জহির সিকদারঃ ভারতের ত্রিপুরা রাজ্যের উজান থেকে নেমে আসা হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়ায় বন্যা পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে। নতুন করে আরও কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। ভারি বর্ষণ ও ভারতের পাহাড়ি ঢলে ভারত সীমান্তবর্তী আখাউড়ার উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতির উদ্ভব হয় মঙ্গলবার রাত থেকে। বুধবার সন্ধ্যা নাগাদ ৩৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়। পানিবন্দি হয়ে পড়ে প্রায় সাড়ে পাঁচশ পরিবার। এ ছাড়াও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে ধানি জমি, শাকসবজির জমিসহ বিভিন্ন মাছের ঘের। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বৃহস্পতিবার (২২ আগস্ট) সকালে উপজেলার মনিয়ন্দ ইউনিয়নের ইটনা ও মোগড়া ইউনিয়নের খলাপাড়া এলাকায় হাওড়া নদীর বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন গ্রাম প্লাবিত হচ্ছে।

স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাত থেকে আখাউড়ায় ভারি বর্ষণ শুরু হয়। সকাল থেকে বন্দরের পাশ বয়ে যাওয়া খাল দিয়ে ভারত থেকে তীব্র বেগে পানি ঢুকতে থাকে। একপর্যায়ে স্থলবন্দর, বাউতলা, বীরচন্দ্রপুর, কালিকাপুর, বঙ্গেরচর, সাহেবনগরসহ অন্তত ৩৪টির বেশি গ্রামে পানি ঢুকে পড়ে। ভেঙে যায় গাজীরবাজার এলাকার অস্থায়ী সেতু। বন্ধ হয়ে পড়ে বন্দরের বাণিজ্য ও যাত্রী পারাপার। (ভেঙ্গে গেছে সোনাই নদীর পাড়,হুহু করে ঢুকছে পানি।) একইদিন খলাপাড়া এলাকায় হাওড়া নদীর বাধের কিছু অংশ ভেঙে পানি ঢুকতে শুরু করে। জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মনজুরুল আলম জানান, হাওড়া নদী ও জাজির খালসহ বিভিন্নস্থানে পানি বিপৎসীমার কাছাকাছি রয়েছে। তা অতিক্রম করলে আরেও নতুন এলাকা প্লাবিত হতে পারে। এর আগে ২০ আগষ্ট সীমান্ত এলাকায় জাজির খালের পানি বৃদ্ধি পাওয়ার কারণে আখাউড়া উপজেলার সীমান্তবর্তী বেশ কয়েকটি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে। উল্লেখ্য যে,গত মঙ্গলবার (২০ আগস্ট) সকালের দিকে উপজেলার মোগড়া ইউনিয়নের টানোয়াপাড়া গ্রামে দুটি জায়গায় হাওরা নদীর বাঁধ ভেঙেছে,ঢলের পানিতে তলিয়ে গেছে সব্জীক্ষেত, ফসলি জমি, ভেসে গেছে ১৫ থেকে ২০ টি পুকুরের মাছ। স্থানীয় সুত্রে জানা যায়  , আখাউড়া উপজেলার হাওড়া নদীর বাঁধ ভাঙার কারণে বাউতলা, উমেদপুর,নীলাখাত,নয়াদিল,টানোয়াপাড়া,নোয়াপাড়,নুনাসার,বচিয়ারা,ধাতুর পহেলা,কুসুম বাড়ি,আদমপুর সহ বেশ কয়েকটি গ্রামের নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হয়েছে এতে প্রায় ৭০ হেক্টর জমি পানির নিচে তলিয়ে গেছে,৮ থেকে ১০ টি ঘরের মানুষ পানিবন্দি রয়েছে।

এদিকে স্থলবন্দর এলাকার পাশ দিয়ে বয়ে চলা জাজির খাল দিয়ে ভারতীয় পাহাড়ি ঢলের পানি হু হু করে বাংলাদেশে প্রবেশ করছে। এতে করে উপজেলার সীমান্তঘেঁষা দক্ষিণ ইউনিয়নের কালিকাপুর, বঙ্গেরচর, সাহেব নগর এলাকায় নিম্নাঞ্চলের ১০ হেক্টর জমি প্লাবিত হয়েছিল। পানি বৃদ্ধি পাওয়ায় নতুন করে আরো কিছু গ্রাম প্লাবিত হয়েছে। গতকাল বুধবার (২১ আগস্ট) সন্ধ্যা নাগাদ ৩৪টি গ্রাম প্লাবিত হয়। আরো উল্লেখ্য যে, ভারতের পাহাড়ি ঢল ও ভারী বর্ষণে সীমান্তবর্তী ব্রাহ্মণবাড়িয়ার আখাউড়া উপজেলার নিম্নাঞ্চলের বন্যা পরিস্থিতি আরো অবনতি হয়েছে। আখাউড়া উপজেলার ছয়টি ইউনিয়ন ও কসবা উপজেলার একটি ইউনিয়ন প্লাবিত হয়েছে। পাশাপাশি আখাউড়ার খলাপাড়া এলাকায় হাওড়া নদীর দু’টি স্থানে বাঁধ ভেঙে নতুন নতুন এলাকা প্লাবিত হচ্ছে। এতে পানিবন্দী হয়ে পড়েছে অন্তত এক হাজার ২০০ পরিবার। বুধরাত রাত থেকে ঢলের পানি তীব্র গতিতে বিভিন্ন গ্রামে প্রবেশ করে। এতে আখাউড়া উত্তর, দক্ষিণ, মোগড়া ও মনিয়ন্দ, কসবা উপজেলার বায়েকসহ মোট সাতটি ইউনিয়নের ৪০টিরও বেশি গ্রামের বাসিন্দারা পানিবন্দী হয়ে পড়েছে। এছাড়াও পানির নিচে তলিয়ে গেছে পাঁচ হাজার ৪৭৬ হেক্টর ধানি জমি, ৭৫০ হেক্টর শাকসবজির জমি, ২০০ হেক্টর ধানের বীজতলাসহ বিভিন্ন মাছের ঘেড়। স্থানীয় ও প্রশাসন সূত্র জানায়, মঙ্গলবার রাত থেকে আখাউড়ায় ভারী বর্ষণ শুরু হয়। বুধবার সকাল থেকে বন্দরের পাশে বয়ে যাওয়া খালে ভারত থেকে তীব্র বেগে পানি ঢুকতে থাকে। একপর্যায়ে স্থলবন্দর, বাউতলা, বীরচন্দ্রপুর, কালিকাপুর, বঙ্গেরচর, সাহেবনগরসহ অন্তত ৩৪টির বেশি গ্রামে পানি ঢোকে। ভেঙে যায় গাজীরবাজার এলাকার অস্থায়ী সেতু। ফলে আখাউড়া স্থলবন্দরের রফতানি কার্যক্রম বন্ধের পাশাপাশি ইমিগ্রেশন চেকপোস্টে যাত্রী পারাপারও বন্ধ রয়েছে।

আখাউড়া উপজেলা কৃষি অফিসার তানিয়া তাবাসসুম বলেন, এক হাজার ৬৫০ হেক্টর কৃষি জমি পানিতে নিমজ্জিত হয়েছে। এর মধ্যে রুপা আপন এক হাজার ৬০০ হেক্টর। আখাউড়া উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) গাজালা পারভীন রুহী বলেন, পানিবন্দী মানুষকে আশ্রয়ের জন্য কয়েকটি প্রাইমারি ও হাইস্কুল প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ক্ষতিগ্রস্ত সেতু মেরামতের জন্য সড়ক ও জনপথ বিভাগকে খবর দেয়া হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা গাজালা পারভীন রুহি আরো  জানান, দুর্গতদের জন্য শুকনো খাবারের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ ছাড়াও জেলা প্রশাসন থেকে ত্রাণ বরাদ্দ পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দুর্গতদের মাঝে ২০ কেজি করে চাল দেওয়া হবে। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক সুশান্ত সাহা জানান, পাহাড়ি ঢলে ১৯৫ হেক্টর শাকসবজির জমি, ১২২ হেক্টর আমনের বীজতলা, ৩৪৪০ হেক্টর রোপা আমন ধানের জমি পানিতে নিচে তলিয়ে আছে। দ্রুত পানি সরে গেলে ক্ষয়ক্ষতির সম্ভাবনা কম। তবে পানি দীর্ঘস্থায়ী হলে ক্ষয়ক্ষতি বাড়তে পারে। এক সপ্তাহ পর ক্ষয়ক্ষতির চূড়ান্ত প্রতিবেদন তৈরি করা হবে। জেলা প্রশাসন মো: হাবিবুর রহমান জানান, এক হাজার ২০০ দুর্গত পরিবারের জন্য ১৫ টন চাল ও পাঁচ লাখ টাকা বরাদ্দ দেয়া হয়েছে। যা ইতোমধ্যে বিতরণ শুরু হয়েছে। এছাড়াও পানিবন্দী পরিবারগুলোকে সেনাবাহিনী, ফায়ার সার্ভিস ও স্বেচ্ছাসেবীদের সহায়তায় উদ্ধার করে আশ্রয় কেন্দ্রে আনা হচ্ছে।

জেলা পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী মো: মনজুর রহমান জানান, বিভিন্ন স্থান দিয়ে পানি বাড়ছে। সকালে হাওড়া নদীর দু’টি স্থানে বাঁধ ভেঙে যাওয়ায় নতুন করে কিছু এলাকা প্লাবিত হয়েছে। বন্যার পানি নেমে গেলে সেই বাঁধগুলোকে মেরামত করা হবে।

ব্রাহ্মণবাড়িয়া নিউজ ডেস্ক। বিডি টাইমস নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে