কুষ্টিয়া শহরে ব্যাটারী চালিত অটো রিক্সা সাধারন মানুষের জনজীবন অতিষ্ট হয়ে উঠেছে। এসব যান চলাচলের জন্য শহরের মধ্যে তিল পরিমান জায়গা ফাঁকা নেই। রাস্তার দু’পাশ দিয়ে ফুটপাতের জায়গা দিয়ে পথচারীদের হাটার পথ থাকলেও সেখানেও নানা ধরনের পসরা সাজিয়ে বসে আছে ব্যবসায়ীরা। ফলে পথচারীদের পথচলা ও পারপার হওয়াটা ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। বাস্তবতা যা, তা হলো জেলার ট্রাফিক সদস্য সংখ্যা প্রয়োজনের তুলনায় অনেকটাই কম। শহরের দৃশ্য দেখে মনে হয় ব্যাটারী চালিত অটো রিক্সার মিছিলের শহর।
কুষ্টিয়া পৌরসভা সূত্র জানায়, পৌরসভার লাইসেন্স শাখা থেকে থেকে গত বছর এক হাজার ২৪৮ জন শহরে অটোরিকশা ব্যবসার জন্য ট্রেড লাইসেন্স করেছিলেন। এ বছর করেছেন মাত্র ৬০৪ জন। এক বছরের জন্য একটি অটোরিকশার ভ্যাট ট্যাক্স মিলে দুই হাজার ২৫ টাকা দিয়ে ট্রেড লাইসেন্স করতে হয়। এরপর লাইসেন্স দেওয়া অটো রিক্সাগুলো পৌর এলাকায় চলার অনুমতি পায়।
সরেজমিনে দেখা গেছে, অটোরিকশার কারণে সবচেয়ে বেশি যানজটের সৃষ্টি হয় শহরের তিনটা রুটে। সেগুলো হলো, মজমপুর থেকে এনএস রোড হয়ে বড় বাজার, থানামোড় থেকে মোল্লাতেঘরিয়া ও পলিটেকনিক থেকে কলেজ ও হাসপাতাল মোড় হয়ে সাদ্দাম বাজার পর্যন্ত। এই তিন সড়কে মোট পাঁচ কিলোমিটারে দুই হাজারের বেশি অটোরিকশা চলাচল করে। এছাড়া কলেজ মোড়, হাসপাতাল মোড় ও কোর্টস্টেশন মোড়ে সকালে ও বিকালে সবচেয়ে বেশি যানজট বাধে।
ট্রাফিক সার্জেন্ট সুমন বিশ্বাস বলেন, ‘শহরের এনএস রোড় ও কুষ্টিয়া-ঝিনাইদহ মহাসড়কের বটতৈল থেকে কুষ্টিয়া-ঈশ্বরদী মহাসড়কের ত্রিমোহনী পর্যন্ত আট কিলোমিটার রাস্তায় অটোরিকশা চলাচল করছে সবচেয়ে বেশি। এসব সড়কে চলতে গিয়ে তারা একে অপরের সঙ্গে প্রতিযোগিতা করে। এসব কারণে তারা যেদিকে পারছে সেদিক দিয়ে চলাচল করছে। ফলে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে।’
অটোরিকশা চালক সংগ্রাম পরিষদ কুষ্টিয়া জেলা শাখার সাধারণ সম্পাদক আবদুল হামিদ জানান, তার পরিষদে ২ হাজার ৩৯টি অটোরিকশা আছে, সেগুলো শহরে চলাচল করে। এর বাইরে আরও ছয় হাজার অটোরিকশা শহরে চলছে, যেগুলো পৌরসভার বাইরে থেকে আসে। বাইরে থেকে আসা অটো রিকশাগুলোই শহরে যানজট তৈরি করছে।
কুষ্টিয়া পৌরসভার লাইসেন্স শাখার পরিদর্শক রফিকুল ইসলাম বলেন, ‘শহর ছাড়াও কুমারখালী ও মিরপুর উপজেলার অনেক অটোরিকশা শহরে এসে চলাচল করে। এতেই মূলত শহরে যানজট বেড়েছে। এ ব্যাপারে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে।’
অটোরিকশা চালক সাইদুলম জানান, শহরে শুধু আমাদের কারণেই যানজটের সৃষ্টি হয়না। এখানে অন্যান্য পরিবহনের কারণেও যানজট বাধে।
কুষ্টিয়া ট্রাফিক কার্যালয়ের পরিদর্শক মেহেদী হাসান বলেন, ‘অটোরিকশা নিয়ন্ত্রণ করতে ট্রাফিক সদস্যরা কাজ করে যাচ্ছে। পৌরসভা চাইলে তাদের সহযোগিতা করা হবে। তবে শহরে চলাচলকারী লাইসেন্স প্রাপ্ত বৈধ অটো রিক্সা থেকে বহু গুনে বেশী চলছে অবৈধ অটো রিক্সা। আর এদের চলাচলে বেপরোয়া মনোভাব ও দাপটের কাছে ট্রাফিক সদস্যরা রীতিমত অসহায়। এ সব অবৈধ ব্যাটারী চালিত অটো রিক্সা এর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা গ্রহণের দায়িত্ব পৌরসভার।
বর্তমানে কুষ্টিয়া শহরে যত অটো রিক্সা চলাচল করে তাদের মধ্যে অধিকাংশ প্যাটলারদের লাইসেন্স নাই। ট্রাফিক আইন সম্বন্ধে ধারণা না থাকায় ট্রাফিক সাংকেতিক চিহ্ন বুঝতে পারে না তারা। সংকেত না দিয়ে ইচ্ছামত ডানে-বামে মোড় নেয়ায় ঘটছে দূর্ঘটনা। সড়কে জায়গা থাক বা না থাক পাল্লা দিয়ে পাশাপাশি চলছে তারা। অধিকাংশ সময়ই সড়কের পুরো জায়গা থাকছে তাদের দখলে। কুষ্টিয়াতে এক মুখি সড়ক ব্যবস্থা স্থায়ীভাবে চালু না থাকায় এ ধরনের রিক্সা-ভ্যানের বেপরোয়া চলাচলে সড়ক দূর্ঘটনা একের পর এক ঘটে চলেছে। চালক বৈধ কি অবৈধ তা দেখবার প্রয়োজন পড়ে না। পথচারীদের অভিযোগ শহরে রাস্তার ধারণ ক্ষমতার বাইরে চলছে এ সকল যানবাহন, ফলে যানজটসহ দূর্ঘটনা বাড়ছে। পথ চলাচলে পথচারীদের সব সময়ই ঝুঁকির মধ্যে থাকতে হচ্ছে।
সচেতন মহলের দাবী পৌর কর্তৃপক্ষকে ভোটের ভাবনা ছাড়তে হবে। জনস্বার্থে এই সকল অবৈধ ব্যাটারী চালিত অটোয় বাইকের বিরুদ্ধে জরুরী ভিত্তিতে ব্যবস্থা নিতে হবে। সেই সাথে শহরের মধ্যে সৃষ্টি হওয়া যানজটের দায়ভার এককভাবে ট্রাফিক পুলিশের কাঁধে না ঠেলে নিজেদের দায়িত্বে সচেতন হতে হবে। যানজট নিরসনে ট্রাফিক পুলিশের কাজে সহায়তা করতে হবে। তা না হলে কুষ্টিয়া শহরকে যানজট ও দূর্ঘটনা মুক্ত করা একা ট্রাফিক পুলিশের পক্ষে সম্ভব হয়ে উঠবে না।
অন্যদিকে কুষ্টিয়া শহরে ব্যাটারী চালিত অটো বাইকের সাথে পাল্লা দিয়ে চলছে মাহিন্দ্র ও সিএনজি নামের যান। এ সকল মটর যানের সংখ্যা আশাতীতভাবে বেড়েই চলেছে। যার কোন রোড পারমিট নেই, নেই কোন লাইসেন্স। কিছু অসাধু পুলিশ ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দকে চাঁদা দিয়ে অবাধে এই মাহিন্দ্র ও সিএনজি চলাচল করছে। সরেজমিনে খোঁজ নিয়ে দেখা গেছে কুষ্টিয়া শহরে শতকারা ১০০টির মধ্যে ৫টির রেজিস্ট্রেশন আছে। এ ব্যাপারে বেশ কয়েকজন মাহিন্দ্র ড্রাইভারদের সাথে কথা বললে তারা জানান, আমাদের গাড়ীর ও নিজের কোন লাইসেন্স লাগে না। প্রতিদিন শহরের বিভিন্ন পয়েন্টে রাজনৈতিক ব্যক্তিবর্গের পোলাপান্ডাদের ১০ থেকে ৩০ টাকা করে সারাদিনে সর্বমোট ২৫০ টাকা করে চাঁদা দেওয়া লাগে। এই টাকা গুলো যায় কোথায় জিজ্ঞাসা করলে বলেন, এক ভাগ পায় রাজনৈতিক সমিতি, এক ভাগ পায় ভিকেল অফিস, এক ভাগ পায় পুলিশ প্রশাসন আর বাকী এক ভাগ পায় পৌরসভা। এসকল মটরযান বৃদ্ধি পাওয়াতে বড় বাস মালিকরাও লোকসানের মুখে পড়েছে ব্যাপকভাবে। মাহিন্দ্র ও সিএনজির বিষয়ে বিআরটিএ অফিস সম্পূর্ণটাই দায়ী বলে মনে করেন সকলেই। আইনগত কিছু জঠিলতার কারনে বাধ্যতামূলক ভাবে মাহিন্দ্র ও সিএনজির লাইসেন্স করানো যাচ্ছেনা না বলে মন্তব্য করেন জেলা প্রশাসনের এক উর্ধতন কর্মকর্তা। রেজিষ্ট্রেশন বিহীন এসকল যানগুলো থেকে প্রতিদিন আদায়কৃত অর্থের একটি অংশ ঢুকছে ঐসকল কর্তাব্যক্তিদের পকেটে, অন্য দিকে শুন্য হচ্ছে সরকারী কোষাগার। এ ব্যাপরে উর্ধ্বতন মহলের হস্তক্ষেপ কামনা করেছে কুষ্টিয়ার সূশীল সমাজ।

কে এম শাহীন রেজা
কুষ্টিয়া, বিডি টাইমস নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে