রেজা মাহমুদ, নীলফামারী জেলা প্রতিনিধি।। স্থানীয় দ্বন্দের কারনে নীলফামারীর সৈয়দপুরে প্রতিষ্ঠিত দেশের প্রথম বিশ্বের একমাত্র ফাইলেরিয়া হাসপাতালের অবস্থা এখন মুমূর্ষু। মূলত ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগীদের জন্য উপজেলার কামারপুকুর ইউনিয়নে ধলাগাছে প্রতিষ্ঠা করা হয় হাসপাতালটি।

জানা যায়, প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ও প্রকল্প পরিচালক ডা. মোয়াজ্জেম হোসেনের ঐকান্তিক প্রচেষ্টায় জাপান সরকারের অর্থায়নে উপজেলার উল্লেখিত এলাকাতে ৭০ শতাংশ জমির ওপর হাসপাতালটি গড়ে তোলেন। এরপর অপারেশন থিয়েটার, প্যাথলজি বিভাগ ও ১০টি বেড নিয়ে ২০০২ সালে হাসপাতালটি যাত্রা শুরু করে। পরবর্তীতে ডা. মোয়াজ্জেম হোসেন ঢাকার সাভারে অনুরূপ একটি হাসপাতাল গড়ে তোলেন। এতে শুরু হয় স্থানীয় দন্ধ, এর ফলে হাসপাতালটি পরিচালনার জন্য গঠন করা হয় একটি কমিটি। এই কমিটি পল্লী চিকিৎসক সুরত আলীর পরিচালনা হাসপাতালটি পরিচালনা করছে। সেখানে বর্তমানে এমবিবিএস ডিগ্রীধারী ডা. রায়হান তারেক এবং সহকারী কমিউনিটি মেডিকেল (স্যাকমো) ডিগ্রীধারী ডা. রেজাউল করিমসহ ১৫ জন কর্মকর্তা-কর্মচারী দায়িত্ব পালন করছেন। কিন্তু আর্থিক সঙ্কটের কারণে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা নিয়মিত বেতন-ভাতা পাচ্ছেন না।

ডাক্তার, নার্সসহ প্রয়োজনীয় ওষুধ না থাকায় ফাইলেয়িরা রোগির পাশাপাশি সাধারণ রোগিদের চিকিৎসা দেওয়া প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়েছে। আউটডোরে রোগী ও একটি অ্যাম্বুলেন্সের উপার্জিত আয়ে হাসপাতালটি কোনো রকম চলছে। সরকারিভাবে হাসপাতালে ফাইলেরিয়া ও ক্রিমির ওষুধ সরবরাহ করা হলেও অন্যান্য ওষুধের অভাবে ব্যাহত হচ্ছে চিকিৎসা সেবা।

উত্তর জনপদের পঞ্চগড়, ঠাকুরগাঁও, লালমনিরহাট, দিনাজপুর, রংপুর, নীলফামারী, কুড়িগ্রাম, গাইবান্ধা, বগুড়া জেলায় এ রোগ সবচেয়ে বেশি দেখা যায়। যেখানে শতকরা ২০ ভাগ লোক এই রোগের জীবানু বহন করছেন। এছাড়া নবাবগঞ্জ, রাজশাহী, কুষ্টিয়া, মেহেরপুর, ঝিনাইদহ, গাজীপুর, ঢাকা, নারায়ণগঞ্জ, ময়মনসিংহ, গোপালগঞ্জ, বাগেরহাট, বরিশাল, পটুয়াখালী, বরগুনা, পাবনা, মুন্সিগঞ্জ, পিরোজপুর, ঝালকাঠি, লক্ষ্মীপুর, ফেনীসহ ৩২টি জেলা ফাইলেরিয়া অধ্যূষিত জেলা হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে।

ফাইলেরিয়া বা গোদ একটি বড়া স্বাস্থ্য সমস্যা। বিশেষ করে নারীরা এ রোগের কারণে সমাজে নানাভাবে হচ্ছে উপেক্ষিত। হাসপাতালে ভর্তি হওয়া রংপুরের স্টেশন এলাকার নওশাদের মেয়ে আছিয়া খাতুন(১৪) জানায়, ফাইলেরিয়ার কারণে সে চলাফেরা করতে পারছিল না। তার এক দূর সম্পর্কের মামার পরামর্শে সে হাসপাতালে ১১ দিন আগে ভর্তি হয়। কয়েক দিনের চিকিৎসায় সে এখন নিজেই চলাফেরা করতে পারে। আরেক রোগী রংপুরের বদরগঞ্জের ইয়াকুব আলীর স্ত্রী মরিয়ম খাতুন (৪৫) জানান, এ হাসপাতাল থেকে চিকিৎসা নিয়ে বর্তমানে তিনি সুস্থ। কিন্তু আমার এলাকার এক প্রতিবেশী রাজিয়া বেগম (৪৩)কে হাসপাতালে চিকিৎসার জন্য নিয়ে আসলে সেখানে ডাক্তার না থাকায় আমাদের চিকিৎসা দেয়া হয়নি।

হাসপাতাল কমিটির অন্যতম সদস্য ও তত্বাবধায় ডা. সুরত আলী জানান, অপুষ্টি, দারিদ্রতা, সামাজিক অবস্থান, কুসংস্কার, অশিক্ষা, বসতবাড়ির নোংরা পরিবেশ, ঘন বসতিসহ নানা কারণে ফাইলেরিয়া রোগীর সংখ্যা বাড়ছে। ফাইলেরিয়া আক্রান্ত রোগীরা আস্তে আস্তে পঙ্গু হয়ে যায়। ফলে তারা সমাজ ও পরিবারের বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। তাই এ রোগের চিকিৎসা ছাড়া কোনো বিকল্প নেই।

হাসপাতালের আবাসিক মেডিকেল অফিসার (আরএমও) ডা. রায়হান তারেক জানান, প্রতিদিন আউটডোরে ৩৫/৪০ জন রোগী আসেন। শীতকালে ফাইলেরিয়া বা গোদ রোগিরা একটু আরামে থাকলেও গরমে প্রচন্ড জ্বালাপোড়া ও ঘা পাঁচড়া নিয়ে হাসপাতালে আসেন। ফাইলেরিয়ার পর্যাপ্ত ওষুধ সরকারিভাবে বরাদ্দ দেওয়ায় সঠিকভাবে চিকিৎসাসেবা দেওয়া সম্ভব হচ্ছে। তিনি আরও জানান, সরকারের উদ্যোগে হাসপাতালটিতে সাধারণ চিকিৎসাসেবা চালু করা হলে এই জনপদের মানুষ উপকৃত হবেন।

রেজা মাহমুদ, নীলফামারী জেলা
নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে