
‘ও মন রমজানের ওই রোজার শেষে এলো খুশির ঈদ…’ দীর্ঘ সিয়াম সাধনার পর সকলে অপেক্ষায় থাকে ঈদের সকালের। সূর্যের কাঁচা রোদ গায়ে মেখে শুরু হয় কলরব। চারিদিকে হুল্লোড়, আনন্দ, হাসির ঝলক। এরই মাঝে কোথাও যেন শূন্যতা!
অসহায়, পথশিশু ও ছিন্নমূল মানুষের দুয়ারে ঈদ আসে আর দশদিনের মতোই অতি সাধারণ রূপে। তবে, সেই সাধারণ রূপকে অসাধারণ আভায় রূপান্তরিত করা হয় নোয়াখালীর চৌমুহনী রেল স্টেশনের লঙ্গরখানায়। ‘আমরা গোলাপ’- এর উদ্যোগে গত বছর শুরু হওয়া লঙ্গরখানায় এবারও ছিল অসহায়, পথশিশু ও ছিন্নমূলদের জন্য দিনব্যাপী বিশেষ আয়োজন। রমজানজুড়ে ‘মানবিক ইফতার’ প্রদানের পর ঈদের সকালের এমন আভিজাত্য দেখে প্রফুল্ল হয়ে ওঠে মানুষগুলোর মন। সাথে ‘সার্ভিস ফর হিউম্যান বিয়িং অর্গানাইজেশন’- এর স্বেচ্ছাসেবকদের আন্তরিক আতিথেয়তায় সিক্ত হয় তারা। করোনার দ্বিতীয় ধাপের প্রবল সংকটময় সময়কে পাশ কাটিয়ে স্বাস্থ্যবিধি মেনে দিনব্যাপী চলে ‘ঈদ ফেস্টিভ্যাল উইথ স্ট্রিট চিলড্রেন। মিষ্টান্ন ছাড়া ঈদের সকাল পূর্ণতা পায় না। ঈদ আনন্দ মেলার শুরু হয় সকাল ৯টায়, ‘মিষ্টিমুখ’ করার মধ্য দিয়ে। এসময় সেমাই, জর্দা, নুডলস ও বাহারি ফলের সমাহারে মৌ মৌ ঘ্রাণ ছড়িয়ে পড়ে। সেই সুবাসে আরেকটুখানি রঙ এনে দেয় ‘সাজঘর’। সকাল ১০টায় সাজঘর উদ্বোধন করার পর টেবিলে সাজানো কসমেটিকস সামগ্রী নিয়ে পথশিশুরা চলে যায় বিউটিশিয়ান আপুদের কাছে। এত আগ্রহ নিয়ে ওদের সাজতে দেখে মনে পড়ে পুরনো আপ্তবাক্য, ‘কালো আর ধলো বাহিরে কেবল, ভেতরে সবারই সমান রাঙা’।
বেলা গড়িয়ে ১১টায় চালু হয় ‘খেলনা ঘর’। প্ল্যাটফর্মে বসানো হরেক রকম খেলনার স্টল দেখে সবার মন যেন ছুটে যায় শৈশবে। পথশিশুরা ইচ্ছেমতো খেলনা সামগ্রী ফ্রিতে নেয় স্টলগুলো থেকে। বেড়ে ওঠার সময়টাতে নেচে, গেয়ে দিন কাটে। ঈদের দিনে বাদ থাকবে কেন তা? নোয়াখালী ব্যান্ড অ্যাসোসিয়েশনের সৌজন্যে স্থানীয় ব্যান্ড শিল্পীরা নাচ-গানে মুখর করে তোলেন চৌমুহনী রেল স্টেশন। প্রাণের স্পন্দনে উচ্ছ¡সিত হয় প্রত্যেকে। ‘অ্যাকুয়াস্টিক ইদ আড্ডা’-য় গান গায় পথশিশুরাও। নাচে গানে রেলওয়ে প্ল্যাটফর্ম ক্ষণিকের জন্য রূপ নেয় অসাধারণ এক শিশু পার্কে। সকাল থেকে নানান আয়োজনে মনের ক্ষিদে মিটলেও পেটের ইঁদুর দৌঁড়াতে শুরু করে বেলা গড়াবার সঙ্গে। দুপুর ২টায় লঙ্গরখানায় শুরু হয় বিয়ে বাড়ির খাবারের আয়োজন। গরু, খাশি, মুরগি, ডিম, সবজি, ডাল, চাটনি, ভর্তা, কোক, কি নেই এই আয়োজনে? দেরি না করে একসঙ্গে খেতে বসে পথশিশু, ভাসমান ও ছিন্নমূল মানুষ, স্বেচ্ছাসেবী ও আগত অতিথিরা।
আয়োজনের উদ্যোক্তা ও সমন্বয়ক মুনীম ফয়সাল জানান- ‘আমরা চেয়েছি এই মানুষগুলো যেন অন্তত একদিন নিজেদের ভাসমান মনে না করে। অন্তত একদিন তাদের সবটুকু চাওয়া পূরণ করতে। সবটা হয়তো পারিনি, যতটুকু পেরেছি তার শুকরিয়া আদায় করছি। ধন্যবাদ জানাচ্ছি আমাদের অর্থ ও পরামর্শদাতাদের।
এবার দারুণ একটা টিম পেয়েছি, সেবা অন্তঃপ্রাণ কিছু স্বেচ্ছাসেবী পেয়েছি, যা আমাদের আশাবাদী করেছে। সামনের দিনগুলোতে মানবিক কাজে আরো স্বাচ্ছন্দ্য আসবে।’ আমরা গোলাপ মুখপাত্র সাখাওয়াত রাসেল জানান- ‘কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে গতবারের মতো এবারও আয়োজন সফলভাবে শেষ করতে পেরে তৃপ্তি বোধ করছি। সবার সহযোগিতা থাকলে ভবিষ্যতেও এমন আয়োজন অব্যাহত থাকবে। এসময় অন্যান্যদের মাঝে উপস্থিত ছিলেন আয়োজনের সদস্য সচিব মাঈন উদ্দিন, যুগ্ম আহবায়ক রবিউল জামান মুন্সি, এসএইচবিও’র সভাপতি, আবদুর রাজ্জাক রাসেল, সাধারণ সম্পাদক ফাহিদা সুলতানা, সাংগঠনিক সম্পাদক আল আমিন চৌধুরী রাফসান, ফখরুল ইসলাম অর্নব, মোঃ অন্তর, মাহমুদ শিবলুসহ আমরা গোলাপ ও এসএইচবিও’র সদস্যরা। ভাসমান এই মানুষেরা অল্পতে তুষ্ট হতে জানে। সেখানে দিনভর আয়োজনে চওড়া হয় ঠোঁটের হাসি। তাদের হাসিমুখকে সঙ্গী করে বিকাল ৪টায় পথশিশুদের সাথে ইদ উৎসবের মধুরেণ সমাপয়েৎ ঘোষণা করেন আয়োজকরা।

নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ



























