
জহির সিকদার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলা প্রতিনিধি।। বাংলাদেশের অন্যতম উন্নয়নশীল একটি জেলার নাম ব্রাহ্মণবাড়িয়া। এ জেলায় রয়েছে ৮টি কেপিআই প্রতিষ্ঠান, সাহিত্য সংস্কৃতির পীঠস্থান, বিশিষ্ট সাংবাদিক ও কবিদের অভয়ারণ্য। রয়েছে স্বাধীনতা যুদ্বের অনেক স্মৃতি। এ’জেলায় কবি আব্দুল কাদির ছাড়াও মুক্তিযুদ্ধে অবদান রেখেছে এমন অনেক ব্যক্তির আবাসস্থল। যুগের আবর্তে ও সময়ের পরিবর্তনে এ জেলার শিল্প-সংস্কৃতি, ব্যবসা বানিজ্য ছাড়াও নানাবিধ শিল্পের ব্যাপক প্রসার ও পরিচিতি লাভ করেছে। ঘটেছে শিক্ষার বিস্তার। সমাজের হয়েছে আমুল পরিবর্তন। বেড়েছে শিক্ষার হার, পাশাপাশি শিল্প ও সংস্কৃতির ব্যাপক প্রসার হয়েছে। যা সারা বাংলাদেশের তুলনায় অনেক বেশি। শুধু তাই নয়, জেলার ব্যবসা বানিজ্যের আমুল পরিবর্তন সাধিত হয়েছে। ব্যবসায়ীরা বেচে নিয়েছে নানাবিধ ও নানা শ্রেণীর ব্যবসা।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় সবচেয়ে বেশী বেড়েছে তৈরি পোশাকের চাহিদা। এ চাহিদাকে কেন্দ্র করে অনেকেই বেচে নিয়েছেন তৈরি পোশাকের ব্যবসা। সে জন্য জেলা শহরে গড়ে উঠেছে বেশ কয়েকটি বড় বড় বিপণী বিতান। এসব বিপণী বিতানে প্রতি মাসে কম করে হলেও অন্তত ২০ কোটি টাকার তৈরি পোশাক কেনাবেচা হচ্ছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময়ে এসব বিপনীবিতান গুলোতে কেনাবেচা অন্যান্য সময়ের তুলনায় দ্বিগুণ হয়। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্মের প্রথম পছন্দ এখন তৈরি পোশাক। তবে তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ায় দর্জিপাড়ায় আগের চেয়ে কাজ কমেছে প্রায় ৫০ শতাংশ। দোকানগুলোতে সবচেয়ে বেশি কমেছে ছেলেদের শার্ট-প্যান্ট সেলাই। শুধুমাত্র পাঞ্জাবি ও মেয়েদের বিভিন্ন ডিজাইনের পোশাক সেলাই করে অধিকাংশ দোকান টিকে আছে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলায় ছোট, মাঝারি ও বড় দর্জি দোকান আছে অন্তত দুই হাজার। এসব দোকানে কাজ করছেন প্রায় ১০ হাজার কারিগর। আগে সারাবছরই কারিগরদের হাতে কাজ থাকতো। তবে এখন অনেক দোকানেই আশানুরূপ কাজের অর্ডার আসছে না। বছর তিনেক ধরে কাজ কমেছে দর্জি দোকানগুলোতে। তবে তা একেবারে নগন্য ও নয়। আগে বাজারের বড় বড় দোকানগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে কাজের অর্ডার আসতো অন্তত দেড় লাখ টাকার। আর মাঝারি দোকানগুলোতে গড়ে ৫০ থকে ৬০ হাজার এবং ছোট দোকানে কাজের অর্ডার আসতো ৩০ থেকে ৩৫ হাজার টাকার। একেকজন দর্জি কারিগর প্রতি মাসে কাপড় সেলাই করে ১২ থেকে ১৫ হাজার টাকা আয় করেন। কেউ কেউ আয় করেন ১৮ থেকে ২০ হাজার টাকা। খরচ মিটিয়ে মালিকদের মুনাফা হতো ৩০ শতাংশের বেশি।
সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, করোনা মহামারির পর থেকেই ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দর্জিদের কাজ কমতে থাকে। এছাড়া দিন দিন তৈরি পোশাকের চাহিদা বাড়ায় মানুষ এখন দর্জি দোকন থেকে কাপড় বানাচ্ছেন কম। পাশপাশি কাপড় সেলাইয়ের মূল্যের চেয়েও তুলনামূলক কম মূল্যে মার্কেটে অনেক পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। এসব কারণে দর্জিদের কাজ কমেছে। ফলে অনেক কারিগর দর্জি পেশা ছেড়ে জীবিকা নির্বাহ করছেন ভিন্ন পেশায়। যদিও এবারের রমজান মাসে ব্যবসার খরা কিছুটা কাটতে শুরু করেছে দর্জিপাড়ায়।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের ফোর স্টার মার্কেটের ন্যাশনাল টেইলার্সের মাস্টার মো: শহীদ মিয়া জানান, প্রায় চার দশক ধরে দর্জি পেশায় আছেন তিনি। বছর তিনেক ধরে তাদের দোকানে কাজ কমেছে। এখনকার গ্রাহকরা তৈরি পোশাকের দিকে বেশী ঝুঁকছেন। এর কারণ হলো দর্জিরা গ্রাহকদের চাহিদা মতো আধুনিক ডিজাইনের পোশাক বানাতে পারছেন না। কিংবা বানাতে গেলে খরচ পড়বে বেশি। যা গ্রাহকরা দিতে চাইবেন না। ফলে দোকানে দর্জির কাজ কমে গেছে। শহীদ মিয়া নামে এক দোকানী বলেন, একটা সময় প্রতি মাসে এক থেকে দেড় লাখ টাকার কাপড় সেলাইয়ের অর্ডার আসতো।যার বেশির ভাগই ছিল ছেলেদের শার্ট ও প্যান্ট সেলাইয়ের কাজ। তবে বর্তমানে দোকানে অর্ডার আসছে ৭০ থেকে ৮০ হাজার টাকার। খরচ মিটিয়ে ভালো মুনাফা হচ্ছে না। আগে ১২ জন কারিগর ছিল দোকানে। এখন কাজ কম থাকার কারনে দোকানে কারিগর আছে মাত্র পাঁচজন।
নাইন টেইলার্সের কারিগর জুম্মান মিয়া জানান, শার্ট সেলাইয়ের জন্য ৪০০ টাকা রাখা হয়। অথচ এ দামে দোকানেই শার্ট পাওয়া যায়। ফলে শার্ট সেলাই দিন-দিন কমে যাচ্ছে। এছাড়া স্যুট সেলাইয়ের যা মূল্য, তার চেয়ে কম দামে এখন তৈরি স্যুট বা ব্লেজার কিনতে পাওয়া যায়। এসব কারণে দর্জি কারিগরদের কাজ কমেছে। ফলে অনেকেই পেশা বদল করছেন; কেউ আবার পাড়ি জমাচ্ছেন প্রবাসে। তবে চাহিদার বিবেচনায় এখন সারাবছরই জমজমাট থাকে তৈরি পোশাকের ব্যবসা। জেলা শহরের সাথে পাল্লা দিয়ে উপজেলা শহরগুলোতেও গড়ে উঠছে বিপণী বিতান। শুধুমাত্র জেলা শহরেই বড় বিপণী বিতান আছে পাঁচটিরও বেশি। ঢাকার বিভিন্ন নামী ব্র্যান্ডগুলো শো-রুম খুলেছে শহরের বিপণী বিতানগুলোতে। জেলা শহরে ১০টিরও বেশি ব্র্যান্ডের শো-রুম আছে। এসব শো-রুম থেকে তরুণ-তরুণীরাই সবচেয়ে বেশি পোশাক কিনছেন। আতিকুর রহমান নামে এক তরুণ জানান, দর্জিরা এখনও পুরনো সেই ডিজাইনের পোশাক সেলাই করেন। কোনো নতুনত্ব নেই। অথচ যুগের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেকে ভিন্নভাবে উপস্থাপনে আধুনিক পোশাকের কোনো বিকল্প নেই। দাম কিছুটা বেশি হলেও তৈরি পোশাকের ব্র্যান্ডশপগুলোতে নিজের পছন্দ অনুযায়ী আধুনিক ডিজাইনের পোশাক পাওয়া যাচ্ছে। এজন্যই দর্জি দোকান থেকে মুখ ফিরিয়ে তৈরি পোশাকে আকৃষ্ট হচ্ছেন বলে জানান তিনি।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের এফএ টাওয়ারের ডিমান্ড ফ্যাশন হাউজের শাখা কোষাধ্যক্ষ আব্দুল মামুন জানান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় দিন দিন ব্র্যান্ডের পোশাকের চাহিদা বাড়ছে। বিশেষ করে তরুণ প্রজন্ম ব্র্যান্ডের পোশাক খুঁজেন। ক্রেতাদের আকৃষ্ট করতে ব্র্যান্ডগুলোও বিভিন্ন অফার দিচ্ছে। আসন্ন ঈদুল ফিতরকে কেন্দ্র করে তৈরি পোশাকের বাজার এখন চাঙা বলে তিনি জানান। এ’ব্যাপারে ব্রাহ্মণবাড়িয়া শহরের সিটি সেন্টারের ব্যবসায়ী সমিতির উপদেষ্টা ও স্বপ্নলোক ফ্যাশন হাউজের স্বত্বাধিকারী আসিফ ইকবাল খান বলেন, ঢাকার নামী ব্র্যান্ডশপগুলো ব্রাহ্মণবাড়িয়া আসার কারণে গত কয়েক বছরে তৈরি পোশাকের চাহিদা বেড়েছে। এর ফলে সবকটি ব্র্যান্ডশপের মালিকরা ভালো ব্যবসা করছে। বিশেষ করে ছেলেদের পোশাক কেনাবেচা বেশি হয়। চাহিদা বিবেচনায় নতুন আরও অনেক ব্র্যান্ডশপ আসার প্রস্তুতি নিচ্ছে।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার তৈরি পোশাকের দোকানগুলোতে প্রতি মাসে গড়ে ২০কোটি টাকার বেশি তৈরি পোশাক বিক্রি হচ্ছে। ঈদসহ বিভিন্ন উৎসবের সময় বিক্রি বেড়ে দ্বিগুণ হয়। তবে চলমান অর্থনৈতিক মন্দার আচ লেগেছে তৈরি পোশাকের ব্যবসাতেও। তবুও আমরা আশা করছি হয়তো আসন্ন ঈদুল ফিতর উপলক্ষে ব্যবসা আবার চাঙা হয়ে উঠবে। আর চাঙা হয়ে ওঠার পাশাপাশি দোকানের লাভ ও বাড়বে বলে আমরা আশাবাদী।
ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিউজ ডেস্ক। বিডি টাইমস নিউজ





























