ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতাঃ ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ উপজেলায় মেঘনার বুকে জেগে ওঠা চরসোনারামপুরের শিক্ষার্থীরা দিনের বেলায় শুধুমাত্র সূর্যের আলো ব্যবহার করেই তাদের পড়াশুনা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও অদূরে ২৩০ কিলোভোল্ট ক্ষমতাসম্পন্ন বিদ্যুৎ সন্চালন লাইন রয়েছে, তবে চরের শিক্ষার্থীরা রাতে তেলের প্রদীপ ব্যবহার করে পড়াশুনাসহ প্রাত্যাহিক কাজ সেরে নেয়। ব্যয়বহুল তেল সংরক্ষণের জন্য তারা অধ্যয়নের জন্য দিনের আলো বেছে নেয় বলে এক ছাত্রী জানায়।
চর সোনারামপুরের বাসিন্দা এবং স্কুলের শিক্ষক শিপনচন্দ্র দাস এই প্রতিবেদককে জানান যে তারা বিদ্যুৎ প্ল্যান্ট থেকে বিদ্যুৎ পায় না এবং বিদ্যুতের অভাবে তাদের কষ্ট সীমাহীন। তবে বিদ্যুৎ বিভাগ বলেছে বিভিন্ন জটিলতার কারণে চর সোনারামপুর বিদ্যুৎ সরবরাহ করা সম্ভব নয়। আশুগঞ্জ থেকে আধা কিলোমিটার দূরবর্তী চর সোনারামপুর, মেঘনা নদীর একটি ক্ষুদ্র দ্বীপ।বর্তমানে প্রায় ৩০০০ মানুষ এই দ্বীপে বসবাস করে। অধিকাংশ মানুষ দরিদ্র এবং মাছ ধরার পেশাতে নিযুক্ত। দ্বীপে কিছু সৌর প্যানেল আছে কিন্তু এতে রাতে কাজ করা প্রায় অসম্ভব।স্বচ্ছল পরিবারের পক্ষে সৌর প্যানেলের ব্যবস্থা থাকলেও অস্বচ্ছল পরিবারের খুব কম ছাত্র সৌর প্যানেলের আলোতে অধ্যয়ন করতে পারেন। কিন্তু যাদের এই ধরনের সুযোগ-সুবিধা নেই তাদের দিনের কাজ সূর্যের আলো ব্যবহার করে কাজগুলি সম্পন্ন করতে হয়।দ্বীপের বাসিন্দা পারিমল চন্দ্র বর্মণ জানান চরবাসী এখন শিক্ষার গুরুত্ব বুঝতে পেরেছে এবং তাই তারা তাদের সন্তানদের স্কুলে পাঠাতে আগ্রহী।শিক্ষার দ্যুতি ছড়াতে চর সোনারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সাক্ষরতার হারও অতীতের চেয়ে বেশি বেড়েছে। কিন্তু বিদ্যুতের অভাবে দরিদ্র শিশুদের শিক্ষা বাধাগ্রস্থ হচ্ছে।
চর সোনারামপুর সরকারী প্রাথমিক বিদ্যালয়ের বেশ কয়েকজন শিক্ষক বলেন, ছেলে ও মেয়েরা স্কুলে পড়াশুনা করে। তারা আধুনিক জ্ঞান অর্জনে গভীর আগ্রহী। কিন্তু অভাবের কারণে বিদ্যালয়ে তাদের অধ্যয়ন নিদারুন ভাবে ব্যাহত হয এবং এই কারণেই তাদের উচ্চ শিক্ষার জন্য প্রাথমিক শিক্ষা সম্পূর্ণ করা কঠিন।স্থানীয় সংসদ সদস্য উকিল আব্দুস সাত্তার ভূইয়া জানান, দ্বীপে বিদ্যুৎ পৌঁছাতে টাওয়ার ইনস্টল করা কঠিন। কিন্তু প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট বিভাগ চরবাসীদেরকে বিদ্যুৎ সরবরাহের চেষ্টা করছে।বিদ্যুৎ বিভাগ সুত্রে জানা যায়, চর সোনারামপুরের বাসিন্দাদের বিদ্যুৎ সরবরাহ করা অত্যন্ত ব্যয়বহুল। তবে, তিনি নিশ্চিত করেছেন যে তারা চরের লোকেদের বিদ্যুৎ সরবরাহের বিকল্প উপায় খুঁজতে চেষ্টা করছেন।
ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের সরকারি-বেসরকারি ১১টি ইউনিট থেকে গড়ে প্রতিদিন প্রায় দেড় হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ যুক্ত হচ্ছে জাতীয় গ্রিডে। এর ফলে দেশের বৃহত্তম বিদ্যুৎ উৎপাদন কেন্দ্র এই আশুগঞ্জ।
চরটির পূর্বে বিদ্যুৎ নগরী আশুগঞ্জ,পশ্চিমে কিশোরগঞ্জের ভৈরব,দক্ষিণে মাথার ওপর দিয়ে উভয় জনপদের সংযোগকারী সৈয়দ নজরুল ইসলাম সেতু এবং উত্তরে চরের বুক চিরে রয়েছে জাতীয় গ্রিডে বিদ্যুৎ সরবরাহের ২৩০ কেভির বিশাল টাওয়ার। পশ্চিম আকাশে দিনের আলো মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই চরের সর্বোচ্চ এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে জ্বলে ওঠে হাজার হাজার বৈদ্যুতিক বাতি। তবুও বিদ্যুৎ সুবিধা থেকে বঞ্চিত এ চরের মানুষ।
সরজমিনে গিয়ে জানা যায়, প্রায় একশ বছর আগে আশুগঞ্জ উপজেলার মেঘনা নদীর বুকে জেগে ওঠে একটি চর। আশুগঞ্জ সদর ইউনিয়নের অন্তর্ভুক্ত সেই চরের নামকরণ করা হয় চরসোনারামপুর। এরপর বিভিন্ন স্থান থেকে আসা মানুষজন বসতি গড়েন চরসোনারামপুরে। ৪০ বছরেরও বেশি সময় ধরে চরের এই গ্রামে মানুষ বসবাস করে আসছে।
বর্তমানে হিন্দু-মুসলমান ধর্মালম্বী মিলিয়ে প্রায় তিন হাজার মানুষ বসবাস করেন এই চরটিতে। এর মধ্যে ভোটার রয়েছে প্রায় দেড় হাজার। চরের বেশির ভাগ মানুষ পেশায় জেলে। মেঘনা নদীতে মাছ ধরে সেই মাছ আশুগঞ্জ বাজারে নিয়ে বিক্রি করেই চলে তাদের
জীবন-জীবিকা। সম্প্রতি চরের বাসিন্দাদের অনেকেই আশুগঞ্জ বাজারে বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্যের সঙ্গে জড়িয়েছেন।
চরসোনারামপুর গ্রামের শিশুরাও এখন শিক্ষার আলোয় আলোকিত হচ্ছে। তাদের জন্য চরেই রয়েছে একটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়। তবে শিক্ষার আলো জ্বললেও যুগের পর যুগ ধরে চরের ঘরগুলো অন্ধকারের রয়েছে। এ নিয়েই এখানকার বাসিন্দাদের সব দুঃখ। আর ‘মরার ওপর খাঁড়ার ঘা’ হিসেবে বছরে পর বছর চরের ভাঙন তো রয়েছেই।
চরসোনারামপুর গ্রামের বাসিন্দা কাজল রায় বলেন,প্রায়৪০বছর আগে তিনি চরসোনারামপুর গ্রামে এসে বসতি গড়েছেন। মেঘনা নদীতে নৌকা চালিয়েই তার ছয় সদস্যের পরিবার চলে। চরে আসার পর থেকে একটাই দুঃখ তাদের বিদ্যুৎ না থাকা। বারবার আশা দিলেও আজ পর্যন্ত কোনো জনপ্রতিনিধিই তাদের এই হতাশা কাটাতে পারেনি।
চরসোনারামপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের পঞ্চম শ্রেণির শিক্ষার্থী প্রিয়া রাণী জানায়, দিনের বেলা খুব একটা সমস্যা না হলেও সন্ধ্যায় পড়তে বসলে কষ্ট করতে হয় তার। চার্জ না থাকার কারণে অধিকাংশ সময়ে সৌর বিদ্যুতের আলো না পেয়ে কুপি অথবা মোমবাতি জ্বালিয়ে পড়তে হয়।
দিপা রানী জানান,শীতকালে ঠিকমতো সূর্যের আলো না পাওয়ায় চার্জ কম হওয়ার কারণে সৌর বিদ্যুৎ বেশিক্ষণ চলে না। ঝড়-বৃষ্টিতে অনেক সময় দুই-তিনদিন চার্জও হয় না। তখন অন্ধকারেই থাকতে হয় আমাদের। দেশের কত নদী পার করে কত জায়গায় বিদ্যুৎ দেয়া হয়েছে অথচ আমরা বিদ্যুতের শহরে থেকেও নদীর কারণে বিদ্যুৎ পাই না।
আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ বিক্রয় ও বিতরণ বিভাগের নির্বাহী প্রকৌশলী মো.রিয়াজুল হক জানান,প্রাকৃতিক কারণেই এখানে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়া সম্ভব হচ্ছে না। তবে তিনি আরো জানান,সরকার ইনফ্রাস্টাকচার ডেভেলপমেন্ট কোম্পানী লিমিটেড এর (ইডকল) মাধ্যমে চরে সৌর বিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তিনি মনে করেন, সোলারের মাধ্যমে চরে বিদ্যুতায়ন করা সহজ হবে।এ ব্যাপরে জানতে চাইলে আশুগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী অফিসার মো: নাজিমুল হায়দার জানান,বিদ্যুৎ উৎপাদন জোন হিসেবে এ এলাকায় শতভাগ বিদ্যুতায়ন ন্যায়সঙ্গত দাবি। তবে সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ সে লক্ষ্যে কাজ করছে বলে তিনি জানান। তবে অন্ধকার কেটে আলোর মুখ দেখবে সে অপেক্ষায় দিন গুনছে এই চরবাসী।
এ ব্যাপারে জানতে চাইলে আশুগঞ্জ বিদ্যুৎ কেন্দ্রের উপসহকারী প্রকৌশলী জাফর আহমেদ বিডিটাইমসনিউজডটকম কে জানান, মামনীয় প্রধানমন্ত্রী মুজিব বর্ষের প্রারম্ভে চরসোনারামপুর ও ভোলার একটি চরে বিদুতায়নের জন্য তাগিদ প্রদান করেছেন, সেমতে দ্রুত চরসোনারমপুরে বিদুতায়নের কাজ শুরু হয়েছে। ইতিমধ্যে কলাবাগান ৩৩\১১ কেভি উপকেন্দ্র হতে ১৫ মিটার খুটি বসিয়ে বাশ বাজার পর্যন্ত ১১ কেভি লাইনের খুটি বসানো সম্পন্ন হয়েগেছে।কলাবাগান থেকে লাইন যাবে বাশবাজার পর্যন্ত,সেখান থেকে সাবমেরিন কেবলের মাধ্যমে নদী পার করা হবেএবং দ্রুত চরে ষ্টীল পোল দিয়ে লাইন নিমার্ণ কাজ শুরু হয়ে যাবে এপারের অংশের পোল বসানোর কাজ প্রায় শেষ, এখন চরের পোল বসানোর কাজ শুরু হচ্ছে।আশা করা যাচ্ছে শীঘ্রই চরসোনারামপুর বাসি বিদ্যুৎতের আলো দেখতে পাবে।
জহির সিকদার
নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ




























