ভোলার মানুষদের ১৯৭০ এর ভয়াল সেই ১২ নভেম্বরের দু:সহ স্মৃতি আজো কাদায়। ৪৭ বছর আগে এই দিনটিতে ঝড়-জলোচ্ছ্বাসে লন্ডভন্ড হয়ে গিয়েছিল দ্বীপ জেলা ভোলাসহ উপকূলীয় অসংখ্য জনপদ গুলো। প্রাণহানি ঘটে ভোলার লক্ষাধিকসহ উপকূলের পাচ লাখ মানুষের।যোগাযোগ ব্যবস্থা ভালো না থাকায় ওই সময় ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায় এক সপ্তাহ পর। আর সেই সময়ে বেচে যাওয়াদের স্বজন হারানোর স্মৃতি এখনও তাদের কুড়ে কুড়ে খাচ্ছে।
সেদিন মুহূর্তের মধ্যেই প্রলংয়নকারী ঘূর্ণী ও জলচ্ছাস উপকূলীয় জনপদগুলো মৃত্যু পুরীতে পরিনত করে দেয়। রাস্তা-ঘাট,ঘর-বাড়ি, মাঠ-ঘাট এমনকি গাছের সাথে ঝুলে ছিলো শত শত মানুষের মৃতদেহ।
দুর্যোগের সেদিনে জলোচ্ছ্বাসে গৃহহীন হয়ে পরে লাখ লাখ মানুষ। সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয় চর কুকড়ি-মুকড়ির মানুষের, সেখানে প্রায় সকলেই সেদিনের জলোচ্ছ্বাসে প্রাণ হারায়।
স্থানীয়রা জানান, ১৯৭০ সালের এই দিনটি ছিলো রোজার দিন। গুড়ি গুড়ি বৃষ্টিসহ টানা বাতাস বইছিল সারা দিন। উপকূলের উপর দিয়ে প্রায় ২০০ কিলোমিটার বেগে বয়ে যায় ঘূর্ণিঝড় ও জলোচ্ছ্বাস। শুধু রেখে যায় ধ্বংসযজ্ঞ। বহু মানুষ তাদের প্রিয়জনের লাশ খুজেও পায়নি। জলচ্ছ্বাসের পর থেকে দেড়মাস পর্যন্ত স্বজন হারানোদের কান্নায় উপকূলের আকাশ পাতাল ভারী ছিল।
গত ৪৭ বছরের সব কয়টি ঘূর্ণীঝড়ের চেয়ে ৭০’র ঝড়টি সব চাইতে হিংস্র ছিল বলে দাবী করেছেন স্থানীয়রা। ৭০’র এর হারিকেনরুপী ঝড়টি উপকূলীয় ভোলা, বরিশাল, বরগুনা, লক্ষীপুর, পটুয়াখালী, বাগেরহাট, খুলনাসহ ১৮টি জেলায় আঘাত হানে। তৎকালীন সময় তথ্যপ্রযুক্তি অনেকটা দুর্বল থাকায় উপকূলে অনেক মানুষই ঝড়ের পূর্বাভাস পায়নি। ওই জলচ্ছ্বাস হয়েছিল ৮/১০ ফুট উচ্চতায়। কেউ গাছের ডালে, কেউ উচু ছাদে আশ্রয় নিয়ে কোনমতে প্রানে রক্ষা পেলেও ৩/৪ দিন তাদের অভুক্ত কাটাতে হয়েছে।
লালমোহন উপজেলার মঙ্গল শিকদার গ্রামের মাকসুদ আলম স্বজন হারানো একজন। ওই সময় ১২ বছরের মাকসুদ পরিবারের ৬ সদস্যের মধ্যে বেচে যাওয়া একমাএ সদস্য। তিনি সেদিনের ভয়াল স্মৃতির বর্ণনা দিতে গিয়ে বলেন, সকাল থেকেই আকাশ মেঘে আচ্ছন্ন ছিল। দুপুরের পর থেকে আস্তে বাতাস বইতে শুরু করে। বিকেলের দিকে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি। সন্ধ্যায় বাতাসের বেগ বাড়তে থাকে। এর পর বাতাস ও বৃষ্টির প্রচন্ডতা বেড়ে যায়। রাত ২টা আড়াইটার দিকে মেঘনা-তেতুলিয়া ও বঙ্গোপসাগরের জলচ্ছ্বাসের পানি ১৪ ফুট উচু বেড়িবাধের ওপর দিয়ে প্রবাহিত হয়ে গোটা জেলা তলিয়ে যায়।
এ সময় মির্জাকালু বাজারে সদর রোডে হাটুর ওপরে (৩/৪ ফুট) পানি ওঠে। পানি আসতেছে বলে বাজারের আশ-পাষ থেকে বহু নারী, পুরুষ ও শিশু ছুটোছুটি করে হাই স্কুলের দোতালায় আশ্রয় নেন। তিনি আরো বলেন, পরদিন ১৩ নভেম্বর ভারে পানি যখন নামতে শুরু করে তখন প্রচন্ড বেগে জলচ্ছ্বাসের পানির স্রোতে ভোরে পানি যখন নামতে শুরু করে তখন প্রচন্ড বেগে জলচ্ছ্বাসের পানির স্রোতে মাছ ধরার ট্রলার ও লঞ্চ বাজারে এসে পরে। পানিতে ভেসে যাচ্ছে অগনিত মানুষের লাশ। বিভিন্ন গাছের মাথায় ঝুলতে দেখা গেছে মানুষ ও পশুর মৃতদেহ। চারিদিকে শুধু লাশ আর লাশ। যেন লাশের মিছিল হয়েছিল সেদিনের জলচ্ছ্বাসে। গোটা জেলাকে তছনছ করে মৃত্যুপুরীতে পরিনত করে দিয়েছিলো। ঝড়ের বর্ণনা করতে গিয়ে ষাটোর্ধ্ব বৃদ্ধা মনপুরার হাবিবা খাতুন বলেন, সেই ভয়াল জলচ্ছ্বাস ও ঘূর্ণি ঝড়ের সময় অথৈ পানিতে একটি ভাসমান কাঠ ধরে প্রায়মৃত অবস্থায় গভির সাগরের মধ্যে থেকে আল্লাহ আমাকে বাচায়।
ফয়সল বিন ইসলাম নয়ন,
ভোলা নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্স নিউজ














