বাংলাদেশে করোনাভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা এক লাখ ছাড়িয়েছে। সংক্রমণের ১০৩ দিনের মাথায় লাখ শনাক্তের মাইল ফলক স্পর্শ করলো বাংলাদেশ। দেশে করোনাভাইরাসের প্রকোপ শুরুর পর প্রথম ৫০ হাজার রোগী শনাক্ত হয়েছিল ৮৭ দিনের মাথায়, এরপর তা লাখে পৌঁছাতে সময় লেগেছে মাত্র ১৬ দিন। দেশে শনাক্ত প্রথম ১০ হাজারে পৌঁছাতে সময় লাগে ৫৮ দিন, সেখানে ৯০ হাজার থেকে এক লাখে পৌঁছাতে সময় লাগে মাত্র তিন দিন। দেশে প্রথম করোনা রোগী শনাক্ত হয় গত ৮ মার্চ। এর ১০ দিনের মাথায় গত ১৮ মার্চ প্রথম মৃত্যু হয়। আর ১০৩ তম দিনে এসে এই সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ১ হাজার ৩৪৩ জনে।
শনাক্ত ও মৃত্যুর এই ঊর্ধ্বমুখী পরিসংখ্যান দেখেই বোঝা যায় কতটা ঝুঁকিতে বাংলাদেশ। ওয়ার্ল্ডোমিটারের হিসাব অনুযায়ী ১ লাখ ২ হাজারের বেশি শনাক্ত রোগী নিয়ে আক্রান্তের সংখ্যা বিশ্বের শীর্ষ দেশগুলোর তালিকায় ১৭ নম্বরে চলে এসেছে বাংলাদেশ। প্রায় ১ লাখ ২০ হাজার মৃত্যু নিয়ে বিশ্বে প্রথম অবস্থানে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর রয়েছে ব্রাজিল ও রাশিয়া। চতুর্থ স্থানে রয়েছে ভারত। আর করোনার উৎসভূমি চীনের অবস্থান ২০তম।
আইইডিসিআর এর তথ্য অনুযায়ী, গত ৮ মার্চ দেশে প্রথমবারের মতো একইসঙ্গে তিনজন করোনা আক্রান্ত রোগী শনাক্ত হয়। তার ঠিক দুইমাস অর্থাৎ ৬০ দিনের মাথায় গত ৬ মে শনাক্ত হন ৭৯০ জন আর মারা যান তিনজন। সেদিন পর্যন্ত এটাই ছিল দেশে একদিনে সর্বোচ্চ শনাক্ত হওয়া রোগী সংখ্যা। সেদিন পর্যন্ত মোট রোগী শনাক্ত হন ১১ হাজার ৭২৯ জন, মারা যান ১৮৬ জন। এবং সুস্থ হন এক হাজার ৪০২ জন। যদিও সেটা অবশ্য মোট করোনা আক্রান্তের সংখ্যা প্রথম ৬০ দিনের হিসেবে বিশ্বের অন্যান্য সর্বাধিক সংক্রমিত দেশের তুলনাতে বেশি। ৬০ দিনে বাংলাদেশে করোনা রোগী সংক্রমণের সংখ্যা ওই একইসময় বিবেচনা করলে যুক্তরাজ্য ও রাশিয়ার চেয়ে বেশি এবং প্রায় যুক্তরাষ্ট্রের কাছাকাছি পৌঁছে যায়। ওয়াল্ডোমিটারের হিসেব মতো, প্রথম ৬০ দিনে যুক্তরাষ্ট্রে করোনা ভাইরাসে আক্রান্ত রোগীর সংখ্যা ছিল ১৩ হাজার ৮৯৮ জন, আর যুক্তরাজ্য এবং রাশিয়াতে ছিল যথাক্রমে আট হাজার ৭৭ ও এক হাজার ৮৩৬ জন।
সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণের চেষ্টায় বাংলাদেশে দুই মাসের বেশি সময় লকডাউনের পর বিধিনিষেধ তুলে নেয়া হয়েছিল গত ৩১ মে। এর পরের ১৮ দিনে ৫৫ হাজারের বেশি রোগী শনাক্তের তথ্য দিয়েছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তর, যা মোট শনাক্তের অর্ধেকের বেশি। ৩১ মে সাধারণ ছুটি শেষ হওয়ার কিছু দিন আগে ঈদ সামনে রেখে বিধি-নিষেধ শিথিল করে বিপণি বিতান ও দোকানপাট খুলতে শুরু করার পর বাড়তে থাকে সংক্রমণ। ১’লা জুন থেকে অফিসের পাশাপাশি গণপরিবহনও চালু হওয়ার পর প্রায় প্রতিদিনই করোনাভাইরাস আক্রান্ত রোগী শনাক্ত ও এতে মৃত্যুর রেকর্ড হচ্ছে বাংলাদেশে। এই কয়েক দিনে মৃত্যুও বেড়েছে কয়েক গুণ।
করোনায় আক্রান্ত শীর্ষ ৪০ দেশের মধ্যে ২৫টি দেশ এরই মধ্যে সর্বোচ্চ সংক্রমণকাল (পিকটাইম) অতিক্রম করে ফেলেছে। অথচ বাংলাদেশসহ বাকি ১৫টি দেশে দৈনিক সংক্রমণের হার এখনো বাড়ছে। সংক্রমণের হিসাবে ২০টি ঊর্ধ্বমুখী দেশের মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান ১৪ নম্বরে এবং মৃত্যুহারে ১৭তম। এর মধ্যে সর্বোচ্চ মৃত্যুহার ফ্রান্সে ১৫ দশমিক ২০ ও সর্বনিম্ন সৌদি আরবে শূন্য দশমিক ৭৪ এবং বাংলাদেশে ১ দশমিক ৩৪ শতাংশ। আবার সংক্রমণের শীর্ষ ২০ দেশের মধ্যে করোনার নমুনা পরীক্ষার ক্ষেত্রে সবচেয়ে পিছিয়ে দুই দেশের একটি বাংলাদেশ। বাংলাদেশে প্রতি ১০ লাখ মানুষের মধ্যে গড়ে ২ হাজার ৮৭৬ জনের করোনা (কভিড-১৯) শনাক্তকরণের পরীক্ষা হচ্ছে। বাংলাদেশের চেয়ে কম পরীক্ষা হচ্ছে মেক্সিকোতে। আর দক্ষিণ এশিয়ার আটটি দেশের মধ্যে তুলনা করলে বাংলাদেশের চেয়ে কম পরীক্ষা হচ্ছে শুধু আফগানিস্তানে।
বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার তথ্য অনুযায়ী, গত এক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি নতুন রোগী শনাক্ত হওয়া দেশগুলোর মধ্যে বাংলাদেশের অবস্থান দশম। এই ১০টি দেশের মধ্যেও দ্বিতীয় সর্বনিম্ন পরীক্ষা হচ্ছে বাংলাদেশ। এখানেও সবচেয়ে কম পরীক্ষা হচ্ছে অষ্টম স্থানে থাকা মেক্সিকোতে। সংক্রমণের দিক থেকে বাংলাদেশের ঠিক পরেই ২০তম স্থানে থাকা কাতারে প্রতি ১০ লাখে ৯৯ হাজার ৯৫৯ পরীক্ষা হচ্ছে।
সাধারণ ছুটিতেও ভাইরাসের প্রকোপ না কমায় এখন এলাকাভিত্তিক লকডাউনের মতো ব্যবস্থায় এগোচ্ছে সরকার। কয়েকটি স্থানে এরই মধ্যে লকডাউন কার্যকর হচ্ছে। আরো বেশ কয়েকটি এলাকা লকডাউনের আওতায় আনার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে সাধারণ ছুটি কিংবা লকডাউন কোনো কিছুই যে করোনার বিস্তার ঠেকাতে কার্যকরী হচ্ছে না তা ফুটে উঠছে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দৈনিক শনাক্ত ও মৃত্যুর প্রতিবেদনে।
লকডাউনের ব্যাপারে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জোন ভাগাভাগি হয়ে গেছে। লকডাউন করতে চাইলে দ্রুত করতে হবে। সময় যেন নষ্ট না করা হয়। লকডাউন এলাকায় রোগীগুলোকে শনাক্ত করতে হবে, আইসোলেট ও কোয়ারেন্টাইন করতে হবে। চিকিৎসা করতে হবে। সব রোগীকে আরোগ্য করতে হবে। লকডাউন শেষে যেন ভেতরে কোনো সংক্রমিত রোগী না থাকে। এটা নিশ্চিত করতে হবে।
শততম দিন পেরিয়ে করোনা নিয়ন্ত্রণে দেশের মানুষকে সুখবর দেয়ার মতো কিছু নেই বলে মনে করেন বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া অঞ্চলের সাবেক উপদেষ্টা অধ্যাপক ডা. মোজাহেরুল হক। তিনি গণমাধ্যমকে বলেন, আমাদের আত্মতৃপ্তির কিছু নেই। জনগণকে ভালো কোনো সুসংবাদ দেয়ারও কিছু নেই। বরং জনগণকে সতর্ক করতে পারি যে, সামনে আমাদের আরও কঠিন দিন অতিক্রম করতে হবে। আরো মৃত্যু সংবাদ শুনতে হবে।
নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ





























