প্রায় ৩০০ কোটি টাকার বিদেশি প্রকল্প ব্যর্থ হওয়ার পর, দেশিয় প্রযুক্তিতে শৃঙ্খলায় ফিরছে নগরীর ট্রাফিক ব্যবস্থা। যানবাহন ও চালকদের নিয়ন্ত্রণে ট্রাফিক সিগন্যালে যুক্ত হয়েছে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)। তবে অল্পবৃষ্টিতেই বন্ধ হয়ে যাচ্ছে এই প্রযুক্তি। আছে আরও ২০টিরও বেশি প্রতিবন্ধকতা। তাহলে কীভাবে আলোর মুখ দেখবে এই পাইলট প্রকল্প? নাকি আগের প্রকল্পগুলোর মতোই হারিয়ে যাবে এটিও?
ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে গেলো আড়াই দশকে প্রায় ৩০০ কোটি টাকার ৫টির বেশি বিদেশি প্রকল্প মুখ থুবড়ে পড়েছে। তবে এবার ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে সফলতা এসেছে।
এক ট্রাফিক পুলিশসদস্য জানান, এখন প্রায় ৯০ ভাগ অটো ট্রাফিক সিগনালে থেমে যায়। এছাড়া রাস্তায় চলাচল করা সাধারণ মানুষ বলছেন, আগে কেউ ট্রাফিক আইন না মানলেও এখন বেশিরভাগই ট্রাফিক আইন মেনে চলে। এছাড়া এআই ক্যামেরা থাকায় মানুষ এখন সিগনাল মানছেন বলেও জানান অনেকে। কাগজ-কলম আর অনিয়ম আর পেছনে ফেলে গেল কয়েক মাসে দেশিয় প্রযুক্তির ব্যবহারে ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণে এনেছে অভাবনীয় সাফল্য। প্রশ্ন হলো কীভাবে কাজ করছে নিজ প্রযুক্তি? আর কীভাবেই বা আইনের আওতায় আসছে ট্রাফিক অপরাধ?
রাজধানীর সড়কে শৃঙ্খলা আনতে অন্তবর্তীকালীন সরকারের উদ্যোগে গেলো বছর নগরের ২২টি পয়েন্টে বসানো ডিজিটাল লাইটিং ব্যবস্থায় বর্তমান সরকারের উদ্যোগে ঢাকা মহানগর পুলিশ যুক্ত করছে সিসিটিভি ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট ইন্টেলিজেন্ট সার্ভার। আর ডিএমপির নিজেস্ব ওয়েব সার্ভারের মাধ্যমেই নথিভুক্ত হচ্ছে ট্রাফিক অপরাধ।
সড়কে কৃত্রিমভাবে একটি অদৃশ্য রেখা তৈরি আছে। সিগন্যালে লালবাতিতে কোনো গাড়ি এটি পার হলেই সার্ভার অপরাধ চিহ্নিত করে। আবার সবুজ বাতিতে এখানে থামলেও শনাক্ত হয় অপরাধ। স্বয়ংক্রিয়ভাবে সংরক্ষণ করে ২৫ সেকেন্ডের ভিডিও ফুটেজ, যা ব্যবহার করে পরবর্তী আইনি পদক্ষেপ নেয় ডিএমপি ট্রাফিক বিভাগ। একই প্রযুক্তি কাজ করছে সাইড লাইন ও জেব্রা ক্রসিংয়েও। এছাড়া বাম লেন বন্ধ উল্টো দিকে আসা, সিগনাল ভাঙাসহ বেশ কয়েকটি প্রতিবন্ধকতা শনাক্ত করছে এই প্রযুক্তি। এতেই চালক ও যানবাহন আওতাভুক্ত হচ্ছে ট্রাফিক মামলার।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সব পক্ষের দীর্ঘ দিনের সমন্বয় হীনতা দূর, সফলতার পথ দেখিয়েছে। যোগাযোগ বিশেষজ্ঞ ড. হাদিউজ্জামান বলেন, ‘সমন্বয়ের যে একটা ঘাটতি ছিলো, আমি বলবো, এই ঘাটতিটা আমরা অতিক্রম করতে পেরেছি। কারণ এখানে আমরা সিগনাল ডিজাইন করছি। দেশিয় প্রযুক্তিতে তৈরি করছি। আমরা প্রযযুক্তিটা বসাচ্ছি। সিটি করপোরেশন প্রযুক্তি বসানোর আগে যে কাজগুলো করার, তারা সেগুলো করছে। একইসঙ্গে পুলিশ এটা সানন্দে গ্রহণ করেছে।’
অতিরিক্ত পুলিশ কমিশনার (ট্রাফিক) মো. আনিছুর রহমান বলেন, ‘ঢাকা মহানগরবাসী আমাদের চালু করা সিস্টেমের প্রতি সমর্থন দেখিয়েছে। এজন্য আমি তাদের প্রতি কৃতজ্ঞ।’ সাফল্য আসলেও এই প্রযুক্তিতে আছে নানা প্রতিবন্ধকতা। প্রযুক্তির আওতাভুক্ত নেই পথচারী ও অটোরিকশা। এতে অর্জিত সফলতা প্রশ্নবিদ্ধ। এছাড়া হালকা বৃষ্টি, ইন্টারনেট জটিলতা, ইদুরের উৎপাতেও বন্ধ হয়ে যায় এই সিগন্যাল ব্যবস্থা। আছে প্রযুক্তিগত তথ্যের ঘাটতিসহ অন্তত ২০ ধরনের প্রতিবন্ধকতা। যদিও ডিএমপির ট্রাফিক বিভাগ বলছে, পাইলট এই প্রকল্প মনিটরিং করে নির্ভুল ব্যবস্থার মধ্য দিয়ে আগামী ৬ মাসেই বড় প্রজেক্ট তৈরি করা হবে।
পুলিশ কমিশনার আনিছুর রহমান বলেন, ‘আগামী ছয় মাসের মধ্যে আমরা আশা করছি, আমাদের প্রায় ৬০ এর বেশি সেমি অটোমেটিক সিগনাল লাগানো হবে। আর এটা যদি হয়, তাহলে আমরা প্রতিটি জাংশনে গড়ে ৫টি করে ক্যামেরা চিন্তা করছি। আড়াই দশকে ঢাকার ট্রাফিক সিগন্যাল আধুনিকায়নে অন্তত ৭টি বড় প্রকল্প নেয়া হয়েছে। বিশ্বব্যাংক, জাইকা এবং সরকারি অর্থায়নে এসব প্রকল্পে প্রায় ৩০০ কোটি টাকা ব্যয় হলেও অব্যবস্থাপনার কারণে অধিকাংশই অকার্যকর হয়ে পড়ে। সর্বশেষ, বুয়েট ও ট্রাফিক বিভাগের ১৮ কোটি টাকা ব্যয়ের এই পাইলট প্রকল্প আশার আলো দেখাচ্ছে।
