জহির সিকদার,ব্রাহ্মণবাড়িয়া সংবাদদাতা।। এবারের এসএসসি পরীক্ষায় ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার বাসিন্দা মা ও মেয়ে একসঙ্গে পাশ করে এলাকায় চমক সৃষ্টি করেন। মা ও মেয়ে একসঙ্গে এসএসসি পাস করায় চমকের পাশাপাশি এলাকায় খুশির জোয়ার বইছে। ২০২৪ সালের এসএসসি পরীক্ষার ফলাফলে দুজনই কৃতিত্বের সহিত পাশ করে এ গৌরব অর্জন করেন। এনিয়ে এলাকায় চলছে উৎসবের আমেজ।
ঘটনাটি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের চাতলপাড় ওয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয়ের। এই গৃহবধূর নাম নূরুন্নাহার বেগম। তিনি নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়নের কাঠাঁলকান্দি গ্রামের মো. ফরিদ মিয়ার মেয়ে। তিনি ২০২৪ সালে কারিগরি শিক্ষা বোর্ড থেকে এসএসসি (ভোকেশনাল) পরীক্ষায় অংশ নিয়ে ৪ দশমিক ৫৪ পয়েন্ট পেয়ে কৃতকার্য হয়েছে। অপর দিকে তার মেয়ে চাতলপাড় ওয়াজ উদ্দিন উচ্চ বিদ্যালয় থেকে মানবিক বিভাগে ২ দশমিক ৬৭ পয়েন্ট নিয়ে কৃতকার্য হয়েছেন। এসএসসি পাস করা গৃহবধূ নূরুন্নাহার বেগম নাসিরনগর উপজেলার চাতলপাড় ইউনিয়ন পরিষদের ১, ২, ৩ ওয়ার্ডের সংরক্ষিত সদস্য। তিনি ৪৪ বছর বয়সে এসএসসি পাস করেছেন। এ খবর জেনে খোঁজ নিতে ফোন করতেই বেশ খুশি নিয়ে তিনি বললেন, তার মেয়ে নাসরিন আক্তারও পাস করেছে।
মা ও মেয়ের একসঙ্গে পাস করার ঘটনা এলাকায় এখন মুখরোচক আলোচনায় পরিণত হচ্ছে। সবাই ইউনিয়ন পরিষদ মেম্বার নুরুন্নাহার বেগমের প্রশংসায় পঞ্চমুখ। মা,মেয়ের সাফল্যে নুরুন্নাহারের পরিবারের সবাই বেশ খুশি। নুরুন্নাহার বেগম সাংবাদিকদের বলেন, ছোট বেলায় খুব ইচ্ছে ছিল পড়ালেখা করে মানুষের মতো মানুষ হবো। কিন্তু ছোট বেলায় বিয়ে হয়ে যায় আমার। বিয়ের পর দুই ছেলে-মেয়ে আর সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যাওয়ায় নিজের পড়ালেখার কথা ভুলে যাই। কিন্তু মন থেকে পড়ালেখার ইচ্ছে শক্তি বাদ দিতে পারিনি। পরে নিজের একান্ত ইচ্ছে আর স্বামী সন্তানের অনুপ্রেরণা ও সহযোগিতায় চাতলপাড় কারিগরি বিদ্যালয়ে নবম শ্রেণিতে ভর্তি হই। নুরুন্নাহার বেগম জানান, তিনি আরও পড়তে চান। অনেক বিপত্তি পেরিয়ে তার এই এগিয়ে চলা। নিজের দুই সন্তানকেও পড়ালেখা শিখিয়ে মানুষের মতো মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে চান। পড়াশুনার বয়স নেই বলে মনে করেন তিনি। নুরুন্নাহার বলেন, ‘অষ্টম শ্রেণিতে পড়ার সময় আমার বিয়ে হয়। শ্বশুর বাড়ির লোকজন ছিলেন রক্ষণশীল। এ অবস্থায় পড়াশুনা চালিয়ে যেতে পারিনি। এক পর্যায়ে ইউপি মেম্বার নির্বাচিত হই। এ নিয়ে দুই বার মেম্বার হয়েছি। পরিবারের অনুমতি নিয়ে আবারও পড়াশুনা শুরু করি।’ লেখাপড়ার বিকল্প নেই বলে মনে করেন তিনি।
তিনি আরও বলেন, যে সকল নারীরা তাদের পরিবারের সংসারে অসচ্ছলতার কারণে পড়ালেখা করতে চায় না, তাদের প্রতি অনুরোধ সরকার বিনা টাকায় পড়ালেখা চালিয়ে যেতে সুযোগ করে দিয়েছে। পরিবার থেকে অল্প বয়সে বিয়ের চাপ দিলে তার তীব্র প্রতিবাদ করতে হবে। চাতলপাড় ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মো. রফিক মিয়া জানান, তাদের( মা ও মেয়ের) এই সাফল্যে আমরা গর্বিত। নতুন প্রজন্মের কাছে তিনি একজন আদর্শ। নাসিরনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মোহাম্মদ ইমরানুল হক ভূইয়া বলেন, পড়াশুনা করতে চাইলে যে কোনো বয়সেই করা সম্ভব, মানুষের অদম্য ইচ্ছা শক্তির দ্বারা সকল কিছুই অর্জন করা সম্ভব। তিনি আরও বলেন, বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষার্থীদের জন্য নুরুন্নাহার একটি জ্বলন্ত উদাহরণ। বিশেষ করে নারীদের কাছে উজ্জ্বল নক্ষত্র। আমার উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে তাকে সম্মানিত করা হবে। তিনি মা নুরুন্নাহার ও মেয়ে নাসরিন আক্তারের সাফল্য কামনা করেন।



























