দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতের প্রধান বিচারক হিসেবে বিচার কার্য পরিচালনা করেছিলেন রাধা বিনোদ পাল, অন্যান্য দেশের বিচারকরা যখন জাপানকে যুদ্ধাপরাধী হিসেবে চিহ্নিত করে, তিনি তখন জাপানকে যুদ্ধাপরাধের দায় থেকে নির্দোষ প্রমাণ করে আন্তর্জাতিক খ্যাতি লাভ করেন।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত জাপান অনেকটা বাধ্য হয়ে যখন রক্তের নেশা ছেড়ে জাতি গঠনে মনোযোগী হয়,তখন থেকেই তারা আস্তে আস্তে পৃথিবীর অন্যতম সভ্য জাতিতে পরিণত হতে থাকে আর সেজন্য বাংলাদেশের কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া একজন বাঙালির কাছে চিরকৃতজ্ঞ জাপানিরা।আন্তর্জাতিক যুদ্ধাপরাধ টাইব্যুনালের ‘টোকিও ট্রায়াল’ ফেজে এই বাঙালি বিচারকের দৃঢ় অবস্থানের কারণেই জাপান অনেক কম ক্ষতিপূরণে পার পেয়ে যায়।
মিত্রপক্ষ ও অন্য বিচারকরা একপেশেভাবে রায় চাপিয়ে দিতে চেয়েছিলেন জাপানের উপর। তার বিপক্ষে নিরপেক্ষ অবস্থান না নিলে এখন পর্যন্ত জাতি গঠনের সুযোগই হয়তো আর পেত না জাপান। মিথ আছে পরবর্তীকালে সাক্ষাতে জাপানের সম্রাট হিরোহিতো নিজে দাঁড়িয়ে সম্মান জানিয়ে ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার করে বলেছিলেন, যতদিন জাপান থাকবে, বাঙালি খাদ্যাভাবে, অর্থ কষ্টে মরবে না। জাপান হবে বাঙালির চিরকালের নিঃস্বার্থ বন্ধু। মিথ হতে পারে কিন্তু এটি যে শুধু কথার কথা ছিল না তার প্রমাণ আমরা এখনো দেখতে পাই। জাপান এখনো বাংলাদেশের সবচেয়ে নিঃস্বার্থ বন্ধু। এই ঘটনার প্রায় ৬৫ বছর পর ঢাকার গুলশানে হলি আর্টিসানে হামলায় প্রাণ গেল নয় জাপানি বিশেষজ্ঞ ইঞ্জিনিয়ারের। জাপান তখনো পাশে ছিল বাংলাদেশের।

কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া সেই বাঙালি বিচারকের নাম এখনো জাপানি পাঠ্যপুস্তকে পাঠ্য। তার নামে জাপানে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বেশ কিছু মেমোরিয়াল ও মনুমেন্ট। এই বিস্মৃত বাঙালির নাম বিচারপতি রাধাবিনোদ পাল (১৮৮৬-১৯৬৭)। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য ও হেগের আন্তর্জাতিক আদালতের বিচারক ছাড়াও জীবদ্দশায় অনেক বড় বড় দায়িত্ব পালন করেছিলেন। কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির আগে তিনি কুষ্টিয়ায় নিজ গ্রামের স্কুল ও রাজশাহী কলেজের ছাত্র ছিলেন। কর্মজীবনের শুরুতে ময়মনসিংহের আনন্দমোহন কলেজে প্রভাষক ছিলেন। কিছুদিন ময়মনসিংহ কোর্টে আইন ব্যবসাও করেছিলেন। এই মেধাবী বাঙালিকে আমরা প্রায় কেউই মনে রাখিনি। বাঙালির মেধাগত বীরত্বের এই চমৎকার অধ্যায়টা জানে খুব অল্প মানুষ! অথচ কত ঠুনকো বিষয়ই না বাঙালি মানসে পায় সীমাহীন গুরুত্ব!

ডঃ রাধাবিনোদ পাল (২৭ জানুয়ারি ১৮৮৬ – ১০ জানুয়ারি ১৯৬৭) একজন বাঙালি আইনবিদ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভাইস চ্যান্সেলর ছিলেন। তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্দের সময় জাপানি যুদ্ধপরধীর প্রতিশ্রুতিবদ্ধ দুরপ্রাচ্যর ট্রায়ালের জন্য আন্তর্জাতিক সামরিক আদালতের বিচারক হিসাবে দায়িত্ব পালন করেন। তিনি “জাপান-বন্ধু ভারতীয়” বলে খ্যাত। জাপানিদের ইতিহাসে রাধা বিনোদের নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। জাপানের টোকিও শহরে তাঁর নামে রয়েছে জাদুঘর, রাস্তা, রয়েছে স্ট্যাচু। এমনকি জাপান বিশব্বিদালয়ের একটি রিসার্চ সেন্টার রয়েছে। তিনি আইন সম্পর্কিত বহু গ্রন্থের রচনা করেন।

(অপু নজরুলের ফেসবুক পেজ থেকে সংগৃহীত)

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে