বিএনপির ১০’শে ডিসেম্বর ঢাকা বিভাগীয় সমাবেশের আগেই পরিস্থিতি সংঘাতময় হয়ে উঠছে৷ বুধবার বিকেলে নয়া পল্টনে বিএনপি কার্যালয়ের সামনে পুলিশর সঙ্গে বিএনপি নেতা-কর্মীদের সংঘর্ষ চলাকালে একজন নিহত হয়েছেন৷ আহত হয়েছেন ৩০-৩৫ জন৷ বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রহুল কবির রিজভী, প্রচার সম্পাদক শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানি ও স্বেচ্ছাসেবক দলের সাধারণ সম্পাদক আব্দুল কাদের ভুইয়াসহ শতাধিক নেতা-কর্মীকে দলীয় কার্যালয়ের সামনে ও ভিতর থেকে পুলিশ আটক করেছে৷ কার্যালয়ের ভিতরে ঢুকে অভিযান চালায় পুলিশ।

বুধবার সকাল থেকেই কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে বিএনপি ও তাদের অঙ্গ সংগঠনের নেতা-কর্মীরা অবস্থান নেয়৷ তারা দুইটি ট্রাকে মাইক লাগিয়ে বক্তৃতা ও শ্লোগান দিচ্ছিলেন৷ ধীরে ধীরে লোকজন বাড়তে থাকায় বিএনপি কার্যালয়ের দিকের রাস্তা বন্ধ হয়ে যায়। আগে থেকেই পুলিশ সেখানে অবস্থান নেয়৷ বিকেল তিনটার দিকে পুলিশ সদস্যরা গিয়ে তাদের রাস্তা ছেড়ে দিতে বললে তারা সমাবেশ চালিয়ে যেতে অনঢ় থাকে। পুলিশ তাদের সরিয়ে দেয়ার উদ্যোগ নিলে সংঘর্ষ হয়। পুলিশ টিয়ার গ্যাস ছোড়ে, পুলিশকে লক্ষ্য করেও পাল্টা ইট-পাটকেল ছোড়া হয়। আধা ঘণ্টা ধরে সংঘর্ষ এবং ধাওয়া পাল্টা ধাওয়ার পর বিএনপির নেতা-কর্মীরা ছত্রভঙ্গ হয়ে গেলে বিএনপি অফিসের কলাপসিবল গেট ভেঙে ভিতরে ঢুকে অভিযান চালায় পুলিশ৷ অভিযানের সময় পুলিশ সেখানে মারপিট ও আটক করে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। আর পুলিশ দাবি করেছে, তাদের ওপর হামলা চালানোর পর তারা ‘অ্যাকশন’এ যায়। পরে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর কার্যালয়ের সামনে গেলেও তাকে ভিতরে ঢুকতে দেয়নি পুলিশ তখন তিনি সেখানেই রাস্তার উপরে অবস্থান নেন।

পুলিশ কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক দাবি করেছেন, ‘বিএনপির নেতা-কর্মীরা বিএনপি অফিসে ককটেল, লাটিসোটা ও চাল ডাল নিয়ে অবস্থান নেয়৷ তাই কার্যালয়ে অভিযান চালানো হয়েছে’। আর যুগ্ম-পুলিশ কমিশনার বিপ্লব কুমার সরকার দাবি করেছেন, বিএনপির কার্যালয়ে বোমা পাওয়া গেছে, তারা আগে পুলিশে ওপর হামলা চালায়’।

দমন পীড়নের সকল মাত্রা ছাড়িয়েছে সরকার
বিএনপি কার্যালয়ে অভিযান চলাকালে সেখানে গিয়ে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, সরকার দমন পীড়নের সকল মাত্রা ছাড়িয়েছে। এর চেয়ে নির্যাতন, দমন আর কিছু হতে পারে না। এটা সংবিধানের লঙ্ঘন, মানবাধিকারের লঙ্ঘন, গণতান্ত্রিক অধিকারের লঙ্ঘন৷ এর চেয়ে খারাপ আর কিছু হতে পারে না’। তিনি বলেন, ‘আমরা ধারণা করছি ১০’তারিখের সমাবেশক পন্ড করার জন্য এটা করা হচ্ছে। এটা একটা চক্রান্ত! আমি কার্যালয়ের সামনে থেকে পুলিশ তুলে নেয়ার অনুরোধ করছি। শান্তিপূর্ণভাবে সমাবেশে আমাদের সহযোগিতার অনুরোধ করছি’, এর চেয়ে নির্যাতন, দমন আর কিছু হতে পারে না’।

আগেই রাজপথ গরম করতে চায় বিএনপি
এদিকে ঘটনার পর কক্সবাজারে এক সমাবেশে সংগঠনটির সাধারণ সম্পাক ও সেতু মন্ত্রী ওবায়দুল কাদের বলেন, ১০’তারিখের সমাবেশের আগেই মাঠ গরম করতে চায় বিএনপি। তারা অফিসে লাঠিসোটা নিয়ে অবস্থান নিয়েছে। তারা সেখান থেকেই লাঠি নিয়ে মাঠে নামবে, ১০’তারিখ আসার আগেই তাই নয়া পল্টনে তাদের অফিসের সামনে তারা পুলিশের ওপর হামলা চালিয়েছে’।

অভিযান চলছে
বিএনপির সমাবেশকে সামনে রেখে পুলিশের বিশেষ অভিযান অব্যাহত আছে। এ’পর্যন্ত সারাদেশে ছয় হাজার নেতা-কর্মীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে বলে বিএনপি জানিয়েছে, তবে পুলিশের হিসেবে গ্রেপ্তার তিন হাজার, ঢাকায় এক হাজার ২২’জনকে গ্রেপ্তারের তথ্য দিয়েছে পুলিশ। বুধবার ঢাকার কমলাপুর, গাবতলি বাসস্ট্যান্ড’সহ ঢাকার প্রবেশপথ যাত্রাবাড়ি, সায়েদাবাদ ও উত্তরা এলাকায় অভিযান চালিয়েছে পুলিশ। ডিএমপির যুগ্ম কমিশনার হারুন অর রশীদ দাবি করেছেন, ‘‘যাদের গ্রেপ্তার করা হয়েছে তারা মামলার আসামি’। বিএনপিকে কোনো সড়কে কোনোভাবেই সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। তবে বিএনপি নেতা মীর্জা আব্বাস বলেছেন,‘‘আওয়ামী লীগ ক্ষমতা হারানোর আতঙ্কে রয়েছে৷ তাই আমাদের গণসমাবেশকে কেন্দ্র করে করে পুলিশসহ আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা নেতাকর্মীদের বাড়িতে বাড়িতে অভিযান চালাচ্ছে, গ্রেপ্তার করছে৷

সমাবেশ কোথায় হবে
বিএনপির ১০’শে ডিসেম্বরের সমাবেশের জায়গা এখনো অনিশ্চিত৷ ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশের(ডিএমপি)কমিশনার খন্দকার গোলাম ফারুক বিকেলে এক প্রেস ব্রিফিং-এ বলেছেন, ‘বিএনপিকে নয়া পল্টন বা কোনো সড়কে কোনোভাবেই সমাবেশ করতে দেয়া হবে না। তারা সোহরাওয়ার্দি উদ্যান বা অন্য কোনো খোলা মাঠে সমাবেশ করতে হবে৷ তারা নয়া পল্টনে সমাবেশ করার কোনো উদ্যোগ নিলে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে”। তিনি বলেন, ‘পল্টন বা তার আশপাশের রাস্তায় বিএনপিকে কোনো সমাবেশ করতে দেয়া হবেনা৷ পল্টনে ১০ লাখ লোক নিয়ে সমাবেশ করার জায়গা নেই৷ আমার প্রস্তাব তারা চাইলে মিরপুর কালশি মাঠে, টঙ্গীর ইজতেমা মাঠ বা পূর্বাচলে বণিজ্য মেলা মাঠে যেতে পারেন”। এদিকে বিএনপি এখনো নয়া পল্টনে সমাবেশ করার ব্যাপারে অনঢ় রয়েছে৷ অবশ্য বিকল্প হিসেবে তারা আরামবাগে সমাবেশের প্রস্তাব দিয়েছে৷ দুপুর দুইটার দিকে নয়া পল্টন কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে এক বৈঠকের পর ব্রিফিং-এ বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মীর্জা আব্বাস জানান, ‘‘আমরা বিকল্প হিসেবে আরামবাগ চেয়েছি৷ সেটা দেয়া না হলে আমরা নয়া পল্টনেই সমাবেশ করব৷”। তিনি বলেন, পুলিশ পুলিশের কাজ করবে, আমরা আমাদের কাজ করব, নয়া পল্টনে সমাবেশ করব তবে আমরা চাই পুলিশ যেন দলীয় ভূমিকা পালন না করে”।

রাজধানী থমথমে
বিএনপি অফিসের সামনের ঘটনার পর ঢাকায় থমথমে অবস্থা বিরাজ করছে৷ নগরীতে অতিরিক্ত পুলিশ টহল দিচ্ছে৷ তবে এরমধ্যেই সমাবেশে যোগ দিতে ঢাকার বাইরে থেকে বিএনপির নেতা-কর্মীরা আসতে শুরু করেছেন।/ডয়েচে ভেলে থেকে

একটি উত্তর ত্যাগ

আপনার মন্তব্য লিখুন দয়া করে!
এখানে আপনার নাম লিখুন দয়া করে