সেলফোন সেবার গ্রাহক প্রবৃদ্ধির পাশাপাশি বড় হচ্ছে মোবাইল হ্যান্ডসেটের বাজারও। বর্তমানে দেশে মোবাইল হ্যান্ডসেটের বাজার প্রায় ১০ হাজার কোটি টাকার। যদিও এ বাজারের ৩০ শতাংশই অবৈধভাবে আমদানি হওয়া হ্যান্ডসেটের দখলে। এ অবস্থায় অবৈধ ও নকল এ হ্যান্ডসেটের ব্যবহার বন্ধের উদ্যোগ নিচ্ছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি)। সেলফোন হ্যান্ডসেট শনাক্তকরণ ব্যবস্থা স্থাপনে লাইসেন্সিং নীতিমালা করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থাটি।

কমিশন সূত্রে জানা গেছে, হ্যান্ডসেট শনাক্তকরণে ন্যাশনাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (এনইআইআর) বাস্তবায়নে তৃতীয় পক্ষের প্রতিষ্ঠানকে লাইসেন্স দেয়ার সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। লাইসেন্স প্রদানের মাধ্যমে একটি প্রতিষ্ঠানকে এনইআইআর বাস্তবায়নের দায়িত্ব দেয়া হবে। এজন্য লাইসেন্সিং নীতিমালা তৈরির উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়াও এর মাধ্যমে নির্ধারিত হবে। তবে এক্ষেত্রে মোবাইল নম্বর পোর্টেবিলিটি (এমএনপি) লাইসেন্স দেয়ার প্রক্রিয়া অনুসরণ করা হতে পারে।

সেলফোনের মাধ্যমে সংগঠিত বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড শনাক্ত, হ্যান্ডসেট চুরি বা ছিনতাই রোধ ও অবৈধ বা নকল হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধে ২০১২ সালে এনইআইআর স্থাপনের উদ্যোগ নেয় নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পরবর্তী সময়ে নানা জটিলতায় তা থমকে যায়। ২০১৭ সালে সরকারি-বেসরকারি অংশীদারিত্বের (পিপিপি) ভিত্তিতে এটি বাস্তবায়নের প্রস্তাব দেয় একটি তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। প্রস্তাবনাটি যাচাই-বাছাই করে এনইআইআর নিজস্ব উদ্যোগে স্থাপনের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। তবে নিজস্ব উদ্যোগে এটি স্থাপনে তুলনামূলক বেশি সময় প্রয়োজন হবে বলে মনে করছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। পাশাপাশি এ পদ্ধতিতে এনইআইআর স্থাপনে অবকাঠামো, গ্রাহকসেবা কেন্দ্র ও প্রয়োজনীয় জনবল নিশ্চিতও করতে হবে। এসব বিষয় বিবেচনায় নিয়ে নিজস্ব উদ্যোগে এনইআইআর স্থাপনের উদ্যোগ থেকে সরে আসে বিটিআরসি। প্রতিটি হ্যান্ডসেটে ১৫ সংখ্যার একটি অনন্য নম্বর থাকে, যা আইএমইআই নামে পরিচিত। হ্যান্ডসেটে *#০৬# এ নম্বরগুলো পরপর চাপলে আইএমইআই নম্বর জানা যায়। হ্যান্ডসেটের প্রস্তুতকারী প্রতিষ্ঠানের নাম, মডেল ও ক্রমিকের সমন্বয়ে গঠন করা হয় আইএমইআই নম্বর। বিভিন্ন ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেটগুলোর ক্ষেত্রে এটি মানা হলেও নন-ব্র্যান্ডের হ্যান্ডসেটে ভুয়া আইএমইআই নম্বর ব্যবহার করা হয়। সিডিএমএ প্রযুক্তির হ্যান্ডসেটের ক্ষেত্রে এটি মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিফায়ার (এমইআইডি) নামে পরিচিত। এছাড়া ১৬ সংখ্যাবিশিষ্ট আইএমইআইএসভি নম্বরও প্রচলিত রয়েছে, যা আইএমইআইয়ের একটি সফটওয়্যার সংস্করণ। এনইআইআর স্থাপনের মাধ্যমে দেশে ব্যবহূত প্রতিটি হ্যান্ডসেটে থাকা আইএমইআই (ইন্টারন্যাশনাল মোবাইল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি) নম্বর শনাক্ত করা সম্ভব হবে।

বিটিআরসির ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, আইএমইআই নিবন্ধন ব্যবস্থা চালু হলে হ্যান্ডসেট চুরি ও নকল হ্যান্ডসেট বিক্রি বন্ধ হবে। এছাড়া সরকারের রাজস্ব আদায় নিশ্চিত হবে। এ ব্যবস্থাটি চালু হলে শুধু বৈধ হ্যান্ডসেটের মাধ্যমে সেলফোন সেবা নিতে পারবেন গ্রাহক। জানা গেছে, বর্তমানে আইএমইআই নম্বর নিবন্ধনের ব্যবস্থা না থাকায় চুরি হওয়া হ্যান্ডসেটের প্রকৃত মালিক শনাক্ত ও উদ্ধার অনেক ক্ষেত্রেই সম্ভব হয় না। এছাড়া প্রকৃত আইএমইআই নম্বরবিহীন নকল হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে সন্ত্রাসীরা বিভিন্ন ধরনের অপরাধমূলক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। পাশাপাশি এ ধরনের হ্যান্ডসেট উদ্ধারেও কার্যকর ব্যবস্থা নিতে পারছে না আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। ২০১২ সালের মার্চে এনইআইআর সংক্রান্ত প্রাথমিক একটি খসড়া নির্দেশনা প্রকাশ করে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এনইআইআর বাস্তবায়ন করা হলে প্রতিটি গ্রাহকের ফোন কলের সঙ্গে তার ফোন নম্বর, হ্যান্ডসেটের মডেল নম্বর এবং আইএমইআই নম্বরও অপারেটরের সার্ভারে যাবে। এর ফলে সিম কার্ড বদলে ফেলা হলেও হ্যান্ডসেটের তথ্যের মাধ্যমে চুরি হওয়া হ্যান্ডসেট উদ্ধার বা অপরাধীকে শনাক্ত করা সম্ভব হবে। এছাড়া এনইআইআরকে সেন্ট্রাল ইকুইপমেন্ট আইডেন্টিটি রেজিস্টার (সিইআইআর) ও টেলিকমিউনিকেশন ইন্ডাস্ট্রি অ্যাসোসিয়েশনের (টিআইএ) সঙ্গে যুক্ত করা হবে। এর ফলে আন্তর্জাতিকভাবে হ্যান্ডসেট শনাক্তকরণের সুবিধা পাওয়া যাবে।

পাশাপাশি দেশের সব হ্যান্ডসেটের আইএমইআই নম্বর দিয়ে ডাটাবেজ তৈরির নির্দেশনা দেবে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। নিয়মিতভাবে হালনাগাদও করতে হবে এ ডাটাবেজ। আর এটি করতে হবে সেলফোন অপারেটরদের নিজ উদ্যোগেই। আইএমইআই নম্বর নিবন্ধনে গ্রাহকের কাছ থেকে ১০০ টাকা করে নেয়ার প্রাথমিক প্রস্তাবনার উল্লেখ করা হয় নির্দেশনায়। আমদানির পাশাপাশি দেশে এরই মধ্যে গড়ে উঠেছে হ্যান্ডসেট তৈরির কারখানা। এখন পর্যন্ত পাঁচটি প্রতিষ্ঠানকে হ্যান্ডসেট সংযোজন ও উৎপাদনে সনদ দিয়েছে নিয়ন্ত্রক সংস্থা। এরই মধ্যে ওয়ালটন, স্যামসাং, সিম্ফনি, আইটেল ও ফাইভ স্টার নিজস্ব কারখানায় হ্যান্ডসেট উৎপাদন শুরু করেছে। এর বাইরে আরো বেশ কয়েকটি প্রতিষ্ঠান এ সনদের জন্য আবেদন করেছে। অবৈধ আমদানির কারণে গত বছরের প্রথম নয় মাসে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশে বৈধপথে সেলফোন হ্যান্ডসেটের আমদানি কমেছে। বাংলাদেশ মোবাইল ফোন ইমপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের (বিএমপিআইএ) হিসাব অনুযায়ী, ২০১৭ সালের প্রথম তিন প্রান্তিকে (জানুয়ারি-সেপ্টেম্বর) দেশে প্রায় ২ কোটি ৮০ লাখ সেলফোন আমদানি হয়। ২০১৮ সালের একই সময়ে আমদানির পরিমাণ ছিল ২ কোটি ৩০ লাখ। এ সময়ে আগের বছরের তুলনায় সেলফোনের আমদানি কমেছে ১৭ শতাংশ। এর মধ্যে ফিচার ফোনের বাজার কমেছে ১৬ শতাংশ ও স্মার্টফোনের বাজার কমেছে ১৮ শতাংশ।

বিএমপিআইএ সভাপতি রুহুল আলম আল মাহবুব বলেন, অবৈধ আমদানি রোধের উদ্দেশ্যে সরকার স্থানীয় পর্যায়ে সেলফোন সংযোজন ও উৎপাদনের অনুমতি দিয়েছে। অবৈধ পথে সেলফোন আমদানি বন্ধের জন্য স্থানীয় উৎপাদনকে একটি দীর্ঘমেয়াদি ও সংগতিপূর্ণ নীতিমালার আওতায় আনা প্রয়োজন। বিটিআরসির সর্বশেষ তথ্যমতে, গত বছরের নভেম্বর শেষ দেশে সেলফোনের সংযোগ সংখ্যা ১৫ কোটি ৭০ লাখ ছাড়িয়েছে।

নিউজ ডেস্ক ।। বিডি টাইম্‌স নিউজ

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে