কর ফাঁকি ও অর্থ পাচার সংক্রান্ত সাড়া জাগানো পানামা পেপার্স কেলেঙ্কারিতে নতুন করে আরও ৯ বাংলাদেশি ব্যক্তি ও এক প্রতিষ্ঠানের নাম এসেছে। এ নিয়ে ফাঁস হওয়া পানামা পেপার্সে বাংলাদেশের ৩৪ জন ব্যক্তি ও দুটি প্রতিষ্ঠানের নাম প্রকাশিত হলো, যাদের বিপরীতে মোট ৪৫টি অ্যাকাউন্ট রয়েছে। এদের মধ্যে ২৩ জনের বাড়ির ঠিকানাও উল্লেখ আছে। এসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের নাম উঠে এলেও সব পক্ষই চুপ রয়েছে।
প্রাপ্ত নথিপত্রে দেখা যায়- চার ব্যক্তির নামে দুটি করে অ্যাকাউন্ট রয়েছে। যৌথ অ্যাকাউন্ট রয়েছে দুটি। তালিকায় নতুন করে যাদের নাম এসেছে তারা হলেন- এএফএম রহমাতুল্লাহ বারী, ক্যাপ্টেন এমএ জাউল, সালমা হক, কাজী রায়হান জাফর, মির্জা এম ইয়াহইয়া, মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম, নজরুল ইসলাম, সৈয়দা সামিনা মির্জা ও জুলফিকার হায়দার। আর প্রতিষ্ঠানটি হলো- বিবিটিএল।
এর আগে আইসিআইজের তথ্য নিয়ে আইরিশ টাইমসের ডিজিটাল প্রোডাকশনবিষয়ক সম্পাদক ব্রায়ান কিলমার্টিনের তৈরি গ্রাফিকস ম্যাপে বাংলাদেশের ২৫ ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান ও বেনিফিশিয়ারির নাম এসেছে। আগে ২২ শেয়ারহোল্ডার, ১ সুবিধাভোগী ও ২ কোম্পানির কথা জানানো হয়েছিল।
ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টসের (আইসিআইজে) সহযোগী বাংলাদেশের নিউ এইজ পত্রিকা এসব তথ্য হাতে পেয়ে যাচাই-বাছাই করে। পর্যবেক্ষণ শেষে এ নিয়ে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ করা হয়। আইসিআইজের হস্তগত গোপন নথি অনুযায়ী বাংলাদেশের প্রভাবশালী কজন ব্যবসায়ী বিদেশে কোম্পানি স্থাপন করে কর ফাঁকি দিচ্ছে। এর মধ্যে প্রথমেই রয়েছে আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য কাজী জাফর উল্লাহ ও তার স্ত্রী এমপি নিলুফার জাফরের নাম। তবে জাফর উল্লাহ ও তার স্ত্রী উভয়েই এ অভিযোগ অস্বীকার করেছিলেন।
এ ছাড়া মার্কেন্টাইল কর্পোরেশনের চেয়ারম্যান আজিজ খান, তার স্ত্রী আঞ্জুমান আজিজ খান, কন্যা আয়েশা আজিজ খান, ভাই জাফর উমায়েদ খান ও ভাগ্নে ফয়সাল করিম খান বিদেশে ছয়টি কোম্পানি চালান। এর মধ্যে ব্রিটিশ ভার্জিন আইসল্যান্ডের কোম্পানি সিঙ্গাপুরের ঠিকানা দিয়ে নিবন্ধন করা হয়েছে। এসব কোম্পানি অর্থ পাচারের সঙ্গে জড়িত। তবে আজিজ খান এসব অভিযোগ অস্বীকার করে তাদের কার্যক্রম আইনসম্মত বলে দাবি করেন।
এছাড়া, যেসব অর্থ পাচারকারীর নাম এসেছে তারা হলেন- ইউনাইটেড গ্রুপ অব কোম্পানির হাসান মাহমুদ রাজা, খন্দকার মঈনুল আহসান (শামীম), আহমেদ ইসমাইল হোসেন, আখতার মাহমুদ, স্কয়ার গ্রুপ অব কোম্পানিজের প্রতিষ্ঠাতা মরহুম স্যামসন এইচ চৌধুরী, বাংলাদেশ অ্যাসোসিয়েশন অব ফার্মাসিউটিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজের সাবেক প্রেসিডেন্ট ড. এএমএম খান, মমিন টির পরিচালক আজমত মঈন, পাট ব্যবসায়ী দিলিপ কুমার মোদি, সি পার্ল লাইন্সের চেয়ারম্যান ড. সৈয়দ সিরাজুল হক, বাংলা ট্রাক লিমিটেডের মো. আমিনুল হক, নাজিম আসাদুল হক ও তারিক ইকরামুল হক, ওয়েস্টার্ন মেরিন শিপ বিল্ডার ক্যাপ্টেন সোহাইল হাসান, মাসকট গ্রুপ অব কোম্পানির চেয়ারম্যান এফএম জোবায়দুল হক, সেতু কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহতাব উদ্দিন চৌধুরী, তার স্ত্রী উম্মে রব্বানা, স্পার্ক লিমিটেড ও অমনিকেম লিমিটেডের চেয়ারম্যান ইফতেখারুল আলম, আবদুল মোনেম লিমিটেডের নির্বাহী ব্যবস্থাপনা পরিচালক এএসএম মহিউদ্দিন মোনেম, তার স্ত্রী আসমা মোনেম এবং অনন্ত গ্রুপের শরীফ জহির। (সূত্র : ইরান বাংলা রেডিও)
‘পানামা পেপারস’ নামে ওসব নথি প্রকাশ করেছে ওয়াশিংটনভিত্তিক ইন্টারন্যাশনাল কনসোর্টিয়াম অব ইনভেস্টিগেটিভ জার্নালিস্টস (আইসিআইজে)। ওই তালিকায় বিশ্বের কয়েকজন রাষ্ট্রপ্রধানসহ শতাধিক ক্ষমতাধর ব্যক্তি ও আত্মীয়-স্বজনের কর ফাঁকি দিয়ে সম্পদের পাহাড় গড়ার প্রমাণ রয়েছে।
জার্মান দৈনিক জ্যুডডয়েচ সাইটুংয়ের অনুসন্ধানী সাংবাদিক বাস্তিয়ান ওবারমেয়ারের হাতে এসব নথি আসে। তারা এটাকে তুলে দেন আন্তর্জাতিক অনুসন্ধানী সাংবাদিক সংস্থা আইসিআইজের কাছে। পরবর্তীকালে যুক্তরাজ্যের গার্ডিয়ান, ভারতের ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস, বাংলাদেশের নিউএইজসহ ৭৮টি দেশের ১০৭টি সংবাদমাধ্যম এসব তথ্য যাচাই-বাছাই করে। সোমবার ১ কোটি ১৫ লাখ নথি প্রকাশ করা হয়।
আইসিআইজের দাবি সত্য হলে পানামা পেপারসই এ যাবৎকালের সবচেয়ে বড় ফাঁস করা গোপনীয় তথ্যভাণ্ডার। তবে, পানামা পেপার্সে আমেরিকান কোনো ব্যক্তির নাম না থাকায় এর স্বচ্ছতা ও বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অনেকেই প্রশ্ন তুলেছেন, আমেরিকায় একজন ধনকুবেরও কি কর ফাঁকি দেন না? একজনেরও কি অফশোর কোম্পানি নেই? ডিক চেনি বা ডোনাল্ড ট্রাম্পের মতো ধনাঢ্য ব্যবসায়ীদের সবকিছুই কি শতভাগ স্বচ্ছ?
পানামা পেপার্সে শীর্ষ দুর্নীতিবাজ রাজনীতিক ও রাষ্ট্রনেতাদের তালিকায় ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট পেত্রো পোরোশেঙ্কোর নাম আছে, অথচ আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমে সেটার প্রচার নেই। তেমন কোনো কথা না সৌদি রাজার কর ফাঁকি ও টাকা পাচার নিয়ে। অথচ ‘নিউইয়র্ক টাইমস’, ‘গার্ডিয়ান’সহ বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দৈনিক সংবাদপত্রগুলোর প্রথম পাতায় সব দুর্নীতিবাজের ওপরে ছাপা হয়েছে রুশ প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিনের ছবি। কিন্তু মজার ব্যাপার, পুতিন বা তাঁর পরিবারের কোনো সদস্যের কোনো অফশোর কোম্পানির মালিকানা বা অংশীদারি নেই। তাঁরা টাকা পাচার করেছেন, কর ফাঁকি দিয়েছেন—এ রকম কোনো তথ্য পানামা পেপার্সের ১১ মিলিয়ন নথির কোথাও নেই। আর এ কারণেই নথি ফাঁস হওয়ার পরপরই ক্রেমলিনের পক্ষ থেকে এর প্রতিবাদ আসে। মঙ্গলবার ক্রেমলিনের মুখপাত্র এই কেলেঙ্কারিতে মার্কিন কেন্দ্রীয় গোয়েন্দা সংস্থা সিআইএ’র সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ আনেন।



























