ঢাকা উত্তর সিটি ও ঐক্য ফাউন্ডেশনের যৌথ উদ্যোগে গত সপ্তাহে মার্কেটটি চালু হয়। এসএমই উদ্যোক্তাদের পণ্যের বিক্রয় ও বিপণন এবং এই খাতকে এগিয়ে নিতে পাইলট প্রকল্প হিসেবে প্রতি শুক্র ও শনিবার বসছে এ মার্কেট। আগারগাঁওয়ের নির্বাচন ভবনের সামনে থেকে সংগীত কলেজের মোড় পর্যন্ত সড়কের দুই প্রান্তে বেরিকেড দিয়ে রাস্তার দুই পাশের (পূর্ব ও পশ্চিম) বিস্তৃত গাড়ি পার্কিং এলাকায় বসানো হয়েছে ১০০টি স্টল। সড়কের দুপাশে বড় বড় ছাতার নিচে সারি সারি স্টল। এসব স্টলে কুটিরশিল্প, ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তারা তাদের পণ্য নিয়ে বসেছেন। চামড়াজাত, পাটজাত, পোশাক, সাজসজ্জা ও গৃহসজ্জার পণ্য কিনতে সেখানে ছুটির দিনে ভিড় করেছেন বিভিন্ন বয়সী ক্রেতা ও দর্শনার্থী। গতকাল শুক্রবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ের আইসিটি সড়কে ডিএনসিসি-ঐক্য হলিডে মার্কেটে এ দৃশ্য চোখে পড়ে।

আয়োজকরা বলেন, দ্বিতীয় সপ্তাহেও ১০০ উদ্যোক্তা স্টল বরাদ্দ নিয়েছেন। তবে সরেজমিনে গতকাল মার্কেটের ৪২টি স্টল ফাঁকা দেখা গেছে। এতে হতাশ হয়েছেন ক্রেতারা। সকালে ফাঁকা থাকলেও বিকেলে জমে ওঠে হলিডে মার্কেট। হলিডে মার্কেটে দুই দিনের জন্য উদ্যোক্তাদের নিবন্ধন ফি পাঁচ হাজার টাকা। ছোট-বড় প্রায় সব উদ্যোক্তাই টাকার এই পরিমাণ নিয়ে অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেন। তারা জানান, দুদিনের জন্য পাঁচ হাজার টাকা অনেক বেশি, বিশেষ করে ছোট উদ্যোক্তাদের পক্ষে এ খরচ উঠিয়ে লাভ করাটা কষ্টকর। নিবন্ধন ফি অনুযায়ী সুযোগ-সুবিধাও কম বলে জানান বিক্রেতারা। একতারা, বাঁশি, তবলাসহ বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র নিয়ে এসেছেন লাবু মিয়া। তিনি জানালেন, দুই দিনের জন্য ৫ হাজার টাকা ভাড়া গুনতে হচ্ছে, যা অনেক বেশি। তারপরও এসেছেন ঐতিহ্যবাহী বাদ্যযন্ত্রগুলো সম্পর্কে সবাই যেন জানতে পারেন। আমার দোকানে সর্বনিম্ন ২০ টাকা থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত বিভিন্ন মিউজিক ইন্সট্রুমেন্টস রয়েছে। এ ধরনের প্রদর্শনীতে অংশগ্রহণ করলে পণ্যের প্রসার বাড়ে। দেশের সব অঞ্চলে তিনি ছড়িয়ে দিতে চান তার বাদ্যযন্ত্র।

নওগাঁর পত্নীতলা থেকে হস্তশিল্প ও জুয়েলারি পণ্য নিয়ে এসেছেন তহুরা বানু ইতি। গত সপ্তাহেও স্টল দিয়েছিলেন তিনি। বিক্রি হয়েছিল ৪৫ হাজার টাকার পণ্য। স্টল ভাড়া ৫ হাজারসহ একজন কর্মী রেখে আসা-যাওয়া বাবদ তার খরচ হয়েছে ৭ হাজার টাকা। ইতি বলেন, চড়া মূল্যের স্টল ভাড়া দিয়ে নিজেদের কিছুই থাকে না। ২-৩ হাজারের মধ্যে ভাড়া রাখা উচিত। বাবুই পাখির বাসা নিয়ে বসেছে আগারগাঁওয়ের গ্রিন ওয়ার্ল্ড নার্সারি। সেখানে বিক্রয়কর্মী তোরাব হোসেন বলেন, বাবুই পাখির বাসাগুলো আমরা ঢাকার বাইরে থেকে অর্ডার দিয়ে আনি। মার্কেটে আসা দর্শনার্থীরা এটার জন্যই বেশি আমার দোকানে আসছেন। বাবুই পাখির বাসার দাম রাখা হচ্ছে ২৫০ টাকা। এ ছাড়া আমার দোকানে ৫০ টাকা থেকে শুরু করে ৭ হাজার টাকা দামের গাছ রয়েছে।

হলিডে মার্কেটে হাতে আঁকা ও নকশিকাঁথার মোড়কে তৈরি বিভিন্ন ধরনের নোটবুক নিয়ে এসেছেন উদ্যোক্তা শারমীন লাবণী। তার প্রতিষ্ঠানের নাম শিল্পলোক। তিনি বলেন, এ নোটবুকগুলো আমি প্রায় ছয় বছর ধরে তৈরি করছি। নিজ হাতে তৈরি বিভিন্ন ডিজাইনের নোটবুকগুলো মানুষকে আকর্ষণও করেছে। আমার এখানে ২০০ থেকে ৭৭০ টাকা পর্যন্ত দামের নোটবুক রয়েছে। এ ছাড়া ব্লক প্রিন্ট ও নকশা করা টি-শার্ট বিক্রি করছেন ৪৫০ থেকে ৭৫০ টাকায়।

স্টলগুলো ঘুরে দেখা যায়, হাতে তৈরি গয়না, পাটজাত পণ্য, চামড়াজাত পণ্য, মণিপুরি শাড়ি, ঘর সাজানোর পণ্য, দেশীয় পোশাক, বাহারি খাবার, গাছ, জুতা, ব্যাগসহ জীবনযাপনের প্রয়োজনীয় বিভিন্ন অনুষঙ্গ মিলছে এই মার্কেটে। নানা অফারে ক্রেতাদের দৃষ্টি আকর্ষণ করছেন উদ্যোক্তারা। হলিডে মার্কেটের বেশির ভাগ উদ্যোক্তার স্টলেই রয়েছে নারীদের জন্য পোশাক, জুতা ও ব্যাগ। নীলা বাটিকের উদ্যোক্তা নীলা তাবাসুম বলেন, হলিডে মার্কেটের ধারণা এ দেশে নতুন। এখানে বিভিন্ন উদ্যোক্তা অংশ নিচ্ছেন। আমার স্টলে মণিপুরি তাঁত ও জামদানি শাড়ি, জামদানি শাল, ব্লক প্রিন্টের ওয়ান-পিস রয়েছে। তবে ক্রেতাদের অনেকে এটাকে নিউমার্কেট কিংবা গাউছিয়া মনে করছেন। বিষয়টি ক্রেতাদের বুঝতে কিছু সময় লাগবে জানিয়ে তিনি বলেন, আমরা উদ্যোক্তারা অনেক পরিকল্পনা করে, যত্ন নিয়ে কাজ করি। এতে আমাদের পণ্য উৎপাদনের পরিমাণ কম হয়। ফলে দাম কিছুটা বেশি মনে হয়।

হলিডে মার্কেটে আসা শারমিন রিমি বলেন, এখানে অর্গানিক অনেক খাবার যেমন, চা পাতা, মাশরুম, ভালো ব্যাগ, কাপড় অনেক কিছু আছে। পরিবেশও বেশ সুন্দর। নিরাপত্তার বিষয়টিও বেশ জোরদার লক্ষ্য করা যাচ্ছে। চলছে বাণিজ্য মেলা, ঢাকার বাহিরে হওয়ায় যেতে পারিনি। এখানে এসে কিছুটা ভালো লাগছে। দাম নিয়ে জানতে চাইলে নাজমুল ইসলাম নামে এক ক্রেতা বলেন, বাহিরের তুলনায় খুব একটা পার্থক্য দেখছি না। সাধারণত নিউমার্কেট গাউসিয়ায় যে দামে পণ্য মিলে, এখানেও একই দাম। পার্থক্য—যার পণ্য তার কাছ থেকে ক্রয় করার সুযোগ। মার্কেটে আসা ক্রেতা ও উদ্যোক্তারা বলেন, আয়োজকদের শৌচাগার ব্যবস্থাপনায় কিছুটা ঘাটতি রয়েছে। এ ছাড়া অন্তত দুটি স্টলের মাঝখানে একটি করে ময়লা ফেলার ডাস্টবিন দেওয়া প্রয়োজন। এতে আশপাশের পরিবেশ পরিষ্কার থাকবে।

ঐক্য ফাউন্ডেশনের সিএমএসএমইর মার্কেট এনগেজমেন্ট উইংস ডিরেক্টর এ এস এম মাহমুদুল হাসান খন্দকার বলেন, মার্কেটে চারটি গণশৌচাগার সংবলিত সিটি করপোরেশনের একটি ভ্রাম্যমাণ গাড়ি রয়েছে। হলিডে মার্কেটের বিদ্যমান অসুবিধাগুলোর সুষ্ঠু সমাধানের চেষ্টা চলছে। ভবিষ্যতে স্টল ফি কমিয়ে আনা হবে এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোক্তাদের এ মার্কেটে আনতে তাদের উদ্যোগ রয়েছে।

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে