বাংলাদেশের রাজধানীর কুটনৈতিক এলাকা হিসেবে পরিচিত গুলশানের হলি আর্টিজান বেকারিতে জঙ্গি হামলার ৬ বছর পুর্তি উপলক্ষে আজ সকাল সাড়ে ৭টায় ওই ভবনের সামনে হামলায় নিহত ব্যক্তিদের উদ্দেশে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন বাংলাদেশে নিযুক্ত বিভিন্ন দূতাবাসের কর্মকর্তারা এবং নিহতদের স্বজনেরা। এ’সময় ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেন বাংলাদেশে নিযুক্ত জাপানের রাষ্ট্রদূত ইতো নাওকি, ইতালির রাষ্ট্রদূত এনরিকো নুনজিয়াতা, যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত পিটার হাস ও ভারতের হাইকমিশনার বিক্রম দোরাইস্বামী। এ সময় বাংলাদেশে নিযুক্ত মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাইকমিশনার পিটার হাস বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ দমনে গণমাধ্যমের ভূমিকার প্রশংসা করেন।
হলি আর্টিজানে জঙ্গি হামলার ঘটনার জের ধরে পরবর্তীতে সারাদেশে পুলিশ ও র্যাব ২৭টি জঙ্গি বিরোধী অভিযান চালায়। এতে ৭৩জন জঙ্গি (পুরুষ ও নারী) নিহত হয়। অভিযান চালাতে গিয়ে
র্যাবের গোয়েন্দা শাখার পরিচালক লে.কর্নেল আবুল কালাম আজাদসহ দুই পুলিশ কর্মকর্তা এবং চার জন উৎসুক জনতা নিহত হন। র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের(র্যাব) মহাপরিচালক (ডিজি) চৌধুরী আবদুল্লাহ আল-মামুন এ উপলক্ষ্যে আজ দাবি করেছেন, জঙ্গিবাদ ও সন্ত্রাসবাদ দমনে বাংলাদেশের সাফল্য ঈর্ষণীয়। সমন্বিতভাবে সাঁড়াশি অভিযান পরিচালনা করে জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক ও আস্তানা গুঁড়িয়ে দিয়েছি বলে দাবি করেছেন তিনি বলেন, আমরা সব সময় সতর্ক আছি।
র্যাব মহাপরিচালক বলেন, আমরা জঙ্গিবাদ দমনের ধারাবাহিকতা ধরে রেখেছি। সাইবার জগতে আমরা জঙ্গি কার্যক্রমের বিষয়ে নজরদারি রাখছি। জঙ্গিবাদ দমনে সব আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করছে র্যাব। যে কারণে জঙ্গিবাদ এখন সক্ষমতা প্রদর্শন করতে পারছে না। তারপরও আমরা আত্মতুষ্টিতে ভুগছি না, সব সময় সতর্ক আছি। এসময় হলি আর্টিসান হামলায় নিহত তৎকালীন ঢাকা মহানগর গোয়েন্দা পুলিশের সহকারী পুলিশ কমিশনার (এসি) রবিউল ও বনানী থানার ওসি সালাহউদ্দীনের স্মরণে গুলশান মডেল থানার সামনে ‘দীপ্ত শপথ’ নামের এ দুই অফিসারের ভাস্কর্য নির্মাণ করা হয়। প্রতি বছর হলি আর্টিসান হামলার দিন তাদের স্মরণে এ ভাস্কর্যে শ্রদ্ধা নিবেদন করা হয়।
ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেছেন, ‘জঙ্গি দমনে আমরা আর তৃপ্তিতে ভুগি না। কারণ, এখনও জঙ্গি তৎপরতা মাঝে মাঝে চোখে পড়ছে। জঙ্গিদের সোশ্যাল মিডিয়ায় অ্যাকটিভিটিসহ সব বিষয়ে আমরা মনিটরিং করি। হলি আর্টিজানে হামলার সময় জিম্মিদের উদ্ধারে অভিযানে নিহত দুই পুলিশ কর্মকর্তার স্মরণে নির্মিত ‘দীপ্ত শপথ’ ভাস্কর্যে শুক্রবার শ্রদ্ধা জানাতে গিয়ে ডিএমপি কমিশনার এ কথা বলেন। মোহা. শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘বিভিন্ন সময় এন্টি-টেরোরিজম ইউনিট-সিটিসিসহ বিভিন্ন মেট্রো ও জেলা পুলিশে সিটিসির মতো একটি করে ছোট ইউনিট করা হয়েছে। তারা বিভিন্ন সময় অভিযান চালিয়ে জঙ্গিদের গ্রেপ্তার করছে। জঙ্গিদের নেটওয়ার্ক নস্যাৎ করে দেওয়া হচ্ছে।’
ডিএমপি কমিশনার বলেন, ‘বাংলাদেশে হারকাতুল জিহাদের মধ্যে দিয়ে জেএমবির উত্থান হয়। পরে ইরাকে যখন আইএসের উৎপাত শুরু হয়, তখন বাংলাদেশের দিকে দৃষ্টি আকর্ষণ করার জন্য বাংলাদেশের কিছু মানুষ হামিমের নেতৃত্বে হলি আর্টিসানে হামলা করে। পুলিশ কমিশনার আরও বলেন, ‘হলি আর্টিজানের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পর থেকেই বাংলাদেশ পুলিশ জঙ্গি দমনে নতুন একটি ইউনিট খোলে। এই ইউনিটের অধিকাংশ সদস্যই ইউএস সরকারের পক্ষ থেকে প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত হন। এ ছাড়া ইউএস সরকারের পক্ষ থেকে অস্ত্র এবং প্রটেকশনের কথা বলা হয়।’ শফিকুল ইসলাম বলেন, ‘ইউএস সরকারের পক্ষ থেকে এই রিকোয়ারমেন্ট পাওয়ার পর থেকেই আপনারা লক্ষ্য করেছেন, চট্টগ্রামের মৌলভীবাজার ও খুলনা বিভাগের বিভিন্ন স্থানসহ দেশের অনেক জায়গায় জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করে। সেই সময়কার জঙ্গিদের আস্তানা তছনছ করে দেওয়া হয়েছে। শফিকুল বলেন, ‘হলি আর্টিজানের অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার পরে যদি আমরা ঘুরে দাঁড়াতে না পারতাম, তাহলে আজ যে পদ্মা সেতু দেখছি, মেট্রোরেল দেখছি, তার কোনও কিছুই বাস্তবায়ন করতে পারতাম না। কারণ, কোনও বিদেশি টেকনিশিয়ান-ইঞ্জিনিয়ার জীবনের ঝুঁকি নিয়ে বাংলাদেশে আসতেন না।’
২০১৬ সালের ১’লা জুলাই রাজধানীর গুলশান ২ নম্বরের ৭৯ নম্বর সড়কের ৫ নম্বর প্লটের হলি আর্টিজান ও ওকিচেন রেস্তোরায় জঙ্গি হামলার ঘটনায় ৯ জন ইটালির নাগরিক, ৭ জন জাপানি নাগরিক, ১ জন ভারতের নাগরিক, ৩ জন বাংলাদেশি নাগরিক ও দুই জন পুলিশ কর্মকর্তাসহ ২৩ জন নিহত হন। পরবর্তীতে সেনাবাহিনীর অপারেশন থান্ডার বোল্ড অভিযানে ৫ জঙ্গি নিহত হয়।


















