রিটিশ বাংলার গভর্নর। একটি কমিটির মাধ্যমে তারা ঢাকার সেবা ও প্রশাসন ব্যবস্থা তদারক করতেন।

ঢাকা পৌরসভা ঢাকা পৌর করপোরেশনে পরিণত হয় ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৮৩ সালে। ঢাকা পৌর করপোরেশনের প্রথম মেয়র নিযুক্ত হন ব্যারিস্টার আবুল হাসনাত। ৩ ডিসেম্বর ১৯৯০ থেকে ১২ ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এ পদে ছিলেন। ঢাকা পৌর কপোরেশন ঢাকা সিটি করপোরেশনে রূপান্তরিত হয় ১৯৯০ সালে।

ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়রগণ:

মির্জা আব্বাস

১৯৯১ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র হিসেবে নিযুক্ত হন মির্জা আব্বাস। ১৯৯৩ সালের ডিসেম্বর পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৯৪ সালে ঢাকা সিটি করপোরেশনের প্রথম নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন মির্জা আব্বাস। তবে আওয়ালীগ প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফের কাছে পরাজিত হন তিনি। মির্জা আব্বাস পরবর্তীতে ২০০১ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে তিনি ঢাকা-৬ আসন থেকে সংসদ সদস্য হিসেবে নির্বাচিত হন এবং ১১ অক্টোবর ২০০১ থেকে ২৭ অক্টোবর ২০০৬ পর্যন্ত গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী হিসেবে দায়িত্ব পান।

মোহাম্মদ হানিফ

নতুন আইন অনুযায়ী প্রথম প্রথম নির্বাচন হয় ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারি। জনগণের প্রত্যক্ষ ভোটে নির্বাচিত প্রথম মেয়র হন মোহাম্মদ হানিফ। মেয়র পদে ঢাকা মহানগর আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী মোহাম্মদ হানিফের অবিস্মরণীয় বিজয় আওয়ামী লীগের জন্য ছিল এক টার্নিং পয়েন্ট। ১৯৯৪ সালের ৩০ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ওই নির্বাচনে মোহাম্মদ হানিফ এক লাখেরও বেশি ভোটের ব্যবধানে ক্ষমতাসীন দল বিএনপির মির্জা আব্বাসকে পরাজিত করে সারা দেশে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেন। ১৯৯৪ সালের ১২ মার্চ থেকে ২০০২ সালের ৪ এপ্রিল পর্যন্ত তিনি ঢাকা সিটি করপোশনের মেয়রের দায়িত্ব পালন করেন।

২০০৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি মুক্তাঙ্গনে এক সমাবেশে বক্তব্য দেয়ার সময় তিনি হৃদরোগে আক্রান্ত হন। দীর্ঘদিন চিকিৎসা শেষে ২৮ নভেম্বর ২০০৬ দিবাগত রাতে ৬২ বছর বয়সে ঢাকার একটি হাসপাতালে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন তিনি।

সাদেক হোসেন খোকা

সরাসরি নির্বাচনে জয় লাভের মাধ্যমে ২০০২ সালের ২৫ এপ্রিল অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচিত হন সাদেক হোসেন খোকা। সে সময় তিনি বিএনপির মন্ত্রী ছিলেন। মেয়র নির্বাচিত হয়ে ২০০৪ সালে তিনি মন্ত্রীর পদ থেকে পদত্যাগ করেন। ২০১১ সালে সরকার সংসদে একটি বিলের মাধ্যমে ঢাকা সিটি করপোরেশনকে দুই ভাগে বিভক্ত করে ঢাকা উত্তর ও ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশন গঠন করা হয়। সে বছরের ২৯ নভেম্বর মেয়রের পদ থেকে পদত্যাগ করেন সাদেক হোসেন খোকা।

সাদেক হোসেন খোকা ছিলেন মুক্তিযোদ্ধা, বাংলাদেশের একজন রাজনীতিবিদ, সাবেক মন্ত্রী এবং বাংলাদেশের রাজধানী অবিভক্ত ঢাকা সিটি করপোরেশনের সর্বশেষ মেয়র। তিনি বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের সহ-সভাপতি ছিলেন এবং অবিভক্ত ঢাকার শহর বিএনপির সভাপতি ছিলেন দীর্ঘদিন। সাদেক হোসেন খোকা ২০১৯ সালের ৪ নভেম্বর যুক্তরাষ্ট্রের নিউইয়র্কের ম্যানহাটনে স্লোয়ান ক্যাটারিং ক্যানসার সেন্টারে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেন। ২০১১ সালের ঢাকা সিটি করপোরেশন বিভক্ত হলেও আইনি জটিলতার কারণে তিন বছরেরও বেশি সময়ে নির্বাচন হয়নি। এ সময়কালে নগর প্রধানের পদে দক্ষিণে ৭ জন প্রশাসক এবং উত্তরে ৮ জন প্রশাসক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

সাঈদ খোকন

২০১৫ সালের ২৮ মার্চ ঢাকার বিভক্ত দুই সিটির প্রথম নির্বাচন অনুষ্ঠিত হয়। এতে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে আওয়ামী লীগ মনোনীত মোহাম্মদ সাঈদ খোকন প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন। আর উত্তরে নির্বাচিত হন আনিসুল হক। অভিভক্ত ঢাকার প্রথম মেয়র মোহাম্মদ হানিফের ছেলে সাঈদ খোকন। ২০১৫ সালের ২৮ এপ্রিল ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের মেয়র নির্বাচনে ৫ লাখ ৩৫ হাজার ২৯৬ ভোট পেয়ে তিনি নির্বাচিত হন। সাঈদ খোকন পরে বাংলাদেশ আওয়ামী লীগের কেন্দ্রীয় কার্যনির্বাহী সংসদের সদস্য হন।

আনিসুল হক

আনিসুল হক ছিলেন একজন ব্যবসায়ী, রাজনীতিবিদ এবং টেলিভিশন উপস্থাপক। ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের প্রথম মেয়র নির্বাচিত হন তিনি। তিনি বিজিএমই’র সভাপতি ছিলেন। পরে এফবিসিসিআইর সভাপতি হন। সার্ক চেম্বারের সভাপতির দায়িত্বেও ছিলেন আনিসুল। ২০১৭ সালের ২৯ জুলাই ব্যক্তিগত সফরে সপরিবারে যুক্তরাজ্যে যান মেয়র আনিসুল হক। সেখানে অসুস্থ হয়ে পড়লে ১৩ আগস্ট তাকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। চিকিৎসাধীন অবস্থায় ৩০ নভেম্বর রাতে লন্ডনের ওয়েলিংটন হাসপাতালে মৃত্যুবরণ করেন তিনি। আনিসুল হক মৃত্যুবরণ করলেও এখনো দেশের মানুষ বিশেষ করে ঢাকাবাসী তাকে শ্রদ্ধার সাথে স্মরণ করেন। মূলত আধুনিক ঢাকা গড়ার ক্ষেত্রে তার অবদানের জন্য তিনি মানুষের মাঝে বেঁচে আছেন। এখনো সবাই তার কাজের প্রশংসা করেন।

আতিকুল ইসলাম

আতিকুল ইসলাম ২০১৯ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনের উপ-নির্বাচনে মেয়র হিসেবে নির্বাচিত হন। আনিসুল হকের মৃত্যুর কারণে উপ-নির্বাচন দেয়া হয় উত্তর সিটিতে। ৭ মার্চ মেয়র হিসেবে শপথ গ্রহণ করেন আতিকুল। এর আগে তিনি ২০১৩-১৪ মেয়াদে বাংলাদেশ পোশাক প্রস্তুতকারক ও রপ্তানিকারক সমিতির (বিজিএমইএ) সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এখন নতুন নগর পিতার অপেক্ষায় ঢাকার দুই সিটি করপোরেশন। আগামী ১ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত হবে ঢাকা উত্তর ও দক্ষিণ সিটি করপোরেশন। এই নির্বাচনে মেয়র পদে প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বি হিসেবে লড়ছেন দুই বড় রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপির চার প্রার্থী। ঢাকা উত্তরে লড়ছেন আওয়ামী লীগের আতিকুল ইসলাম ও বিএনপির তাবিথ আউয়াল। আর দক্ষিণে আওয়ামী লীগের শেখ ফজলে নূর তাপস ও বিএনপির সাবেক মেয়র সাদেক হোসেন খোকার ছেলে ইশরাক হোসেন। এদের মধ্য থেকেই দুইজন দায়িত্ব নেবেন দুই সিটির।

নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে