জহির সিকদার, ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা।।বাংলাদেশে বর্তমানে সরকার ঘোষিত ২৫ টি স্থল বন্দর রয়েছে। যার মধ্যে চালু রয়েছে ১৪ টি। সর্বশেষ স্থলবন্দরটি হলো মুজিবনগর স্থলবন্দর, এটি মেহেরপুরে অবস্থিত।বাংলাদেশের চালুকৃত স্থলবন্দর সমুহের মধ্যে আখাউড়া স্থলবন্দর দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর। যা থেকে  প্রতি বছর সরকার বিশাল অংকের রাজস্ব পেয়ে থাকে। আর সেই স্থলবন্দরটির অবস্থা দীর্ঘদিন  যাবত অবহেলিত। আধুনিক মানের করে ভবন গড়ে তুলতে  গেলেই বাধার সম্মুখীন হয় প্রতিপক্ষ দেশ ভারত থেকে। ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) এর বাধার মুখে বন্ধ হয়ে যাওয়া আখাউড়া আন্তর্জাতিক স্থলবন্দর চেকপোস্ট এলাকায় বাংলাদেশ পুলিশের ইমিগ্রেশন বহুতল ভবন নির্মাণ কাজ দীর্ঘ ৮ বছর পর  বৃহস্পতিবার (০৪ জুলাই) থেকে আবারও শুরু হয়েছে।

বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন ত্রিপুরায় নিযুক্ত বাংলাদেশ সহকারী হাইকমিশনার আরিফ মোহাম্মদ। তিনি জানান, চলতি বছরের মার্চ মাসে ভারতীয় সীমান্তরক্ষী বাহিনী (বিএসএফ) কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ (বিজিবি) কর্তৃপক্ষের উচ্চ পর্যায়ের রাষ্ট্রীয় সৌহার্দ্যপূর্ণ বৈঠকে সিদ্ধান্তের পর বৃহস্পতিবার সকাল থেকে আবারও পুরোদমে শুরু হয়েছে ইমিগ্রেশন ভবনের নির্মাণ কাজ। দফাং দফায় ভারতের বিএসএফের বাধার মুখে বন্ধ থাকা আখাউড়া ইমিগ্রেশন ভবনের নির্মন কাজ আবার শুরু হয়েছে। এটি চালু হলে যাত্রীরা যেমন উন্নত সেবা পাবেন,ঠিক তেমনী সময়ও বাচবে। স্থলপথে উত্তর পূর্ব ভারতের সঙ্গে বাংলাদেশের অন্যতম যোগাযোগ মাধ্যম আখাউড়া স্থলবন্দর। এ বন্দর পার হলেই ভারতের ত্রিপুরার আগরতলা শহর। যেখান থেকে দেশটির পর্যটন শহরগুলোতে রেল ও আকাশপথে সহজে যাতায়াত করা যায়। ভ্রমণব্যয় তুলনামুলক সাশ্রয়ী হওয়ায় দিনদিন আখাউড়া স্থলবন্দর ব্যবহারকারীর সংখ্যা বাড়ছে প্রতিনিয়ত। যার ফলে সরকারের রাজস্ব বাড়ছে।  আখাউড়া  স্থল শুল্ক ষ্টেশনের তথ্যমতে ২০২২ -২৩ অর্থ বছরে যাত্রী পারাপার হয় ২ লাখ ৬০ হাজার ৬৬ জন। এ সময় ভ্রমণ কর আদায় হয়েছিল ৭ কোটি ৮৫ লাখ ১৫ হাজার টাকা, আর সদ্য সমাপ্ত ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে এ বন্দর ব্যবহার করে যাত্রী পারাপার হয়েছে ২ লাখ ৫ হাজার১৯ জন। এতে করে সরকার ভ্রমণ কর হিসেবে রাজস্ব পেয়েছে ১৩ কোটি ৯১ লাখ ৫২ হাজার ৫০০ টাকা। ২০২৩-২৪ অর্থ বছরে ভ্রমণ কর ৫০০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ১০০০ টাকা করেছে।

ইমিগ্রেশন সুত্রে জানা যায়,আখাউড়া উপজেলার কালিকাপুর ও ভবানীপুর মৌজার ৩ একর ১০ শতাংশ জায়গায় আখাউড়া আন্তর্জাতিক ইমিগ্রেশন চেকপোষ্ট । সেখানে বিদ্যমান ভবনটি ১৯৫৩ সালে নির্মাণ করা। বর্তমানে চেকপোষ্টে একটি কার্য্যালয়,বারাক ভবন ও একটি রান্নাঘর আছে। ১৯৬৫-৬৬ সালে এই ভবনে ইমিগ্রেশন কার্য্যক্রম শুরু হয় । এরপর আর এখানে নতুন ভবন নির্মান করা হয়নী। ভবনটি এখন জরাজীর্ণ হয়ে পড়েছে। ২০১৬ সালে আখাউড়া নতুন ইমিগ্রেশন ভবনের নির্মাণ কাজের দরপত্র প্রক্রিয়া সম্পন্ন হয়। মেসার্স বিজনেস সিন্ডিকেট ইন্টারন্যাশনাল নামে একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে কার্য্যাদেশ দেওয়া হয়। ৬ কোটি ২৫ লাখ টাকা ব্যয়ে ৬ তলা ভিতের উপরে দুতলা ভবন নির্মানের চুক্তি হয়। ২০১৭ সালে নির্মান কাজের সামগ্রী নিয়ে জড়ো করে ঠিকাদারী প্রতিষ্ঠান। সীমান্তের শুন্যরেখা থেকে ১২০ গজ দূরত্বে আখাউড়া অভিবাসনের নতুন ভবনের নির্মন কাজ শুরু হয়। ২০১৬ সালের মার্চ মাসে ১ম দফায় ভবন নির্মানের ব্যাপারে বিএসএফ থেকে বাধা আসে। বিজিবির মাধ্যমে পাঠানো ঐ মৌখিক আপত্তিতে আন্তর্জাতিক সীমান্তের শুন্যরেখা থেকে ১৫০ গজের ভিতরে স্থাপনা নির্মানের বিধিনিষেদের কথা বলা হয়। এরপর ২০১৯ সালের ২৮ এপ্রির আবার নির্মান কাজ শুরু হয়। ২০১৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর দ্বিতীয় দফায় আবার নির্মান কাজ বন্ধ করে বিএসএফ। পরে কিছুদিন কাজ চললেও ২০২৯ সালের ১৮ ডিসেম্বর তৃতীয় দফায় নির্মান কাজ বন্ধ রাখতে বলে বিএসএফ। বিজিবি তখন বিএসএফের বরাত দিয়ে জানায়,৩৫ ফুটের বেশী উচ্চতর ভবন নির্মান করা যাবেনা। ২০২০ সালের ০৪ জুলাই ৩৫ ফুট উচ্চতর নতুন ভবনের নক্সা বিজিব এবং ইমিগ্রেশনের মাধ্যমে ভারতে পাঠানো হয়। এরপর ২০২০ সালের ১৮ আগষ্ট আবার ভবনের নির্মান কাজ শুরু হয়। সীমান্তের ষুন্যরেখার ১৫০ গজের ভেতরে দু’দেশের সীমানা প্রাচীর সংলগ্ন ত্রিপুরা রাজ্যের আগরতরা অংশে বিএসএফের ভবন নির্মান কাজে বিজিবি বাধা দেয়।২০২১ সালের মার্চ মাসে বিএসএফ আবার বাংলাদেশের ইমিগ্রেশনের নির্মান কাজ বন্ধ রাখার নির্দেশ দেয়।

দুইদেশের উচ্চ পর্যায়ের আলোচনার পর জটিলতার অবসান ঘটিয়ে দীর্ঘদিন  বন্ধ থাকা আখাউড়া স্থলবন্দরটি  চলতি বছরের মে মাসের মাঝামাঝি থেকে আবারও শুরু হয়েছে আখাইড়া ইমিগ্রেশন ভবনের নির্মান কাজ,যা দু’ দেশের যাত্রীদের মঝে আশার আলো জাগিয়েছে। তবে দ্রুত নির্মান কাজ শেষ করার দাবী তাদের। আখাউড়া  স্থলবন্দরের ইমিগ্রেশন  ভবনটি পরিত্যক্ত ঘোষনা করা হয়েছে আরও কয়েক বছর আগে। বর্তমানে ঝুঁকি নিয়েই পরিত্যক্ত ভবনেই চলছে ইমিগ্রেশন কার্যক্রম। এখানে যাত্রীদের বসার জন্য নেই পর্যাপ্ত জায়গা, সুপেয় পানি ও স্বাস্থ্য সম্মত টয়লেট। এতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় যাত্রীদের। ময়মনসিংহের বাসিন্দা মোহন লাল বলেন, আমরাও চাই ভারতের নাগরিকরা এদেশে এসে বলুক আমাদের ইমিগ্রেশন অবকাঠামো ও সেবা অনেক  ভালো পর্যটককে আকৃষ্ট করতে হলে এ জায়গাগুলোই আরো কাজ করতে হবে বলে মনে করি। কিশোরগঞ্জের  বাসিন্দা আলামিন বরেন এপার ও ওপারের ইমিগ্রেশনে ব্যাপক তফাত রয়েছে। এখানে অবকাঠামো, প্রফেশনালিজম,চেকিং এ গুলোতে  আরো উন্নত  করতে হবে। যা বর্তমান আধুনিক প্রযুক্তির সাথে মিশে যাবে। প্রতিদিন এক হাজার লোক এ চেকপোস্ট দিয়ে যাতায়াত করে। এ সংখ্যাটি বাড়তে থাকলে আখাউড়া স্থলবন্দরটি একটি লাভজনক বন্দর হতে পারে।যাত্রী সংখ্যা বেশী হলে এখানে বসার জন্য পর্যাপ্ত জায়গা নেই। আমরা চাই  নতুন ভবনের কাজটা দ্রুত শেষ করা হউক।

এ বিষয়ে আখাউড়া স্থল শুল্কষ্টেশনের রাজস্ব কর্মকর্তা আব্দুল কাইয়ূম তালুকদার বলেন,বাংলাদেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম স্থলবন্দর হচ্ছে আখাউড়া স্থলবন্দর। দিন দিন এ পথে যাত্রী পারাপার বৃদ্ধি পাচ্ছে। এতে করে সরকারের ও রাজস্ব আয় বাড়ছে। বন্দরটি উন্নত আধুনিক হলে রাজস্ব আয় আরো বহুলাংশে বেড়ে যাবে। বর্তমানে ঢাকা থেকে মাত্র আড়াই ঘন্টায় ট্রেনে করে আখাউড়া পৌছানো যায়। তাছাড়া চট্রগ্রাম ও সিলেটের সঙ্গে রেল ও সড়কপথে যাতায়াত সহজ এবং অর্থসাশ্রয়ী হওয়ায় যাত্রীরা অন্য বন্দর ও আকাশপথ ব্যবহার না করে  আখাউড়া স্থলবন্দর দিয়ে চলাচল করছে। ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার পুলিশ সুপার মোহাম্মদ সাখাওয়াত হোসেন আখাইড়া স্থলবন্দর  ইমিগ্রেশন সম্পর্কে বলেন, এ স্থল বন্দর দিয়ে বর্তমানে প্রতিদিন এক হজার যাত্রী পারাপার করছে। যাত্রী যত বাড়বে, সরকারের রাজস্ব আয় ততই বৃদ্বি পাবে। যা দেশের অর্থনীতিতে বিশাল ভুমিকা রাখবে। এ সব বিষয় মাথায় রেখে আধুনিক যত সুযোগ- সুবিধা বৃদ্বি করা যায,আমরা তা করে যাচ্ছি। ভবনটিতে যাত্রীদের আধুনিক সুযোগ সম্বলিত সব কিছু থাকবে,যাতে করে যাত্রীরা আরাম বোধ করে। তাই নতুন ভবনে যাত্রীদের মিলবে আধুনিক সবসুবিধা। একই ছাদের নীচে থাকবে কাষ্টমস,অফিস ও । চলতি বছরেই নির্মান কাজ শেষ করার চেষ্টা চলছে। কাজ শেষ হলে যাত্রী পারাপার বাড়বে।এর ফলে সরকারের রাজস্ব ও বাড়বে। যত দ্রুত সম্ভব আমরা নতুন ভবনে উঠতে পারব বলে মন্তব্য করেন।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে