শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের থার্ড টার্মিনাল নির্মাণ সরকারের অন্যতম মেগা প্রকল্প। প্রায় ২১’হাজার ৪শ’কোটি টাকার এই প্রকল্পের কাজ এরইমধ্যে ৫১’শতাংশ শেষ হয়েছে। বিভিন্ন সময় প্রকল্প কাজের কেনাকাটা, মানহীন পণ্য ব্যবহার নিয়ে দুর্নীতির অভিযোগ উঠলেও এবার নতুন করে আলোচনায় এসেছে থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে ২০০’কোটি টাকার ক্ষতিপূরণের বিষয়টি।
জানা যায়, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে প্রকল্প এলাকা বুঝিয়ে দিতে দেরি হওয়ায় ২০০ কোটি টাকা ক্ষতিপুরণ দিয়েছে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষকে। দেরি হওয়ার কারণ হিসেবে সড়ক ও জনপথ, ডেসকো ও তিতাসের সঙ্গে সমন্বয় এবং করোনা পরিস্থিতিকে দায়ী করা হয়েছে। এরইমধ্যে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সাব কমিটি এ সংক্রান্ত নথিপত্র তলব করেছে। মন্ত্রণালয়ের সংসদীয় সাব কমিটির বৈঠকে ক্ষতিপূরণ দেয়ার বিষয়টি স্বীকারও করেছেন প্রকল্প পরিচালক।
ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশের (টিআইবি) নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, পরিষ্কারভাবেই বুঝা যায় এটা পরিকল্পনার ঘাটতি ও ব্যর্থতা। যে যুক্তিই দেখাক না কেন, দেরি হতেই পারে, কিন্তু এ কারণে বিশাল অংকের ক্ষতিপূরণ কোন যুক্তিতে দেয়া হলো? তাছাড়া দেরি হলে প্রতিকারের বিষয়টা কেমন হবে, সুনির্দিষ্টভাবে সেটা উল্লেখ ছিল কিনা? এই বিষয়গুলো যদি সুস্পষ্টভাবে চিহ্নিত করা না থাকে, তাহলে বিষয়টা এমন দাঁড়ালো যে, খুশি হলো কিংবা দেরি হলো টাকা খরচ করে ফেললাম। এটা হয় না, এটা জনগণের অর্থ। কাজেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের একাংশের বা সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় জড়িতদের একাংশের যোগসাজশ আছে কিনা তা খতিয়ে দেখা এবং জবাবদিহীতা নিশ্চিত করা অপরিহার্য।
জানা গেছে, থার্ড টার্মিনাল প্রকল্পে পণ্যের মান, ব্র্যান্ড ও কোন দেশ থেকে কেনা হবে, দরপত্রে তা ঠিক করা থাকলেও, গুরুত্বপূর্ণ ও মূল্যবান বেশ কয়েকটি আইটেম অন্য দেশ থেকে কেনা হয়। এতে দেশ ও ব্র্যান্ড পরিবর্তন করে মানহীন পণ্য কিনে সরকারি অর্থ অপচয় হয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক বেবিচকের একটি সূত্র জানিয়েছে, একটি সিন্ডিকেটের অপতৎপরতা রয়েছে বেবিচকে। প্রকল্প কাজে গুণগত মান বজায় রাখা ও তদারকি প্রধান প্রকৌশলীর দায়িত্বে থাকলেও, তিনি এ বিষয়টিতে তেমন নজর দেন না। বরং এটাকে কত সহজে টেবিল ছাড়া করা যায় সেটাকেই গুরুত্ব দেন তিনি। সূত্রটি আরও বলছে, চলমান কয়েকটি প্রকল্পে ইলেকট্রো মেকানিক্যাল কাজে কেনা কাটা করা হয়েছে বিধি বহির্ভূতভাবে।
উল্লেখ্য, ২০১৯ সাল থেকে চলতি বছর পর্যন্ত বিভিন্ন প্রকল্পে অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেকের বিরুদ্ধে দুদকে অন্তত ৭টি অভিযোগ জমা পড়ে। এরমধ্যে একটিমাত্র অভিযোগের ব্যবস্থা নিতে বেবিচককে চিঠি দেয় দুদক। এদিকে বিমানবন্দরের একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রকল্পের কাজ চলছে পরামর্শক প্রতিষ্ঠান নিয়োগ ছাড়াই। যেখানে প্রধান প্রকৌশলী নিজেই তদারকির দায়িত্ব পালন করছেন। যা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
প্রকল্প কাজ সুষ্ঠুভাবে সম্পাদন ও প্রকল্প স্থানে সংশ্লিষ্ট দপ্তর বা সংস্থার সঙ্গে সমন্বয়ের মূল দায়িত্ব ছিল বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলীর। সমন্বয়ে ব্যর্থতা ছিল কিনা? সার্বিক বিষয়ে বেবিচকের প্রধান প্রকৌশলী আব্দুল মালেকের সঙ্গে কথা বলতে চাইলেও, তিনি আনুষ্ঠানিকভাবে বক্তব্য দিতে রাজি হননি। এসব বিষয়ে বক্তব্য জানতে যোগাযোগ করলেও সাড়া দেননি বেবিচকের চেয়ারম্যান। তবে দুদকের অনুসন্ধানের বিষয়ে প্রধান প্রকৌশলী বলেন, অভিযোগ থাকতেই পারে। সবগুলো এখনো তদন্তাধীন।
টিআইবির নির্বাহী পরিচালক মনে করেন, যে কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ধারাবাহিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকে তদন্ত চলছে এবং সুর্নিদিষ্টভাবে কর্তৃপক্ষকে (বেবিচকে) পত্রও দিয়েছে। সেই কর্মকর্তাকে কিভাবে বড় প্রকল্প বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হয়। এটি প্রশ্নবিদ্ধ সিদ্ধান্ত। এখানে জবাবদিহীতার জায়গা আছে। কর্তৃপক্ষেরও দায় এড়ানোর সুযোগ নেই। এসব বিষয় ক্ষতিয়ে দেখা দরকার।




























