
সারাদেশে ট্রেনের যাত্রী ও মালামালের সার্বিক নিরাপত্তার জন্য রেলওয়ে পুলিশের পাশাপাশি রয়েছে রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী। ঈদ-পার্বণে চাপ বাড়লে র্যাবসহ অন্যান্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীও যুক্ত হয়। এরপরও চলে ট্রেনের টিকিটে কালোবাজারি । টিকিট কেনার ক্ষেত্রে এবার কালোবাজারি বন্ধে যাত্রীদের জাতীয় পরিচয়পত্র বাধ্যতামূলক করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে রেলওয়ে। এতে কালোবাজারি বন্ধ হবে কি না,সেটা সময়ই বলে দেবে। তবে এর মাধ্যমে যাত্রীদের হয়রানি ও কষ্ট বাড়ার পাশাপাশি অনেক যাত্রীই হারাবেন ট্রেনে চড়ার অধিকার।
এবার নতুন নিয়ম হচ্ছে—আগে থেকে যাদের নিবন্ধন করা আছে, তাদের ওয়েবসাইটে গিয়ে সাইন ইন করতে হবে। এরপর জন্ম নিবন্ধন সনদ আপলোড করে নতুন করে নিবন্ধন করতে হবে। আর যাদের আগে থেকে নিবন্ধন করা নেই, তাদের প্রথমে ওয়েবসাইটে সাইন আপ করতে হবে। এরপর জাতীয় পরিচয়পত্র আপলোড করে পুনরায় নিবন্ধন করতে হবে। ১২ থেকে ১৮ বছর বয়সীরা বাবা/মা এর জাতীয় পরিচয়পত্র কিংবা নিজের জন্ম নিবন্ধন সনদ দিয়ে নিবন্ধন করতে হবে। এ ছাড়া চাইলে মোবাইল নম্বর থেকে খুদে বার্তা (এসএমএস)পাঠিয়েও নিবন্ধন করা যাবে। এই প্রক্রিয়া শেষ হলেই কেবল অনলাইনে,অ্যাপে কিংবা কাউন্টার থেকে টিকিট কাটা যাবে।
রেলের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, সাম্প্রতিক সময় ‘জো বাইডেন’ ও ‘ডোনাল্ড ট্রাম্প’সহ বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামে নিবন্ধন করে টিকিট কাটা হয়েছে। এতে রেলের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হয়েছে। জাতীয় পরিচয় বাধ্যতামূলক করা হলে এগুলো রোধ করা যাবে। তবে যে যাত্রীদের জন্য কালোবাজারি বন্ধের উদ্যোগ,সেই যাত্রীদের হয়রানিই বেড়ে গেল। এমনকি নতুন নিয়মের কারণে দেশের কোনো কোনো নাগরিকের পক্ষে এই সেবা নেওয়াও সম্ভব হবে না। অর্থাৎ ট্রেন ভ্রমণ থেকে বঞ্চিত হবে তারা।
গতকাল বুধবার(১৫’ফেব্রুয়ারি) রেলভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে রেলমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন জানান,যাত্রী সাধারণের সেবা বৃদ্ধির লক্ষ্যে ‘টিকিট যার, ভ্রমণ তার’ শীর্ষক স্লোগানকে সামনে রেখে এবং বাংলাদেশ সরকারের লক্ষ্য অনুযায়ী ‘স্মার্ট বাংলাদেশ’ গঠনের প্রক্রিয়ার অংশ হিসেবে টিকিট বিক্রির ব্যবস্থায় এই পরিবর্তন। তিনি বলেন,গত দশ বছরে রেলে মানুষের আস্থা ও বিশ্বাস বাড়লেও টিকিট কালোবাজারিরা সব অর্জন নষ্ট করে দিচ্ছে। এ’জন্যেই চালু করতে হচ্ছে নতুন নিয়ম। এই নিয়মে সংগ্রহ করা যাবে একটি এনআইডি বা জন্ম নিবন্ধন নম্বরের বিপরীতে ৪টি টিকিট। দেশের যে কোনো নাগরিকের যে কোনো সময়ে ট্রেনে চড়ার অধিকার রয়েছে। আর এই অধিকার বাস্তবায়ন করতে হলে ১২’বছরের বেশি বয়সী দেশের জনসংখ্যার সবাইকে নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনের পর ওয়েবসাইট থেকে টিকিট কাটতে হলে অন্তত একটি ই-মেইল আইডি লাগবে। কারণ, ইমেইল আইডি দিয়ে সাইন আপ ছাড়া নিবন্ধন কিংবা টিকিট কাটা যাবে না। আর যারা কাউন্টার থেকে টিকিট কাটবেন,তাদেরও আগে থেকে নিবন্ধন থাকতে হবে। এই বিবেচনায় দেশের একটা বড় জনগোষ্ঠী সুযোগই পাবেন না টিকিট কাটার ।
যেমন একজন ব্যক্তির জাতীয় পরিচয়পত্র ও মোবাইল ফোন আছে। তাঁর অনলাইনে সাইন ইন কিংবা সাইন আপ করার মতো যোগ্যতা থাকতে হবে। এরপর নিবন্ধন করতে হবে। নিবন্ধনও কী সবার পক্ষে করা সম্ভব? এখন মানুষ পাসপোর্ট, ভিসা কিংবা অন্যান্য কাজে দৌড়াচ্ছে পাড়ার দোকানে। এই সেবার জন্য নেওয়া হচ্ছে ৫০ থেকে ১০০ টাকা। বিষয়টি যেহেতু উচ্চপর্যায়ের সিদ্ধান্তে হচ্ছে,তাই রেলের কর্মকর্তারা পরিচয় প্রকাশ করে বক্তব্য দিতে চাননি। নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক কর্মকর্তা বলেন, কারও জাতীয় পরিচয়পত্র না থাকলে কিংবা হারিয়ে গেলে ওই ব্যক্তির পক্ষে টিকিট কেটে ট্রেনে যাতায়াতের সুযোগ থাকবে না। কেউ অন্যের জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বর দিয়ে টিকিট কাটলে ওই ব্যক্তির নাম টিকিটে লেখা থাকবে। এটাকে বেআইনি হিসেবে গণ্য করবে রেলওয়ে। এ ক্ষেত্রে তাঁকে জরিমানা করতে পারবে রেলওয়ে। এমন বাস্তবতায় ট্রেনে চড়তে হলে যাত্রীর জাতীয় পরিচয়পত্র/জন্ম নিবন্ধন সনদ, ইমেইল আইডি, মোবাইল ফোন কিংবা পাসপোর্টের কোনো একটা থাকতে হবে। এসব থাকার সনদের একটা কপি পকেটে নিয়ে ঘুরতে হবে। নতুবা যাত্রীর প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয়পত্র থাকলেও চলবে। এসব সনদ বা কার্ডের সঙ্গে টিকিটে থাকা নামের মিল না পেলে অবৈধ বিবেচনা করা হবে।
রেলের টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন (যৌথ)জাতীয় পরিচয়পত্রের মাধ্যমে নিবন্ধনের প্রক্রিয়াটি পরিচালনা করবে। তারা প্রথমে তথ্য নিয়ে রেলওয়ের ওয়েবসাইটে জমা করবে। সেখান থেকে নির্বাচন কমিশনের তথ্যভান্ডার দিয়ে জাতীয় পরিচয়পত্রের সঠিকতা যাচাই করা হবে। এই বিষয়ে নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রেলের একটি চুক্তি হয়েছে। এর বিনিময়ে রেলওয়ে প্রতি বছর ৫ লাখ টাকা দেবে নির্বাচন কমিশনকে।
টিকিট বিক্রির চুক্তির অংশ হিসেবে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান রেলওয়েকে পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) মেশিন বা পজ মেশিন দেবে। এই মেশিন নিয়ে টিকিটে যাত্রীর নাম ও সনদ মিল আছে কিনা তা পরীক্ষা করবেন রেলের কর্মকর্তারা। দীর্ঘদিন ধরে ট্রেন টিকিট পরীক্ষক (টিটিই) এর বিরুদ্ধে টিকিটবিহীন যাত্রীদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার অভিযোগ আছে। এবার হয়তো অন্য একজনের জাতীয় পরিচয়পত্র দিয়ে টিকিট কেটে ভ্রমণের সময় ঘুষ দিয়ে ছাড়া পেতে হবে যাত্রীদের। এটা আরেকটি ঘুষের উৎসে পরিণত হয় কিনা, সেটা একটা প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।
সারাদেশে রেলপথের পরিমাণ প্রায় তিন হাজার কিলোমিটার। রেলওয়ের কর্মকর্তা-কর্মচারী আছে প্রায় ২৫ হাজার। পুলিশ ও আরএনবি মিলে আরও নিরাপত্তায় নিয়োজিত আরও প্রায় সাড়ে সাত হাজার সদস্য। এর বাইরে ঈদ বা পার্বণে যোগ হয় রাষ্ট্রের অন্যান্য বাহিনীও । এত কিছুর পরও কালোবাজারি বন্ধ করতে না পারা কার ব্যর্থতা? এটি কী রেলওয়ে কোনো দিন ভেবে দেখেছে? কালোবাজারি বন্ধে যাত্রীদের টিকিট কাটার পদ্ধতি দিন দিন জটিল ও কঠিন করার মাধ্যমে কী কালোবাজারি বন্ধ করা সম্ভব?



























